শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা: ১১ হাজার নাবিক উদ্ধার অভিযান স্থগিত করল জাতিসংঘ

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: জুন ২৬, ২০২৬, ১১:০৭ এএম

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা: ১১ হাজার নাবিক উদ্ধার অভিযান স্থগিত করল জাতিসংঘ

ডেইলি খবর ডেস্ক: আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া ১১ হাজারেরও বেশি নাবিককে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। ওই জলসীমায় একটি পণ্যবাহী জাহাজে নতুন করে হামলার ঘটনার পর নিরাপত্তার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জাতিসংঘের এই সংস্থাটি জানিয়েছে।

আইএমও প্রধান আর্সেনিও ডোমিঙ্গোয়েজ জানিয়েছেন, বেশ কিছু নাবিককে ইতিমধ্যে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও, চলমান উদ্ধার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ‘নিরাপত্তা গ্যারান্টি’ নিশ্চিত করতেই এই সাময়িক বিরতি দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ‘ইউকেএমটিও’ জানিয়েছে, গতকাল বৃহস্পতিবার ওমানের দাহিত বন্দর থেকে ৭ দশমিক ৫ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণ-পূর্বে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ ‘অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র’ বা প্রজেক্টাইল দ্বারা আক্রান্ত হয়। তবে এই হামলায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ‘ভ্যানগার্ড’ জানিয়েছে, আক্রান্ত জাহাজটি সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী ‘এভার লাভলি’। হামলার পরেও জাহাজটি কোনো ধরনের সহায়তা ছাড়াই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়।

জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ‘মেরিন ট্রাফিক’-এর তথ্য অনুযায়ী, ‘এভার লাভলি’ বৃহস্পতিবার সকালে দক্ষিণ রুট ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করে এবং স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে পূর্ব দিক দিয়ে বের হয়ে যায়।

হরমুজে আটকে আছেন ১১ হাজার নাবিক, উদ্ধারে বড় উদ্যোগ জাতিসংঘেরহরমুজে আটকে আছেন ১১ হাজার নাবিক, উদ্ধারে বড় উদ্যোগ জাতিসংঘের
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন এই হামলার পেছনে ইরানের হাত রয়েছে এবং তারাই জাহাজটি লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে।

অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ইরানের বিশেষ সংস্থা ‘পারসিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথোরিটি’ (পিজিএসএ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, নির্ধারিত ও অনুমোদিত রুটের বাইরে চলাচলকারী কোনো জাহাজের নিরাপদ যাতায়াতের নিশ্চয়তা তারা দেবে না।

পিজিএসএ তাদের বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলেছে, ‘অননুমোদিত রুট ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট যেকোনো পরিণতির জন্য সংশ্লিষ্ট জাহাজের মালিক, অপারেটর এবং ক্যাপ্টেন নিজেই দায়ী থাকবেন।’

আইএমও প্রধান আর্সেনিও ডোমিঙ্গোয়েজ এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছেন, আক্রান্ত জাহাজটি জাতিসংঘের নির্ধারিত উদ্ধার কাঠামোর আওতাভুক্ত ছিল না। তিনি বলেন, ‘আমি সব সময়ই বলেছি যে নাবিকদের নিরাপত্তাই আমাদের কাছে সবচেয়ে অগ্রাধিকার পায়। তাই একটি সুসমন্বিত পদক্ষেপ এবং নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, পরিস্থিতি পুরোপুরি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান স্থগিত রাখা হবে।’

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে শত শত জাহাজ এবং হাজার হাজার নাবিক আটকা পড়ে আছেন। তেল ও গ্যাস সরবরাহের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক রুট এই হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং সারসহ অন্যান্য জরুরি পণ্যের সরবরাহ বন্ধ হয়ে পড়ে।

দীর্ঘ অচলাবস্থার পর গত মঙ্গলবার আইএমও একটি বড় ধরনের উদ্ধার অভিযানের ঘোষণা দেয়। এই মানবিক অভিযানে ইরান, ওমান, যুক্তরাষ্ট্রসহ অঞ্চলের অন্যান্য উপকূলীয় দেশ এবং আন্তর্জাতিক নৌ-শিল্প সহযোগিতা করতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু নতুন এই হামলার ঘটনায় পুরো প্রক্রিয়াটি বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল।

গত সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান একটি ১৪-দফা চুক্তির মাধ্যমে বৈরিতা অবসানে সম্মত হয়েছে। এই চুক্তির অন্যতম শর্ত হলো—পরবর্তী ৬০ দিন কোনো ধরনের চার্জ বা ফি ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য ইরান তার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে।

১৭ জুন দুই পক্ষের মধ্যে পরমাণু কর্মসূচি এবং যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকেই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমতে শুরু করে। বৃহস্পতিবার সকালে তেলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেল প্রতি ৭২ দশমিক ৪৮ ডলারে নেমে আসে—যা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের দিনের দামের সমান। পরে অবশ্য তা সামান্য বেড়ে ৭৩ দশমিক ২৩ ডলারে দাঁড়ায়।

তবে চুক্তি সত্ত্বেও তেহরান বারবার ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তারা এই প্রণালি পারাপারের জন্য ‘টোল’ না হলেও ‘মেরিটাইম সার্ভিস ফি’ বা নৌ-সেবা ফি আদায় করার পরিকল্পনা করছে।

যুক্তরাষ্ট্র এই ফি আদায়ের তীব্র বিরোধিতা করেছে। বাহরাইন সফরে থাকা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মঙ্গলবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ এবং কোনো দেশেরই এখানে টোল বা কোনো ধরনের ফি আরোপ করার অধিকার নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই হামলা এবং ফি আদায় নিয়ে ইরান ও মার্কিন ব্লকের অনমনীয় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ জলসীমায় দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ফাইল ছ,িতথ্যসূত্র: বিবিসি

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!