ডেইলি খবর ডেস্ক: ইয়েমেনের হুতিদের দ্রুত অগ্রযাত্রা এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মানদেব ঘিরে বাড়তে থাকা নিরাপত্তা সংকটের মধ্যে সৌদি আরব ও মিসরের ঘনিষ্ঠতা নতুন মাত্রা পাচ্ছে।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সাম্প্রতিক বৈঠক এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন লোহিত সাগরের নৌপথ, সৌদি তেল অবকাঠামো এবং সুয়েজ খাল—তিনটিই আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাবে ঝুঁকির মুখে।
১৫ সেপ্টেম্বর কায়রোতে সিসির সঙ্গে বৈঠক করেন মোহাম্মদ বিন সালমান। বৈঠকে দুই নেতা বাব আল-মানদেব, লোহিত সাগর ও আন্তর্জাতিক নৌপথে অবাধ ও নিরাপদ চলাচলের গুরুত্বের ওপর জোর দেন। সিসি একই সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন জানান এবং ইয়েমেন সংকটের একটি ‘সর্বাত্মক ও টেকসই রাজনৈতিক সমাধানের’ পক্ষে অবস্থান নেন।
বৈঠকের কয়েক দিন আগেই ইরান-সমর্থিত হুতি বাহিনী ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং বাব আল-মানদেবের আশপাশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে। একই সময়ে সৌদি আরব ইয়েমেনে বিমান হামলা চালিয়েছে এবং দেশটির তেল অবকাঠামোও হুতিদের হামলার লক্ষ্য হয়েছে। ফলে রিয়াদ এখন নিজেদের নিরাপত্তার পাশাপাশি লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক নৌপথ সুরক্ষায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
সৌদির জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ মিসর?
বিশ্লেষকদের মতে, লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিয়ে সৌদি আরব ও মিসরের স্বার্থ অনেকটাই অভিন্ন। কারণ বাব আল-মানদেব প্রণালির দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলো লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খালে প্রবেশ করে। ফলে এই নৌপথে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে সৌদি আরবের তেল রফতানি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তেমনি সুয়েজ খালের আয়ও কমে যেতে পারে।
মিসরের সিনেট সদস্য ও কায়রোর নীতিনির্ধারণী মহলের ঘনিষ্ঠ আবদেল মোনেম সাঈদ মনে করেন, হুতিদের অগ্রযাত্রা সরাসরি মিসরের অর্থনীতি ও সুয়েজ খালের ওপর চাপ তৈরি করছে। তার মতে, ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর মোকাবিলায় মিসর ও সৌদি আরবের মধ্যে কৌশলগত ও সামরিক সমন্বয় প্রয়োজন।
কিংস কলেজ লন্ডনের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, কায়রো এখন সুয়েজ খাল থেকে বাব আল-মানদেব পর্যন্ত এলাকাকে একটি ধারাবাহিক নিরাপত্তা অঞ্চল হিসেবে দেখছে। বাব আল-মানদেব অনিরাপদ হয়ে পড়লে মিসর জাহাজ চলাচল, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং কৌশলগত প্রভাব—তিন ক্ষেত্রেই ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
‘নতুন আরব ব্যবস্থা’র ইঙ্গিত
সিসি ও মোহাম্মদ বিন সালমানের বৈঠকের আগে মিসরের পার্লামেন্টের আরববিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সালাহ আবু হেমিলা বলেছিলেন, এই সফর আরব ও আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে রাজনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার একটি নতুন রূপরেখার সূচনা করতে পারে।
তার মতে, মিসর-সৌদি সম্পর্ক একটি শক্তিশালী ও সমন্বিত নতুন আরব আঞ্চলিক কাঠামোর ভিত্তি হতে পারে। এর অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে থাকবে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা। পাশাপাশি ফিলিস্তিন, ইয়েমেন, লিবিয়া ও সুদানের পরিস্থিতিও আলোচনায় থাকবে।
সিসির কার্যালয় থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতেও মিসর ও সৌদি আরবের নিরাপত্তাকে বৃহত্তর আরব নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
কতটা সামরিক সহায়তা দেবে মিসর?
এখন পর্যন্ত সিসি-মোহাম্মদ বিন সালমান বৈঠকের পর দুই দেশের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনও নতুন সামরিক চুক্তি বা ইয়েমেনে যৌথ সামরিক অভিযান নিয়ে ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
তবে মিসর ইতোমধ্যেই সৌদি নেতৃত্বাধীন লোহিত সাগরের সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোটের অংশ। আগস্টে গঠিত এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল লোহিত সাগর ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সময়ে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি এবং বাব আল-মানদেব—দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিয়েই আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ে।
বিশ্লেষক ক্রিগের মতে, মিসর-সৌদি সামরিক সহযোগিতা বাড়লে তার আওতায় গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামুদ্রিক নজরদারি, বাণিজ্যিক জাহাজের সুরক্ষা এবং লোহিত সাগরে সামরিক সমন্বয় বাড়তে পারে।
তবে ইয়েমেনের অভ্যন্তরে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে মিসরের সীমা থাকবে বলেই মনে করছেন তিনি। অর্থাৎ, কায়রো লোহিত সাগরের নৌপথ রক্ষায় ভূমিকা রাখতে আগ্রহী হলেও ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়তে চাইবে না।
এর পেছনে মিসরের অতীত অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬০-এর দশকে তৎকালীন মিসরীয় নেতা গামাল আবদেল নাসের উত্তর ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হাজার হাজার সেনা পাঠিয়েছিলেন। দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সেই সামরিক অভিযানে মিসরের উল্লেখযোগ্য প্রাণহানি ঘটে এবং প্রত্যাশিত ফলও আসেনি।
ফলে ইয়েমেন নিয়ে কায়রোর নীতিতে সেই অভিজ্ঞতার প্রভাব থাকতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
ইরান-সমর্থিত হুতিদের অগ্রযাত্রা
সাম্প্রতিক সময়ে হুতিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে দ্রুত অগ্রসর হয়ে মোখা বন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখলে নিয়েছে। তারা বাব আল-মানদেবের কাছের মায়ুন দ্বীপ ও ধুবাব এলাকাতেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে লোহিত সাগরের আন্তর্জাতিক নৌপথ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, হুতিরা গত কয়েক দশকে একটি স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী থেকে এমন একটি আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যারা নৌপথ ও তেল অবকাঠামোয় হামলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের জন্য লোহিত সাগরের নিরাপত্তা শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক বিষয়ও হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মিসর-সৌদি সমঝোতার সঙ্গে সুদানের যোগসূত্র
ইয়েমেন ছাড়াও মিসর ও সৌদি আরবের মধ্যে সুদানসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতে দৃষ্টিভঙ্গির মিল রয়েছে।
মিসরের সরকারি তথ্যসেবা জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বৈঠকে দুই দেশ সুদানের ঐক্য ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার যেকোনও হুমকিকে মিসর, সৌদি আরব ও পুরো অঞ্চলের সম্মিলিত নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বিশ্লেষক ক্রিগের মতে, দুই দেশই রাষ্ট্রের বিভক্তি, সশস্ত্র মিলিশিয়া, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী এবং বাইরের শক্তির সমর্থন পাওয়া অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন। সুদান, লিবিয়া, সোমালিয়া ও এখন ইয়েমেনেও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
সৌদি-আমিরাত দ্বন্দ্বে কঠিন ভারসাম্য
তবে মিসরের জন্য সৌদি আরবের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো পুরোপুরি সহজ নয়। কারণ মিসরের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতেরও ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
সুদানের যুদ্ধে আমিরাতের বিরুদ্ধে র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস বা আরএসএফকে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে। আমিরাত এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। অন্যদিকে মিসর সুদানের কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
ইয়েমেনেও সৌদি আরব ও আমিরাতের নীতিতে পার্থক্য রয়েছে। এর ফলে কায়রোকে রিয়াদ ও আবুধাবির সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।
বিশ্লেষক ক্রিগের মতে, মিসর সম্ভবত নিরাপত্তার প্রশ্নে সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে, কিন্তু একই সঙ্গে আমিরাতের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কও ধরে রাখবে।
এখানে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে মিসরে আমিরাতের নিট বিনিয়োগ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের দ্বিগুণেরও বেশি—যা কায়রোর জন্য আবুধাবির অর্থনৈতিক গুরুত্বের বিষয়টি স্পষ্ট করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন নিরাপত্তা কাঠামো?
সৌদি আরব সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তায় একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। পাকিস্তান ও তুরস্ককে যুক্ত করে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি, লোহিত সাগরে বহুপক্ষীয় সামুদ্রিক নিরাপত্তা উদ্যোগ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চাওয়ার মতো পদক্ষেপ তারই অংশ।
তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা দেখিয়েছে, বিভিন্ন নিরাপত্তা অংশীদার থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরবকে এখনো সরাসরি নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
মিসরের সঙ্গে নতুন করে নিরাপত্তা সমন্বয় সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ হতে পারে—যেখানে সৌদি আরব একক কোনও পরাশক্তির ওপর নির্ভর না করে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক একাধিক অংশীদারকে নিয়ে নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে চাইছে।
ইয়েমেনে সামরিক সমাধানের বদলে রাজনৈতিক পথ
সিসি-মোহাম্মদ বিন সালমান বৈঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মিসর ইয়েমেন সংকটের ‘সর্বাত্মক ও টেকসই রাজনৈতিক সমাধানের’ প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
এটি ইঙ্গিত দিতে পারে যে, লোহিত সাগরের নৌপথ রক্ষায় সামরিক সহযোগিতা বাড়লেও ইয়েমেনের অভ্যন্তরে সরাসরি বড় ধরনের সামরিক অভিযানে যাওয়ার বিষয়ে কায়রো সতর্ক থাকবে।
অর্থাৎ, সৌদি আরবকে লোহিত সাগরের নিরাপত্তায় সহায়তা করার ক্ষেত্রে মিসরের ভূমিকা সম্ভবত গোয়েন্দা তথ্য, নৌ নজরদারি, বাণিজ্যিক জাহাজের সুরক্ষা এবং আঞ্চলিক সামরিক সমন্বয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা থাকবে। ইয়েমেনের দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়া এড়ানোই কায়রোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সাম্প্রতিক বৈঠক তাই শুধু মিসর-সৌদি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নয়; বরং বাব আল-মানদেব, সুয়েজ খাল, সৌদি তেল রফতানি এবং বৃহত্তর আরব নিরাপত্তাকে ঘিরে পরিবর্তিত আঞ্চলিক সমীকরণেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে মিসর শেষ পর্যন্ত কতটা সামরিকভাবে এগোবে, তা নির্ভর করবে হুতিদের অগ্রযাত্রা, লোহিত সাগরের নৌপথের পরিস্থিতি এবং ইয়েমেন সংকট রাজনৈতিকভাবে সমাধানের সম্ভাবনার ওপর। ছবি-সংগৃহীত.সূত্র: আল-জাজিরা

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :