শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬, ৫ আষাঢ় ১৪৩৩

লেবাননে লড়াই ছড়িয়ে পড়ায় শুরুতেই সংকটে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: জুন ১৯, ২০২৬, ০৯:৪৭ পিএম

লেবাননে লড়াই ছড়িয়ে পড়ায় শুরুতেই সংকটে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি

ডেইলি খবর ডেস্ক: সুইজারল্যান্ডে পূর্বনির্ধারিত মার্কিন-ইরান আলোচনা স্থগিত হওয়ার পর, আজ শুক্রবার (১৯ জুন) লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে প্রাণঘাতী হামলা-পাল্টা হামলা মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে সদ্য স্বাক্ষরিত চুক্তিটিকে আরও গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

আলোচনা স্থগিতের এই খবর এমন এক সময়ে এলো যখন তেহরানের প্রধান আলোচক সতর্ক করে বলেছেন যে, ইরান তার ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমার বিষয়ে কোনো আপস করবে না এবং তাদের আঙুল এখনো ‘ট্রিগারেই’ রয়েছে; যদিও যুদ্ধের সময় কার্যত বন্ধ থাকা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আবার বাড়তে শুরু করেছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার ইরানি সমকক্ষ মাসুদ পেজেশকিয়ান কর্তৃক চলতি সপ্তাহে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির লক্ষ্য হলো ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিহতের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধটির অবসান ঘটানো।

এই চুক্তির আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল লেবাননের লড়াই বন্ধ করা, যে বিষয়টি যেকোনো চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত বলে ইরান সবসময় জোর দিয়ে আসছিল। ফলে লেবাননে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান এখন ওয়াশিংটনের জন্য একটি হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী শুক্রবার জানিয়েছে, তারা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে লেবাননে হিজবুল্লাহর ৮০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে এবং ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীর ডজন খানেক সদস্যকে হত্যা করেছে।

লেবানন জানিয়েছে, শুক্রবার দক্ষিণে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ১৮ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাদের চার সেনা নিহতের খবর নিশ্চিত করেছে, যা তাদের দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী যতদিন প্রয়োজন লেবাননে অবস্থান করবে এবং তাদের ওপর হামলার জন্য হিজবুল্লাহকে ‘চরম মূল্য’ দিতে হবে।

উগ্র-ডানপন্থি ইসরায়েলি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গ্যাভির আরও এক ধাপ এগিয়ে সেনাদের মৃত্যুর পর বলেন, ‘পুরো লেবাননকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে হবে।’

শান্তি প্রক্রিয়ায় দুই বাধা: লেক লুসার্নের পাশে সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক রিসোর্টে তেহরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বাধীন ইরানি ও মার্কিন প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানানোর সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল।

প্রাথমিক চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত না হওয়া অমিমাংসিত বিষয়গুলো, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে এই বৈঠকের মাধ্যমে দুই মাসব্যাপী একটি আলোচনা পর্ব শুরু হওয়ার কথা ছিল।

সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, আলোচনাটি স্থগিত করা হয়েছে, তবে তারা জানিয়েছে, এই আলোচনা সহজতর করতে তারা এখনো প্রস্তুত।

কূটনীতিকদের উদ্ধৃতি দিয়ে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলার কারণেই আলোচনা স্থগিত হয়েছে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে এর কোনো আনুষ্ঠানিক কারণ পাওয়া যায়নি।

আঞ্চলিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান পক্ষ সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, এই চুক্তির পেছনে ‘দুটি বাধা’ রয়েছে—প্রথমত, ইসরায়েল এটি ‘পছন্দ করেনি’ এবং দ্বিতীয়ত, ইরানের অভ্যন্তরেও কট্টরপন্থীদের একটি বড় ‘বিরোধিতা’ রয়েছে।

ইরানের ‘চূর্ণকারী জবাব’-বাঘের গালিবাফ শুক্রবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা সবসময়ই তেহরানের ‘রেড লাইন’ বা নিজস্ব নীতিমালার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।

সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনাতে প্রকাশিত বক্তব্যে গালিবাফ বলেন, ‘শত্রু যদি অতিরিক্ত কিছু করতে চায়, তবে আমরা প্রমাণ করেছি যে, আমাদের আঙুল ট্রিগারেই রয়েছে এবং শত্রুকে চূর্ণকারী জবাব দিতে আমরা বিন্দুমাত্র দ্বিধা করব না।’

এদিকে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসরায়েল সরকারের ওপর এমন এক ধরনের বিরক্তি প্রকাশ করেছেন যা কোনো শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে বিরল। তিনি নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘আপনার প্রতিটি জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান কেবল হত্যা বা যুদ্ধের মাধ্যমে হতে পারে না।’

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি, বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন যে, তার ‘ভিন্নমত’ থাকা সত্ত্বেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তিটি অনুমোদন করেছেন।

এই চুক্তির একটি অন্যতম প্রধান দিক ছিল হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে আবারও খুলে দেওয়া। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌ-পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছিল।

শুক্রবার সামুদ্রিক ট্র্যাকিং সংস্থা এএক্সএসমেরিনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার নব-উন্মুক্ত হরমুজ প্রণালি দিয়ে মোট ২৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করেছে, যা এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের পর থেকে সর্বোচ্চ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শান্তিকালীন সময়ে বিশ্বের মোট তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হতো।

মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, আমেরিকান বাহিনী বৃহস্পতিবার ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে তাদের নৌ-অবরোধ তুলে নিয়েছে, যা ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটিতে জাহাজ আসা-যাওয়ায় বাধা দিচ্ছিল। তবে তারা উল্লেখ করেছে যে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো এই ‘সাধারণ এলাকাটিতে’ অবস্থান করবে।

চুক্তির পাঠ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন অবিলম্বে ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া তেল নিষেধাজ্ঞাগুলো মওকুফ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক দেশগুলোর সহায়তায় গঠিত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্গঠন তহবিল ছাড় করার বিষয়ে সহযোগিতা করবে।সংগৃহীত ছবি

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!