বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩

বৃটেনকে প্রতিশোধের নিশানা করতে পারেন পুতিন, হামলার শঙ্কা

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৬, ১০:৩০ এএম

বৃটেনকে প্রতিশোধের নিশানা করতে পারেন পুতিন, হামলার শঙ্কা

ডেইলি খবর ডেস্ক: মাখনের ওপর ধারালো ছুরির মতো সহজেই রাশিয়ার একটি সাবমেরিনের শক্তিশালী কাঠামো ভেদ করে ঢুকে পড়েছিল স্টর্ম শ্যাডো ক্ষেপণাস্ত্র। এরপর ওয়ারহেড বিস্ফোরিত হয়ে সেটিকে ধ্বংস করে দেয়। ২০২৩ সালে অধিকৃত ক্রাইমিয়ায় ইউক্রেনের ভূখণ্ড থেকে নিক্ষেপ করা বৃটিশ-ফরাসি এই ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় ২২ কোটি পাউন্ড মূল্যের এবং ৩ হাজার ১০০ টন ওজনের রুশ সাবমেরিন ‘রোস্তভ-অন-ডন’ ধ্বংস হয়। এটি ছিল সামরিক সক্ষমতার এক নিখুঁত প্রদর্শন, যা দেখিয়েছিল, ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে রক্তক্ষয়ী অচলাবস্থা ভাঙতে স্টর্ম শ্যাডো ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সম্প্রতি বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম যখন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির হাতে স্টর্ম শ্যাডোর গোপন নকশা তুলে দেন, তখন রাশিয়া তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং হুমকিমূলক বক্তব্য দিতে শুরু করে। ক্রেমলিনের ঘনিষ্ঠ মুখ হিসেবে পরিচিত রাশিয়ার সাবেক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই ফেদোরভ সতর্ক করেন, বৃটেন ‘অজ্ঞাত উৎস’ থেকে একটি ‘আধা-সামরিক জবাবের’ মুখোমুখি হতে পারে। তাহলে বৃটেনের বিরুদ্ধে রাশিয়া কী ধরনের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নিতে পারে? আর ফেদোরভ যে রহস্যময় ‘অজ্ঞাত উৎসের’ কথা বলেছেন, সেটা কি? এ খবর দিয়েছে বৃটিশ একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকা।

এক নিরাপত্তা সূত্র সতর্ক করে বলেছে, ইউক্রেনকে বৃটেনের অব্যাহত সমর্থনের কারণে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের পক্ষ থেকে বৃটেনের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেয়া ‘অনিবার্য’ হয়ে পড়েছে। ওই সূত্র বলেন, প্রশ্নটি হলো- ভালুক কামড় দেয়ার আগে আমরা আর কতক্ষণ তাকে খোঁচাতে থাকব? ইউক্রেনের প্রতি আমাদের প্রকাশ্য ও জোরালো সমর্থনের কারণে বৃটেনের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা অবকাঠামোয় হামলা হওয়া অনিবার্য। রাশিয়া কথার পরিবর্তে কাজের মাধ্যমে একটি বার্তা দিতে চাইবে। সেটা ড্রোন হামলা হতে পারে কিংবা অগ্নিসংযোগের ঘটনা হতে পারে। এই দেশে রাশিয়ার নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকা গুপ্ত নেটওয়ার্ক রয়েছে, যারা এ ধরনের যেকোনো কাজ করতে পারে।

পুতিনের সঙ্গে এই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা বৃটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। কারণ বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে তিনি তুলনামূলকভাবে অনভিজ্ঞ। বার্নহামের স্টর্ম শ্যাডোর গোপন নকশা ইউক্রেনকে দেয়ার সিদ্ধান্ত দেশটিকে নিজেদের ভূখণ্ডে এই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করার সুযোগ করে দেবে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ প্রতিক্রিয়ায় বলেন, রাশিয়া এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে দেখছে। তিনি বলেন, বৃটেন পরিকল্পিত ও নিয়মিতভাবে আগুনে ঘি ঢালছে এবং পরিকল্পিত ও নিয়মিতভাবে শান্তি প্রক্রিয়ায় কোনো অগ্রগতি ঠেকানোর ষড়যন্ত্র করছে।

বার্নহাম অবশ্য নিজের অবস্থানে অটল। জবাবে তিনি বলেন, আগুনটা কে লাগিয়েছিল? প্রশ্নটা সেটাই, তাই নয় কি? অ্যাংলো-রুশ সম্পর্কের অবনতির আরও একটি প্রমাণ পাওয়া যায় গত মাসের শেষ দিকে। তখন নিশ্চিত করা হয় যে ক্রেমলিন লন্ডনে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ২৪শে আগস্ট ইউক্রেনের স্বাধীনতা দিবসে কিয়েভে গিয়ে বার্নহাম ইউক্রেনীয় সেনাদের সামনে গিটার বাজিয়ে দ্য স্মিথসের গান ‘রাশহোম রাফিয়ানস’ পরিবেশন করেন। পরদিন প্রায় ৬০০ মাইল দূরে মস্কোতে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে সিআইএ প্রধান জন র‌্যাটক্লিফের মার্কিন বিমানবাহিনীর গ্লোবমাস্টার পরিবহন বিমান ভনুকোভো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য কঠোর বার্তা নিয়ে গিয়েছিলেন- ন্যাটো সদস্য দেশগুলোতে হামলা করবেন না। নতুন মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আশঙ্কা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক বছরে রাশিয়া কোনো ন্যাটো সদস্য দেশের বিরুদ্ধে সীমিত হামলা চালিয়ে জোটটির প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করার চেষ্টা করতে পারে।

ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে থাকা এবং দেশের ভেতরেও চাপের মুখে থাকা পুতিন ছোট আকারের স্থল অভিযান সম্ভবত বাল্টিক অঞ্চলে অথবা বড় ধরনের সাইবার হামলা চালানোর প্রলোভনে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করছে সিআইএ। ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের মজুত কমে যাওয়ায় ন্যাটো জোটের দুর্বলতাও রাশিয়া খুঁজে দেখছে। তবে ইউরোপজুড়ে সাইবার হামলা, অগ্নিসংযোগ, ড্রোন এবং অপতথ্য প্রচারের মাধ্যমে রাশিয়া ইতিমধ্যেই একটি ছায়াযুদ্ধ চালাচ্ছে। ডিসেম্বরে এমআই৬-এর প্রধান ব্লেইজ মেট্রেভেলি বলেন, বৃটেন ও তার মিত্ররা এখন শান্তি ও যুদ্ধের মাঝামাঝি একটি অবস্থানে রয়েছে। ‘গ্রে জোন’ বা ধূসর অঞ্চল হিসেবে বর্ণনা করে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাদের ভয় দেখানো, আতঙ্ক ছড়ানো ও মানুষকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে আমরা সবাই প্রভাবিত হই।

সরকারের গোয়েন্দা ও নজরদারি সংস্থা জিসিএইচকিউ-এর প্রধান অ্যান কিস্ট-বাটলারও মে মাসে সতর্ক করে বলেন, বৃটেন ও ইউরোপের বিরুদ্ধে রাশিয়া তাদের দৈনন্দিন হাইব্রিড কর্মকাণ্ড বাড়িয়ে তুলছে।
সামরিক বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও সাবেক এমপি বব সিলি মনে করেন, স্টর্ম শ্যাডোর নকশা নিয়ে সাম্প্রতিক বিরোধকে রাশিয়া বৃটেনের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ানোর অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে। ‘দ্য নিউ টোটাল ওয়ার’ বইয়ের লেখক সিলি বলেন, স্টর্ম শ্যাডো সত্যিই কার্যকর। কিন্তু এটিকে বড় ধরনের কোনো উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে দেখা উচিত নয়। ইউক্রেনীয়রা নিজেদের দেশে এর উৎপাদন শুরু করতে কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছরও সময় নিতে পারে।

আমার মনে হয়, বিষয়টি মূলত পুতিনের যুদ্ধক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পাওয়া এবং কোনো না কোনোভাবে উত্তেজনা বাড়ানোর মানসিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত। আমার মনে হয়, সিআইএর ওই কর্মকর্তা মস্কো গিয়ে মূলত বলেছিলেন, আমরা তোমাদের ওপর নজর রাখছি। তোমরা কী করছ, আমরা জানি। কোনো ঝামেলা সৃষ্টি কোরো না।

তিনি বলেন, তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এই মুহূর্তে পুতিন আমেরিকাকে প্রধান শত্রু বানাতে চান না। বৃটেন এখন তাদের এক নম্বর শত্রু। দুই দেশের মধ্যে শীতল যুদ্ধের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যার শুরু ১৮২০-এর দশক পর্যন্ত গড়ায়। সাবেক কনজারভেটিভ পার্টির এমপি সিলি মনে করেন, রাশিয়া বৃটেনের বিরুদ্ধে এমন ‘গ্রে জোন’ হামলা চালাতে পারে, যা ন্যাটোর ‘এক সদস্যের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা’। অর্থাৎ আর্টিকেল ৫ সক্রিয় করার মতো পর্যায়ে যাবে না।ফাইল ছবি

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!