ডেইলি খবর ডেস্ক: চীনের গ্রেট হল অব পিপলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ছবি : এএফপি
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আলোচনা, মন্দির পরিদর্শন ও চা পানের পর বেইজিং ছেড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাদের আলোচনা বাণিজ্য থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। দুই শক্তিধর দেশের দুই নেতার দুই দিনের এই সম্মেলন থেকে পাওয়া পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিচে তুলে ধরা হলো
চুক্তি কি হয়েছে? প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন যে তিনি শি’র সঙ্গে চমৎকার বাণিজ্য চুক্তি করেছেন এবং চীনের নেতা শি একটি ঐকমত্যে পৌঁছানোর কথা উল্লেখ করেছেন। তবে কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা বা বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
ট্রাম্প চীনের পক্ষ থেকে মার্কিন বিমান এবং কৃষি পণ্যের বড় ধরনের ফরমায়েশের আশা করছিলেন—যা তার দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য একটি মূল বিষয়।
বেইজিং ত্যাগের পর এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, চীন কয়েক বিলিয়ন ডলারের সয়াবিন কিনবে। তিনি আরও যোগ করেন, চীন বোয়িং থেকে ২০০টিরও বেশি বিমান কিনতে রাজি হয়েছে এবং আরও ৭৫০টি বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে... যদি তারা প্রথম ২০০টি নিয়ে সন্তুষ্ট হয়। সম্মেলনের প্রথম দিন শেষে ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেছিলেন, শি আরও মার্কিন তেল কিনতেও সম্মত হয়েছেন।তবে মার্কিন নেতার চলে যাওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে এই ক্রয় চুক্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা নিশ্চিত বা অস্বীকার কোনোটিই করেনি।
এদিকে, আলোচনার তালিকায় শুল্ক বা ট্যারিফ সংক্রান্ত বিষয়টি আশ্চর্যজনকভাবে বাদ ছিল; ধারণা করা হয়েছিল গত অক্টোবরে হওয়া বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে নেতারা আলোচনা করবেন। তবে, ট্রাম্প জানান যে বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা-চীন ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধকে অবৈধ বলে বর্ণনা করেছে এবং বারবার তা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। চীন নীরবে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে; ট্রাম্পের সফরের এক সপ্তাহ আগে বেইজিং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আতিথেয়তা দিয়েছে এবং বেশ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশের সাথে কথা বলেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, বৃহস্পতিবারের আলোচনায় শি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে সহায়তা করতে রাজি হয়েছেন, যা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে ইরান মূলত অবরুদ্ধ করে রেখেছে।হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, জ্বালানির অবাধ প্রবাহ বজায় রাখতে হরমুজ প্রণালী অবশ্যই খোলা রাখতে হবে—এই বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়েছে।
এই প্রণালি অবরোধের ফলে চীন সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত এবং তারা দীর্ঘ সময় ধরে এখান দিয়ে নিরাপদ যাতায়াতের পক্ষে কথা বলে আসছে। সামুদ্রিক বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের মতে, চীন সমুদ্রপথে যে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে তার অর্ধেকেরও বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।তবে জলপথ খুলে দেওয়ার বিষয়ে শি ট্রাম্পকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করেনি।
তাইওয়ান? কোনো মন্তব্য নেই-চীন ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষের এই স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে এবং কূটনীতির ক্ষেত্রে এটিকে একটি `রেড-লাইন` বা চরম সীমা হিসেবে বিবেচনা করে। যুক্তরাষ্ট্র তাইপের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী হওয়ায় তাইওয়ান নিয়ে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে টানাপোড়েন অনেক গভীর।অস্বাভাবিকভাবে কড়া ভাষায় শি তাঁদের প্রথম দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ট্রাম্পকে সতর্ক করেন যে, তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে ভুল পদক্ষেপ নিলে দুই দেশ ‘সংঘাতের’ দিকে চলে যেতে পারে।বিশ্লেষকরা ধারণা করেছিলেন, বেইজিং এই সম্মেলনকে তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত অবস্থান পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখছে।
ট্রাম্প জানান যে, শি প্রশ্ন করেছিলেন সংঘাতের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন তাইওয়ানকে রক্ষা করবে কি না; ট্রাম্প উত্তরে বলেন, আমি এ বিষয়ে কথা বলছি না।তবে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বৃহস্পতিবার এনবিসি-কে বলেন, তাইওয়ান ইস্যুতে মার্কিন নীতি অপরিবর্তিত রয়েছে।
মাইলফলক-পুরো সফরে ট্রাম্প শি জিনপিংয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, তাঁকে ‘বন্ধু’ ও ‘মহান নেতা’ হিসেবে সম্বোধন করেছেন এবং সেপ্টেম্বরে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্র সফরের আমন্ত্রণও জানিয়েছেন।শি ট্রাম্পের মতো প্রকাশ্যে আবেগ না দেখালেও সৌজন্যের নিদর্শন হিসেবে হোয়াইট হাউসের জন্য কিছু চীনা গোলাপের বীজ পাঠানোর কথা বলেছেন।
চীনা প্রেসিডেন্ট এই সফরকে একটি ‘মাইলফলক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং আগামী তিন বছরের জন্য মার্কিন-চীন সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত করতে ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ নামক একটি নতুন শব্দ চয়নের প্রশংসা করেছেন।পিকিং ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডং ওয়াং বলেন, ‘এটি কেবল পদ্ধতিগত ঐক্যমত্য নয় বরং একটি বড় ধরনের কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন। এটি সংজ্ঞায়িত করে যে, দুই পরাশক্তি কীভাবে সহাবস্থান করবে... যা বিবাদ মোকাবিলার জন্য স্পষ্ট সুরক্ষাকবচ তৈরি করবে।’ট্রাম্পের বিদায়ের পর সিনহুয়া নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, বেইজিংয়ের শীর্ষ কূটনীতিকের মতে শরৎকালে শি যুক্তরাষ্ট্র সফর করতে পারেন।
মানবাধিকার-সফরের আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অনুরোধ করা হয়েছিল তিনি যেন শি’র কাছে মানবাধিকার ইস্যুগুলো তুলে ধরেন, বিশেষ করে কারাবন্দী যাজক এজরা জিন এবং হংকংয়ের মিডিয়া টাইকুন জিমি লাইয়ের মামলার বিষয়ে।এয়ার ফোর্সে ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি তিনি (শি) যাজকের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।’তবে ব্রিটিশ নাগরিক জিমি লাই, যাঁর বিরুদ্ধে বিদেশি ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ২০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে, তাঁর বিষয়ে ট্রাম্প কিছুটা অস্বস্তি প্রকাশ করেন।ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি তার (শি) কাছে বিষয়টি তুলেছিলাম। তিনি বলেছেন জিমি লাইয়ের বিষয়টি তার জন্য কিছুটা কঠিন।’
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার (১৫র মে) আবারও বলেছে যে, তারা ২০১৯ সালে হংকংয়ের বিশাল ও সহিংস গণতন্ত্রকামী আন্দোলনের পেছনে লাই-কে প্রধান পরিকল্পনাকারী এবং অপরাধী মনে করে।
হংকংয়ের থিংক ট্যাংক প্যাগোডা ইনস্টিটিউটের উইলসন চ্যান বলেন, ‘উভয় দেশের সমাধান করার মতো দীর্ঘ তালিকার তুলনায় জিমি লাইয়ের বিষয়টি কোনো পক্ষের জন্যই অগ্রাধিকার নয়।’ছবি-সংগৃহীত

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :