ডেইলি খবর ডেস্ক: ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫৮৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া আহত হয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৯৮০ জন। ধ্বংসস্তূপের নিচে হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এক প্রতিবেদনে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, দেশটির অন্তর্র্বতীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ শুক্রবার (২৬ জুন) সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে টেলিভিশনে সম্প্রচারিত বৈঠকে নিহতের নতুন হিসাব দেন।তিনি বলেন, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনও সংগ্রহ করা হচ্ছে।
ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট বলেন, বুধবার সন্ধ্যায় আঘাত হানা ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে লা গুয়াইরা রাজ্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেখানে সামরিকীকরণ করা হয়েছে। সেখানে উদ্ধারকারী দলগুলো জীবিতদের সন্ধান করছে এবং খাদ্য ও পানি বিতরণ করছে।এর আগে দেশটির রাজধানী কারাকাস ও আশপাশের এলাকায় পরপর ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে বহু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের খুঁজে বের করতে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা জানিয়েছে, ভূমিকম্পের কারণে ভেনিজুয়েলার ৬৭.৬ লাখ পর্যন্ত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যাদের মধ্যে শুধু কারাকাসেই প্রায় ২০ লাখ মানুষ রয়েছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের আমেরিকা অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক লয়েস পেস বলেছেন, “মানুষ এখনও তাদের পুরোনো বাড়িতে ফিরতে আতঙ্কিত।”
ধুলো ও রক্তাক্ত অবস্থায় আহতদের উদ্ধার করা হয়, যাদের মধ্যে শিশুও ছিল। ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন উদ্ধারের নাটকীয় দৃশ্য দেখায়, যার মধ্যে একজন নারীও ছিলেন যিনি একটি সিমেন্টের স্ল্যাবের নিচে আটকা পড়েছিলেন। তার কেবল খালি পা বাইরে বেরিয়ে ছিল। উদ্ধারকারীরা তাকে জীবিত অবস্থায় বের করে আনে। কিন্তু প্রাথমিকভাবে কারাকাসের বাইরে খুব কম সরকারি অনুসন্ধানকারী দলকেই দেখা গিয়েছিল।
বৃহস্পতিবার সকালে ভবনগুলোকে কঙ্কালে পরিণত হতে, জানালা থেকে আসবাবপত্র ঝুলতে এবং মাথার ওপর হেলিকপ্টার চক্কর দিতে দেখে অনেকেই হতবাক হয়ে যান। ভবনগুলো ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল এবং রাস্তাঘাটে ফাটল ধরেছিল।
পরিবারগুলো প্রিয়জনদের ছবিসহ নিখোঁজ ব্যক্তির পোস্টার লাগাচ্ছিল, আবার অনেকে খোঁজার সময় হাতে লেখা নামের তালিকা শেয়ার করছিল। দেশে ফোন পরিষেবা ব্যাহত হওয়ায় বিদেশে থাকা ভেনেজুয়েলানরা আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হিমশিম খাচ্ছিলেন।
কারাকাসের কেন্দ্রস্থলে শত শত মানুষ পার্ক, পার্কিং লট ও অন্যান্য খোলা জায়গায় জড়ো হয়ে রাত কাটিয়েছে।
তিন সন্তানের মা দায়ানা দেলগাদো জানতে চেয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যে ভারী যন্ত্রপাতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা কোথায় এবং বলেছেন, বাসিন্দারাই ধসে পড়া ভবনগুলোর মধ্যে খোঁড়াখুঁড়ি করছেন।
‘আমি জানতে চাই আমার সন্তান কোথায় আছে, সে কি কোথাও আটকা পড়েছে নাকি কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে আছে,’ তিনি তার নিখোঁজ ৮ বছর বয়সী ছেলের কথা উল্লেখ করে বলেন।
১৯৯৯ সালে দেশটিতে একটি ভূমিধসে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল। এটিকে দেশের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সরকার ও উদ্ধারকারীরা বিশাল চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন
এই প্রাকৃতিক দুর্যোগটি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি দেলসি রদ্রিগেজের জন্য সর্বশেষ চ্যালেঞ্জ। সাবেক এই উপরাষ্ট্রপতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি ও ক্ষমতাচ্যুত করার পর জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ভেনিজুয়েলা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার সম্মুখীন এবং রদ্রিগেজ যে রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করেন, তার বৈধতাকে অনেকেই প্রত্যাখ্যান করে।
বুধবার গভীর রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে রদ্রিগেজ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত হাসপাতাল ও বাড়িঘরের জন্য সরকার ২০০ মিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্গঠন তহবিল গঠন করছে।’
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানিয়েছে, দুটি ভূমিকম্পেরই কেন্দ্রস্থল ছিল ক্যারিবীয় উপকূলের মোরোনের কাছে, কারাকাস থেকে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার (১০৫ মাইল) পশ্চিমে।
ব্রাজিলের ভূতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের একজন ভূ-পদার্থবিদ ও গবেষক মার্কোস ফেরেইরা বলেছেন, ভূমিকম্পের জোড়া আঘাত এবং অগভীর ভূকম্পনজনিত নড়াচড়া একত্রিত হয়ে ধ্বংসযজ্ঞকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
আসছে বিদেশি সহায়তা:
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয়ের মুখপাত্র জেনস লার্কে বলেছেন, বিশ্বজুড়ে ২৫টি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলে প্রায় ১,০০০ জরুরি সেবাকর্মী ভেনিজুয়েলায় পাঠানো হচ্ছে।মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, যিনি ভূমিকম্পের পর রদ্রিগেজের সঙ্গে কথা বলেছেন, তিনি জানান যে যুক্তরাষ্ট্র অবিলম্বে সহায়তা পাঠাচ্ছে।
শুক্রবার ভেনেজুয়েলার সরকারি টেলিভিশন স্পেন থেকে কুকুর এবং ক্যামেরা ও গ্রাউন্ড-পেনিট্রেটিং রাডারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে উদ্ধারকারী দলের আগমন দেখিয়েছে। জার্মানি, চিলি এবং সুইজারল্যান্ড থেকেও দল এসে পৌঁছেছে। তুরস্ক ঘোষণা করেছে, শুক্রবার ইস্তাম্বুল থেকে উদ্ধারকারী ও একজোড়া অনুসন্ধানকারী কুকুর নিয়ে দুটি ফ্লাইট রওনা দেবে। চীনও সহায়তা প্রদানের কথা জানিয়েছে। কাতার, ব্রাজিল, পর্তুগাল এবং কানাডার নেতারা সাহায্য পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সংগৃহীত ছবি

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :