বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০

জিরো টলারেন্সেও দুর্নীতি বেপরোয়া

প্রকাশিত: ০৪:৩৬ এএম, জানুয়ারি ২৯, ২০২১

জিরো টলারেন্সেও দুর্নীতি বেপরোয়া

বিশ্বে আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ অষ্টম হলেও তিন কোটি টাকা ব্যয়ে এর চাষাবাদ দেখতে বিদেশ যেতে চান কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ৪০ কর্মকর্তা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য খিচুড়ি রান্না শিখতে এক হাজার কর্মকর্তাকে বিদেশ সফর করানোর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রস্তাব নিয়ে সর্বত্র সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। শুধু আলু কিংবা খিচুড়ি রান্নাই নয়, গরুর প্রজনন, ধান চাষ, ঘাস চাষ, পুকুর খনন, লিফট দেখাসহ তুচ্ছ বিষয়ে অহেতুক বিদেশ ভ্রমণে বিরাট ব্যয়ের প্রস্তাবে রেকর্ড গড়েছেন সরকারি কর্মকর্তারা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণার পরও রাজনীতির ছত্রচ্ছায়ার কেনাকাটা, ব্যাংক জালিয়াতি, অর্থপাচার ও সরকারি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর নজিরবিহীন দুর্নীতি আলোচনায় আসছে। এর মধ্যেই ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) ২০২০ সালের দুর্নীতির ধারণা সূচকে (সিপিআই) দুই ধাপ অবনতি হয়েছে বাংলাদেশের। বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম। এর পেছনে করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক দুর্নীতির বিষয়টিকে অন্যতম কারণ মনে করছে টিআইবি। সরকারের সদিচ্ছা সত্ত্বেও দুর্নীতি হ্রাস করার জন্য যে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেটা দুর্নীতি হ্রাসে সহায়ক নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতিকে কেন্দ্র করে যে কিছু দৃষ্টান্ত দেখা যাচ্ছে, তার পেছনের রাঘব বোয়ালদের বিচারের আওতায় আনা বা জবাবদিহি নিশ্চিত করা বাস্তবে সম্ভব হয়নি। ফিন্যানশিয়াল, ব্যাংকিং কিংবা ক্রয় খাতের আলোচিত বড় বড় ঘটনার ক্ষেত্রেও সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের ধরাছোঁয়া বা জবাবদিহির বাইরে থাকতে দেখা গেছে। যে কারণে বেড়েছে দুর্নীতির ব্যাপকতা। বিশ্লেষকরা বলছেন, দুর্নীতির ধারণা সূচকে যদি প্রত্যাশিত অগ্রগতি হতো, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরো ২ থেকে ৩ শতাংশ বেশি হতো। তাই সরকার আগামী পাঁচ বছরে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখিয়েছে, তা বাস্তবায়ন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতি কমানোর আরো জোরালো পদক্ষেপ চান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। টানা তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর সচিবালয়ে গিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছিলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বাড়ানো হয়েছে, ফলে এখন দুর্নীতির প্রয়োজন নেই। দুর্নীতি করলেই সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে হবে। জঙ্গিবাদ দমনের মতো দুর্নীতির বিরুদ্ধেও জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে অবস্থান নিয়েছেন, তা রাজনৈতিক সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ, যাকে সাধুবাদ জানান সমাজের সর্বমহল ও বিশিষ্টজনরা। কিন্তু এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার অভাব, দুর্নীতিবাজদের পক্ষে রাজনৈতিক প্রভাব ইত্যাদি কারণে জিরো টলারেন্সের পূর্ণ বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। টিআইবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে টিআই প্রতিবেদনে তালিকাভুক্ত হয়েছিল। পরে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের অবস্থান এগিয়ে আসতে থাকে। তবে টানা তিন বছর বাংলাদেশের স্কোর ১০০-এর মধ্যে ২৬-এ আটকে আছে। এর কারণে জানতে চাইলে দুর্নীতি নিয়ে কাজ করা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘কোন খাতে বেশি দুর্নীতি হচ্ছে সেটির কোনো তুলনামূলক চিত্র নেই। তবে সরকারি ক্রয় খাতে বেশি দুর্নীতি হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং ও অন্যান্য ফিন্যান্স খাতেও দুর্নীতির চিত্র দেখা যাচ্ছে। ঋণখেলাপি থেকে শুরু করে নানা রকমের স্বেচ্ছাচারিতা করতে দেখা যায়। স্বাস্থ্য ও সেবা খাতেও দুর্নীতির ব্যাপকতা বেড়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনিয়ম অন্যতম। এমন কোনো খাত নেই, যেখানে দুর্নীতি হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘২০০১ সালে দুর্নীতির সূচকে প্রথম বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত হয়। তখন থেকে নম্বর বেশি পাওয়া শুরু করেছি আমরা। এরপর দুর্নীতিতে ১২তম স্থানে আসে বাংলাদেশ। এটি আমাদের জন্য উদ্বেগজনক। দুর্নীতির ব্যাপকতা দেশের সর্বনিম্ন পর্যায় থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। সরকার যে দুর্নীতির বিষয়ে জোরালো অবস্থান ঘোষণা করেছে, তা রাজনৈতিক সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু দুদকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সঠিক ও কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারছে না। সে কারণেই দুর্নীতি বেশি বাড়ছে। গত ১০ বছরে যাদের রাঘব বোয়াল বলা হয়, তাদের বিরুদ্ধে কোনো রকমের আইনের প্রয়োগ নেই। প্রধানমন্ত্রী তো একা দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করেন না। যে প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন করার জন্য করা হয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানের একাংশ দুর্নীতির অংশীদার ও সুবিধাভোগী।’ ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘পাসপোর্ট, ভূমি অফিসসহ আমরা এমপি পাপুল, শাহেদদের মোটাদাগের দুর্নীতি দেখেছি। সরকার যদি এদেরকে না ধরত, তাহলে তো আমরা জানতে পারতাম না। দুর্নীতিবাজ হিসেবে যারা প্রমাণিত তাদেরকে এখন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যা অন্যদের জন্য বার্তা বয়ে আনবে। যেসব মোটাদাগের দুর্নীতির বদনাম বের হয়েছে, তাদের মধ্যে কমসংখ্যক ধরা পড়েছে। আবার অনেকে বেরিয়ে গেছে। তাই দায়মুক্তির যে সংস্কৃতি আছে, এর অবসান না করতে পারলে দুর্নীতি কমবে না।’ তিনি বলেন, দুর্নীতির বড় অপচয় রোধ করতে জাতীয় ই-গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) নিয়ে আসা হয়েছে। টেন্ডার প্রকিউরমেন্ট সাবমিট করার সময় যে দুর্নীতি হতো, সেগুলো বন্ধ হয়েছে। তবে প্রকল্পগুলোতে যে হিসাব-নিকাশগুলো করা হচ্ছে, সেখানে শুরু থেকেই দুর্নীতির একটা জায়গা করে নেওয়া হচ্ছে। মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাজারমূল্যের চেয়ে দুই বা তিন গুণ মূল্য বেশি ধরা হচ্ছে। পরিমাণের ক্ষেত্রেও পরিমাণের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। পরামর্শক ব্যয়ের ক্ষেত্রে ও ভ্রমণের ক্ষেত্রে দুর্নীতি দেখা যায়। এগুলোর ক্ষেত্রে কারো পকেটে টাকা না গেলেও সরকারের অর্থ তো খরচ হচ্ছে, তাই এগুলোও কিন্তু দুর্নীতি। গাড়ি কেনার ক্ষেত্রেও প্রচুর দুর্নীতি দেখা যায়। এগুলো শুধু প্রকিউরমেন্ট আইনের ধারায় দুর্নীতিমুক্ত রাখা যাবে না। অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের যে ব্যবস্থা আছে সেটাকে কাজে লাগাতে হবে। এগুলো ঠিক করতে না পারলে সরকারি ব্যয়ে দুর্নীতি কমানো সম্ভব নয়। এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘আমার একটা ধারণা ছিল, মুখোশ যদি খোলা যেতে পারে তাহলে অন্তত লজ্জা-শরমের কারণে বা ভয়ে দুর্নীতি কমবে। কিন্তু এখন মুখোশ খুলে দিলেই হয় না। কাজেই মুখোশ খুলে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু যথেষ্ট না। সে জন্য বিচার-বিবেচনা যদি সুষ্ঠুভাবে শেষ হয় এবং কিছু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হয়, তাহলে এটি অনেকে গুরুত্বর সাথে দেখবে। তাই দুর্নীতির সুযোগ কমাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। মানুষ সাক্ষাৎ ছাড়াই অনলাইনেই যদি সব করতে পারে, তাহলে তো সাক্ষাৎকারের বিষয়টি আর থাকে না। মূলত সাক্ষাতের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিয়ে অনলাইনে কাজগুলো সম্পাদন যাতে করা যায়, তাহলে দুর্নীতির সুযোগ কমে যাবে।’ সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেছেন, ‘প্রকল্পের দুর্নীতি কমাতে প্রকল্পগুলো যখন পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের জন্য যায় কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে একনেকে যায়, তখনই এগুলো ভালো করে যাচাই-বাছাই করে দেখা উচিত।’ দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ গণমাধ্যমকে বলেন, স্বাস্থ্য খাতের ব্যবস্থাপনা বা পদ্ধতির মধ্যেই দুর্নীতির উৎস রয়েছে। তাঁরা গবেষণায় এমন চিত্র পেয়েছেন। তিনি বলেন, পদ্ধতির সংস্কার ছাড়া কোনো দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব নয়।
Link copied!