বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

ট্রাম্পের ফলাফল বিপর্যয়ে তেহরানের সমাবেশে হাজারো মানুষের উপহাস

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: নভেম্বর ৪, ২০২৬, ০৮:২৯ পিএম

ট্রাম্পের ফলাফল বিপর্যয়ে তেহরানের সমাবেশে হাজারো মানুষের উপহাস

ডেইলি খবর ডেস্ক: ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মার্কিন ভোটাররা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকানদের হাত থেকে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে ইরানের সাধারণ জনতা। এর অংশ হিসেবে আজ বুধবার (৪ নভেম্বর) তেহরানে অবস্থিত সাবেক মার্কিন দূতাবাসের বাইরে আয়োজিত বার্ষিক যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী সমাবেশে অংশ নিতে সমবেত হন হাজার হাজার মানুষ। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।

বিক্ষোভকারীরা ইরানি পতাকা নাড়িয়ে এবং ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যানার বহন করার সময় মধ্য তেহরান জুড়ে ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ এবং ‘ইসরায়েল নিপাত যাক’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে।

এই বিক্ষোভ সমাবেশে একটি ব্যানারে ট্রাম্পকে রশিতে বাঁধা এক রক্তমাখা বুলডগ হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়, যার রশি ধরে রয়েছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতো দেখতে শয়তান আকৃতির এক অবয়ব।

অন্যান্য ব্যানারে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়, যিনি ফেব্রুয়ারির শেষভাগে এই আঞ্চলিক সংঘাতের সূচনা ঘটানো মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন।

সমাবেশে জনতার ভিড়ের ওপর উঁচিয়ে রাখা একটি বিশাল ডিসপ্লেতে লেখা ছিল, ‘মূল্য নির্ধারণ করে ইরানের জনগণ।’

এর ঠিক পাশেই বিশ্বের মানচিত্রের ওপর সাজানো ছিল কালো রঙের তেলের ড্রাম, যা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে লাগামহীন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে প্রদর্শিত হয়।

এ সময় ৪০ বছর বয়সী মাহমুদখানি বলেন ‘আমেরিকা আমাদের বছরের পর বছর ধরে কষ্ট দিয়ে আসছে, কিন্তু তারা ইরানের কিছুই করতে পারেনি।’ ১৯৭৯ সালে মার্কিন দূতাবাস দখল এবং পরবর্তী জিম্মি সংকটকে স্মরণ করে আয়োজিত এই সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন তিনি।

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের মারাত্মক বিপর্যয়ের ঠিক পরদিনই এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, যাকে ট্রাম্পের উত্তাল দ্বিতীয় মেয়াদের ওপর একটি গণভোট হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ঘনঘন শুল্ক পরিবর্তন এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাত এক বড় ভূমিকা পালন করেছে।

মাহমুদখানি বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ায় আমরা আনন্দিত নই। তবে এটা জেনে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যায় যে আমরা আর একা এই যন্ত্রণা ভোগ করছি না। এত বছর ধরে কেবল আমরা একাই নিষেধাজ্ঞার শিকার হয়ে কষ্ট পেয়েছি।’

বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি চোকপয়েন্টগুলোর একটি এই হরমুজ প্রণালিকে তেহরানের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবির ফলে জাহাজ চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে; যার জবাবে ওয়াশিংটন ইরানের সমুদ্রবন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ আরোপ করে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।

মাজিদ হায়দারি (৬২) নামের এক বস্ত্র উৎপাদক মন্তব্য করেন, তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিক্রিয়া আমেরিকানদের ভোটে প্রভাব ফেলেছে।

মাজিদ হায়দারি বলেন, ‘ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন আমাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন আমাদেরও নিজেদের হাতিয়ার (হরমুজ বন্ধ করা) ব্যবহার করতে হবে। সরকারগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য তাদের নিজেদের জনগণকে এর পরিণতি অনুভব করানো ছাড়া আমাদের কিছু করার নেই।’

তা সত্ত্বেও, মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল সাধারণ ইরানিদের জন্য খুব বেশি কিছু পরিবর্তন করবে কিনা তা নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।

৪২ বছর বয়সী সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তা মোহাম্মদও একই মত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি ডেমোক্র্যাট হোক বা রিপাবলিকান, আমাদের জন্য কোনো পার্থক্য নেই। গত ৫০ বছর ধরে ইরানি জনগণের প্রতি মার্কিন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি দুর্ভাগ্যবশত একই রয়ে গেছে।’

‘যুদ্ধকে না বলুন’

ভোটাভুটির পর তেহরানের প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের প্রধান সমন্বয়ক ও মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এই ফলাফলকে স্বাগত জানিয়েছেন। সামাজিক মাধ্যম ‍‍`এক্স‍‍`-এ তিনি লেখেন, ‘বিবেক নাকি জীবনযাত্রার ব্যয়—আমেরিকানরা যুদ্ধকে না বলেছে, এবং আমরা এই বার্তা সমর্থন করি।’

তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সমঝোতা চুক্তির লক্ষ্যে কাতার ও পাকিস্তানের নেতৃত্বাধীন প্রচেষ্টাগুলো নতুন করে সংঘাত শুরুর ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মাঝে খুব কমই অগ্রগতি ঘটাতে পেরেছে।

এই বার্ষিক সমাবেশটি ১৯৭৯ সালের নভেম্বরে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখলের ঘটনাকে চিহ্নিত করে, যা মার্কিন-সমর্থিত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীকে ক্ষমতাচ্যুত করা ইসলামী বিপ্লবের কয়েক মাস পর ঘটেছিল।

দূতাবাস দখলকারী শিক্ষার্থীরা শাহকে ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়েছিল, যিনি সেই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্যান্সারের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।

তারা ৪৪৪ দিন ধরে ৫২ জন আমেরিকানকে জিম্মি করে রাখে এবং ১৯৮০ সালে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়।

ইরানি কর্তৃপক্ষ এরপর থেকে এই বার্ষিকীটিকে তাদের ভাষায় পশ্চিমা ‘অহংকার বা ঔদ্ধত্যের’ বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বার্ষিক স্মারক হিসেবে পালন করে আসছে।

সমাবেশের একটি ব্যানারে রক্তঝরা এক মুকুট চিত্রায়িত করে লেখা ছিল, ‘ফাঁপা মস্তিষ্কে অহংকারের মুকুট।’

বাঘেরী (৩৫) নামের স্কুলের একজন প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘পরিস্থিতি যাই হোক, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের শত্রু। দেশটির ক্ষমতায় কে আছে তাতে কোনো পার্থক্য তৈরি হয় না।’সংগৃহীত ছবি

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!