ডেইলি খবর ডেস্ক: প্রায় কাছাকাছি সময়ে দুটি খবর সামনে এসেছে। ইসরায়েলি গণমাধ্যম জেরুজালেম পোস্ট জানিয়েছে, হুতিদের মোকাবিলায় ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তা চেয়েছে সৌদি আরব। অপরদিকে রয়টার্সের খবর- গোষ্ঠীটির সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তারা বৈঠক করেছেন। তাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
ঐতিহাসিকভাবে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। অপরদিকে হুতিদের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে ওয়াশিংটন। কিন্তু সাম্প্রতিক দুটি খবর তিন দেশের অবস্থানের ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। প্রশ্ন উঠেছে, হুতিদের ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও ইসরায়েলের অবস্থানে এমন পরিবর্তন কেন?
বর্তমান অবস্থানের কারণ নিয়ে কোনো পক্ষই সরাসরি বক্তব্য দেয়নি। তবে পেছনের ঘটনাপ্রবাহ খুঁজলে অন্তত গত জুলাই থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সামনে আসে।
হুতির সাগর, সৌদির তেল
ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি প্রায় সাত মাস ধরে অচল। এই সময়ে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হয়ে ওঠে লোহিত সাগর। সাগরটিতে জাহাজ প্রবেশ ও বের হয় বাব এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে।
সম্প্রতি হুতি বিদ্রোহীরা প্রণালির নিকটবর্তী মোখা বন্দর ও পারিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয়। প্রণালির মাঝখানে অবস্থিত হওয়ায় পারিম থেকে জাহাজ চলাচলের ওপর নজর রাখা যায়। এতদিন সেখানকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিল সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারের বাহিনী। হুতিদের আক্রমণের মুখে ১০ সেপ্টেম্বর তারা দ্বীপটি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।
এর ফলে বাব এল-মান্দেবের ওপর হুতিদের প্রভাব ও নজরদারির সক্ষমতা বেড়েছে। গত বুধবার বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে লিখেছে, পারিম দ্বীপ হাতছাড়া হওয়ার বিষয়টি গোয়েন্দা ব্যর্থতা, সৌদি আরবের মিত্র ইয়েমেনি বাহিনীর ভেঙে পড়া এবং মার্কিন সুরক্ষা বলয়ের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করেছে।
এসব ঘটনাপ্রবাহ সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও তেল রপ্তানি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। দেশটির অর্থনীতিতে তেল খাতের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি জেনারেল অথরিটি ফর স্ট্যাটিস্টিকসের (জিএএসটিএটি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরে দেশটির মোট রপ্তানির ৬৭ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল তেল।
সৌদি কেন ইসরায়েলমুখী?
ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের (১৯৪৮) পর থেকে আরব রাষ্ট্রগুলো তেল আবিবের সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব বজায় রেখে আসছে। সৌদি আরব এখনো ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেনি।
তবে হুতিদের আক্রমণের প্রেক্ষাপটে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হওয়ার খবর দিয়েছে জেরুজালেম পোস্ট। আঞ্চলিক কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমটি জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডের (সেন্টকম) মধ্যস্থতায় সম্প্রতি রিয়াদ-তেল আবিবের মধ্যে আলোচনা হয়। এতে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে হুতিদের অবস্থানের বিষয়ে সৌদিকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
রয়টার্সের বরাত দিয়ে গত মঙ্গলবার মিডলইস্ট মনিটর জানায়, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সরাসরি ওয়াশিংটনের কাছে সামরিক সহযোগিতার অনুরোধ করেছিলেন। এরপর ইসরায়েলের সহায়তার খবর সামনে আসে। তবে দুই পক্ষের কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে এসব প্রতিবেদনের তথ্য নিশ্চিত করেনি।
এর আগে সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্কের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। যেমন- আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে যুক্তরাষ্ট্র বেশ কয়েক বছর ধরে মধ্যস্থতা করে আসছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে শুরু হওয়া এই প্রচেষ্টা ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ নামে পরিচিত। কয়েকটি দেশ এতে স্বাক্ষর করলেও গাজা যুদ্ধের পর সৌদি আরব এতে যোগ দেয়নি।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আবারও আব্রাহাম অ্যাকর্ডস বাস্তবায়নে মনোযোগ দিয়েছে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব। গত ২২ জুলাই সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি করে যুক্তরাষ্ট্র। একদিন পর ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, রিয়াদ আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করলেই এই চুক্তি বাস্তবায়ন হবে।
অর্থাৎ, ২২ জুলাই পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির ঘোষণা এবং ২৩ জুলাই ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্ত সামনে আসে।
জেরুজালেম পোস্ট লিখেছে, সৌদি-ইসরায়েলের মধ্যে বেশ কয়েকটি অভিন্ন নিরাপত্তা স্বার্থ আছে। দুই পক্ষ কীভাবে একটি কূটনৈতিক চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে, সে ব্যাপারেও রূপরেখা তৈরির আশা করা হচ্ছে।
হুতি-যুক্তরাষ্ট্র কেন কাছাকাছি?
হুতিরা পারিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সম্প্রতি ওমানে বৈঠক করেন মার্কিন কর্মকর্তারা। কয়েকটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, মাসকাটে মার্কিন দূতাবাসে ওই বৈঠক হয়। ওমান সরকার বৈঠকটি আয়োজনে সহযোগিতা করে।
ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৫ সালের মার্চে হুতিদের ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা দেয়। এরপরও তাদের সঙ্গে আলোচনা হলো। বৈঠকে হুতিরা মার্কিন কর্মকর্তাদের জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো জাহাজে হামলা চালানোর ইচ্ছা তাদের নেই। একইসঙ্গে তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে ২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতি মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দেয়।
ইয়েমেনি একটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, হুতিরা ইসরায়েলি জাহাজ বা কোনো বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাবে না। তবে সৌদি আরবের মালিকানাধীন জাহাজের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হবে। অপরদিকে গত সোমবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র গোষ্ঠীটির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখছে। তবে তিনি বিস্তারিত জানাননি।
অর্থাৎ, হুতিদের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করার পরও তাদের সঙ্গে যোগাযোগের একটি পথ খোলা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর সঙ্গে লোহিত সাগরে নৌ চলাচল ও নিজেদের জাহাজের নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত বলে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে।
জার্মানিতে ‘গোপন’ বৈঠক
হুতিদের সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তাদের আলোচনার আগে গত সপ্তাহে জার্মানিতে এক বৈঠকে অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের সামরিক বাহিনীর প্রধানরা। দেশগুলোর সবাই আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে স্বাক্ষর করেছে।
বৈঠকে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, জর্ডান ও মিসরের সামরিক প্রধানরাও অংশ নিয়েছিলেন। ১৫ সেপ্টেম্বর মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, এটি ছিল গোপন বৈঠক। শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং অঞ্চলটির বৃহত্তর উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা করেন। সেন্টকম কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বৈঠকের আয়োজন করেন।
অ্যাক্সিওস লিখেছে, ইসরায়েল ও আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক কমান্ডারদের একসঙ্গে বৈঠক এবং যুদ্ধ নিয়ে মতবিনিময়ের ঘটনা বিরল। কারণ, অধিকাংশ আরব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।
হুতিরা কত বড় হুমকি?
এক সময়ের সংখ্যালঘু গোষ্ঠী থেকে হুতিরা ইয়েমেনে উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত গুরুত্ব অর্জন করেছে। গত বুধবার তারা সৌদি আরবের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার কথা জানায়। সামরিক শাখার মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারে বলেন, স্থানীয়ভাবে তৈরি একটি অস্ত্র দিয়ে জেটটি ভূপাতিত করা হয়।
এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৪ সেপ্টেম্বর গোষ্ঠীটি সৌদির খামিস মুশাইতে কিং খালিদ বিমানঘাঁটির হ্যাঙ্গার, রাডার, রানওয়ে ও গোলাবারুদের গুদাম লক্ষ্য করে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এতে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন ইয়াহিয়া সারে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের একটি প্যানেল ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলেছে, কারিগরি সহায়তা ও নিজস্ব উৎপাদন- দুইভাবেই হুতিরা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির সক্ষমতা উন্নত করেছে। সংস্থাটির আরেক প্রতিবেদনে ২০২৩ সালে ড্রোন, রাসায়নিক কাঁচামালসহ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিভিন্ন উপাদান এবং ইরানে তৈরি ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র জব্দ করার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
হুতিদের এই সক্ষমতা অর্জনের পেছনে ইরানের সমর্থনকে দায়ী করা হয়। তবে অস্ত্র সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ তেহরান নাকচ করে আসছে।
বৃহস্পতিবার রয়টার্স এক প্রতিবেদনে লিখেছে, হুতিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দূরের ইসরায়েল পর্যন্ত পৌঁছানোর সক্ষমতা আছে। গত বছর তাদের ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র দেশটির প্রধান বিমানবন্দর এলাকার কাছে আঘাত হেনেছিল।
উল্টো সমীকরণের অর্থ কী?
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখলে মনে হতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যে পুরোনো শত্রু-মিত্রের সমীকরণ যেন উল্টে যাচ্ছে। কিন্তু ঘটনাগুলোকে একটু আলাদা করে দেখলে তিন দেশের স্বার্থের পার্থক্য স্পষ্ট হয়।
ইয়েমেনে হুতিদের অগ্রযাত্রা সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ও নিরাপত্তা হুমকির কারণ। অপরদিকে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীটির সামরিক সক্ষমতা ইসরায়েলকে ভাবিয়ে তুলেছে। ফলে গোষ্ঠীটিকে নিয়ে রিয়াদ ও তেল আবিবের কিছু অভিন্ন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র হুতিদের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করলেও, নিজেদের নৌ চলাচলের স্বার্থকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা সম্ভবত নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানি বাজার আরও অস্থির দেখতে চাইবে না।
জার্মানিতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও আরব দেশগুলোর সামরিক কর্মকর্তাদের বৈঠকও দেখাচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে মতভেদ থাকলেও উপসাগরীয় দেশগুলো নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সমীকরণ; মিত্র বদলের চেয়ে স্বার্থ ও কৌশলের গুরুত্বকেই বেশি স্পষ্ট করছে।এক্সপ্লেইনার

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :