বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল, ২০২৬, ২৫ চৈত্র ১৪৩২

ইরানের ১০ দাবিগুলো কী, যুক্তরাষ্ট্রের মানার সম্ভাবনা কেন ক্ষীণ

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: এপ্রিল ৮, ২০২৬, ১০:১১ পিএম

ইরানের ১০ দাবিগুলো কী, যুক্তরাষ্ট্রের মানার সম্ভাবনা কেন ক্ষীণ

ডেইলি খবর ডেস্ক: যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ১০ দফা প্রস্তাবের একটি রূপরেখা তুলে ধরেছে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদ। এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, ইসলামাবাদে আসন্ন বৈঠকের আগেই যুক্তরাষ্ট্রকে এই ১০ দফা মেনে নিতে বাধ্য করা গেছে।বিবৃতির বরাত দিয়ে মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবগুলোর মধ্যে আছে- ভবিষ্যতে হামলা না করার নিশ্চয়তা, হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, অঞ্চলটি থেকে মার্কিন সেনা সরানো এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দেওয়া।ইরানের প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো মন্তব্য করা হয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন আদৌ এসব দাবি মানবে কি না সেটির একটি পূর্বাভাস দিয়েছে মার্কিন গণমাধ্যম নিউজউইক।
১. হামলা না করার অঙ্গীকার
ভবিষ্যতে আর হামলা না করার বিষয়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থেকে ‘বাধ্যতামূলক’ প্রতিশ্রুতি চাইছে। ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র শত্রুভাবাপন্ন দেশগুলোর সঙ্গে এ ধরনের চিরস্থায়ী চুক্তি এড়িয়ে চলে। কারণ, এমন চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা এবং শত্রু পক্ষকে দমিয়ে রাখার ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রতিশ্রুতি পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ, মার্কিন প্রেসিডেন্টরা এই অঞ্চলের ব্যাপারে ‘সব ধরনের পথ খোলা রাখার’ নীতিতে বিশ্বাসী।
২. হরমুজে নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয়। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে এই প্রণালিকে আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। ইরানের নিয়ন্ত্রণের দাবিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে এবং ‘নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা’ বজায় রাখতে সেখানে একাধিকবার  অভিযানও চালিয়েছে। ফলে, এই জলপথের ওপর ইরানের একক নিয়ন্ত্রণকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়াটা কয়েক দশকের মার্কিন নৌ-নীতি ও সামরিক অবস্থানের সাংঘর্ষিক হবে।
৩. ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি
ইরান চায় তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকারকে ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিক। এর আগে তেহরানের সঙ্গে একাধিক আলোচনায় ইউরেনিয়ামের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। অতীতে কঠোর পর্যবেক্ষণের অধীনে সীমিত মাত্রায় সমৃদ্ধকরণ মেনে নেওয়া হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি দিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত নীতিরই ব্যত্যয় ঘটবে।
৪. প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
বিদ্যমান প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় কোনো মার্কিন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারে না। তেহরানের অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করতে এসব নিষেধাজ্ঞাই যুক্তরাষ্ট্রের বড় হাতিয়ার। তদারকির ব্যবস্থা ছাড়া সব ধরনের প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেওয়া হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা নাটকীয়ভাবে কমে যাবে। তাই, ইরানের এই দাবি পুরোপুরি পূরণের সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে একটি বৃহত্তর চুক্তির অংশ হিসেবে আংশিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়টি বিবেচনাযোগ্য হতে পারে।
৫. মাধ্যমিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বিদেশি কোম্পানি এবং সরকারগুলোকে নিরুৎসাহিত করার প্রক্রিয়াকে ‘মাধ্যমিক নিষেধাজ্ঞা’ বলা হয়। এই নিষেধাজ্ঞাগুলো সরিয়ে নিলে ইরানের জন্য বিশ্ববাজারের দ্বার উন্মুক্ত হবে। মিত্র দেশগুলোর নীতির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবও কমে যাবে। ঐতিহাসিকভাবে শুধু কঠোর ও সুনির্দিষ্ট পরমাণু চুক্তির অধীনেই ওয়াশিংটন এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে।
৬. নিরাপত্তা পরিষদের বিধিনিষেধ
ইরান তাদের পারমাণবিক ও সামরিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সব পদক্ষেপ বা বিধিনিষেধের অবসান ঘটানোর দাবি জানিয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে ওয়াশিংটন তেহরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এ ধরনের বহুপাক্ষিক ব্যবস্থায় সমর্থন দিয়ে এসেছে। তবে তারা একতরফাভাবে এ ধরনের প্রস্তাবগুলো বাতিল করতে পারে না। এই দাবি বাস্তবায়ন করতে হলে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্যের প্রয়োজন। যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিকভাবে প্রায় অসম্ভব।
৭. পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা
ইরানের পারমাণবিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রস্তাবগুলো প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ নীতির একটি মূল স্তম্ভ হলো আইএইএর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন। ওয়াশিংটন বরাবরই এই তদারকি ব্যবস্থাকে ‘অপরিবর্তনীয়’ হিসেবে গণ্য করে। ফলে ইরানের এই দাবিটি মৌলিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
৮. ক্ষতিপূরণ দেওয়া
যুদ্ধে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত শত্রুভাবাপন্ন কোনো সরকারকে যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দেয় না। বিশেষ করে যেখানে হামলার দায়বদ্ধতা ও বৈধতা নিয়ে বিতর্ক থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এবং আইনি ক্ষেত্রে এ ধরনের অর্থ প্রদানের বিষয়টি বাধার মুখে পড়বে।
৯. সেনা প্রত্যাহার
ইরান মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী পুরোপুরি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। তবে এখানে বিপত্তি হলো- আঞ্চলিক মিত্রদের দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি। তেহরানের শর্ত মেনে সেনা প্রত্যাহার করা হলে তা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক কৌশলের পরিপন্থী হবে।
১০. আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি
ইরান তাদের মিত্রদের ওপর হামলা বন্ধের দাবি জানিয়েছে। অর্থ্যাৎ, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার ‍যুদ্ধসহ সব সংঘাতে অস্ত্রবিরতি নিশ্চিত করতে হবে। ইসরায়েল এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, লেবানন বর্তমান যুদ্ধবিরতির আওতায় পড়বে না। ভিন্ন যুদ্ধকে ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহী হওয়ার সম্ভাবনাও তাই ক্ষীণ। সংগৃহীত ছবি

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!