বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনীহা, সৌদির পাশে থাকতে চায় ইসরায়েল

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬, ০১:১৯ পিএম

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনীহা, সৌদির পাশে থাকতে চায় ইসরায়েল

ডেইলি খবকর ডেস্ক: ইসরায়েল ইঙ্গিত দিয়েছে, ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে আরও বড় ধরনের সামরিক ভূমিকা নিতে তারা প্রস্তুত। তবে ওয়াশিংটন সরাসরি হস্তক্ষেপে অনাগ্রহী হলেও সৌদি আরব ইসরায়েলের সহায়তা গ্রহণ করবে, এমন সম্ভাবনা কম। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হুতিদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর অভিযানের অংশ হিসেবে আরব উপদ্বীপের দেশগুলোকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন।

লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম আল–আরাবি আল–জাদিদ বা নিউ আরবের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—এই প্রস্তাব এমন এক সময়ে এসেছে, যখন হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরব আরও বেশি সামরিক সহায়তা চাইছে। তবে ওয়াশিংটন এখনো সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের পথে যায়নি। এর পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তার প্রস্তাব দিচ্ছে।

হুতিদের ওপর হামলা চালাতে দুবার ফোন করেছিলেন সৌদি যুবরাজ, সাড়া দেননি ট্রাম্পহুতিদের ওপর হামলা চালাতে দুবার ফোন করেছিলেন সৌদি যুবরাজ, সাড়া দেননি ট্রাম্প
ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুতিদের বড় ধরনের অগ্রগতির পর এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পেরিম বা মায়ুন দ্বীপ দখল। বাব এল-মান্দেব প্রণালির মাঝখানে ইয়েমেন ও জিবুতির মধ্যে অবস্থিত এই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপটি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। লোহিত সাগরে সৌদি আরবপন্থী ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী হুতিদের অভিযানের মুখে ‘ধসে পড়েছে’ বলেও জানা গেছে।

লন্ডনের কিংস কলেজের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. আন্দ্রেয়াস ক্রিগ দ্য নিউ আরবকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অনাগ্রহ সামরিক দিক থেকে সীমিত পরিসরে ইসরায়েলের জন্য একটি সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এটিকে নতুন কোনো সৌদি-ইসরায়েলি নিরাপত্তা সমঝোতার সূচনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ক্রিগ বলেন, ‘রিয়াদ ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে ইসরায়েলকেন্দ্রিক কোনো নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর নির্ভরশীলতায় যেতে চায় না।’

তিনি বলেন, ‘সৌদিরা এখন ইসরায়েলকেই আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা তৈরির অন্যতম পক্ষ হিসেবে ক্রমবর্ধমানভাবে দেখছে। ইরান বা হুতিদের বিরুদ্ধে কৌশলগতভাবে কিছু ক্ষেত্রে তাদের স্বার্থ এক হতে পারে। কিন্তু সেটি ইসরায়েলের হাতে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা তুলে দেওয়ার মতো আস্থার বিষয় থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।’

বাব এল-মান্দেবের আশপাশে হুতিদের অবস্থান শক্তিশালী হয়ে ওঠা ঠেকাতে ইসরায়েলের সরাসরি স্বার্থ রয়েছে। বাব এল-মান্দেব প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ ৩০ কিলোমিটারেরও কম। এটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌ-বাণিজ্যপথগুলোর একটি হলো এই প্রণালি।

হুতিরা বাব এল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় উচ্ছ্বসিত ইরান, লাভবান হচ্ছে যেভাবেহুতিরা বাব এল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় উচ্ছ্বসিত ইরান, লাভবান হচ্ছে যেভাবে
ইসরায়েলের জন্য এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই জলপথের মাধ্যমে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর ইলাত ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাণিজ্যিক জাহাজে হুতিদের হামলা লোহিত সাগরের নৌ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি করেছিল। হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার জবাব দিতে ইসরায়েলও ইয়েমেনে একাধিকবার হামলা চালিয়েছে।

ক্রিগ বলেন, ইসরায়েল উন্নতমানের গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি ও অনুসন্ধান সক্ষমতা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, সাইবার সক্ষমতা এবং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা দিতে পারে। পাশাপাশি হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং কমান্ড অবকাঠামোর ওপর হামলা চালানোর অভিজ্ঞতাও ইসরায়েলের রয়েছে। তবে ক্রিগের মতে, সৌদি আরবের মূল সমস্যা সামরিক শক্তির ঘাটতি নয়। তিনি বলেন, ‘তাই সৌদি আরবের সমস্যা মূলত বিমান বা বোমার ঘাটতি নয়। সমস্যাটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিমান হামলা চালিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, গুদাম এবং কমান্ড সেন্টার ধ্বংস করা সম্ভব। কিন্তু এর মাধ্যমে বাব এল-মান্দেব থেকে হুতিদের স্থায়ীভাবে সরিয়ে দেওয়া বা ইয়েমেনের কোনো ভূখণ্ড পরিচালনা করা সম্ভব নয়। আগের হস্তক্ষেপের সময় সৌদি আরব খুবই বেদনাদায়কভাবে এই বিষয়টি বুঝেছিল।’

বন্দর রক্ষায় মোতায়েন বাহিনীর ৮০ শতাংশেরই অস্তিত্ব নেই, সৌদি-মার্কিন ‘ভুলেই’ হুতিদের জয়বন্দর রক্ষায় মোতায়েন বাহিনীর ৮০ শতাংশেরই অস্তিত্ব নেই, সৌদি-মার্কিন ‘ভুলেই’ হুতিদের জয়
সৌদি আরব ২০১৫ সালে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে। কিন্তু বছরের পর বছর বিমান হামলা ও লড়াইয়ের পরও হুতিদের পরাজিত করা সম্ভব হয়নি। বরং হুতিরা উত্তর ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করে এবং ক্রমে আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা গড়ে তোলে। নতুন করে হুতিদের অগ্রগতি এখন রিয়াদকে কঠিন কৌশলগত সমস্যার মুখে ফেলেছে। কারণ উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানিকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা প্রধান দুটি নৌপথই এখন নিরাপত্তাঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

ইরান হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের জন্য হুমকি তৈরি করছে। অন্যদিকে বাব এল-মান্দেব র আশপাশে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ লোহিত সাগরের নৌপথের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের জন্য সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন তৈরি করা হয়েছিল। এই পাইপলাইন দিয়ে তেল লোহিত সাগরের উপকূলে পৌঁছানো হয়। কিন্তু ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার পর এই অবকাঠামোটিও যে ঝুঁকিমুক্ত নয়, তা স্পষ্ট হয়েছে।

তবে ইসরায়েলের সরাসরি সম্পৃক্ততা সৌদি আরবের পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে। ক্রিগ বলেন, ইসরায়েলের প্রকাশ্য সহায়তা হুতিদের এই দাবি আরও জোরালো করতে পারে যে রিয়াদ আসলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের জোটের অংশ হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। এর ফলে সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক মূল্য আরও বেড়ে যেতে পারে।

এতে সৌদি আরবের অবকাঠামোও ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের কাছে আরও বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ক্রিগ বলেন, কিছু পরোক্ষ সহযোগিতার সুযোগ অবশ্যই রয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন চ্যানেলের মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করা সম্ভব। একই হুমকির বিরুদ্ধে সৌদি ও ইসরায়েলি বাহিনীও আলাদাভাবে অভিযান চালাতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, দুই দেশের এ ধরনের সমান্তরাল অভিযানকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জোট, এমনকি ঘনিষ্ঠ সমন্বয় হিসেবেও দেখা উচিত নয়।

বরং ওয়াশিংটন উপসাগরীয় মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার খরচ ও ঝুঁকি কতটা বহন করতে আগ্রহী, তা নিয়ে সন্দেহ বাড়তে থাকায় রিয়াদ আরও বৈচিত্র্যময় একটি নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে বলে মনে হচ্ছে। ক্রিগ বলেন, সৌদি আরবের এই প্রচেষ্টায় পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসরের পাশাপাশি ইউরোপীয় নৌ-নিরাপত্তা অংশীদার এবং বৃহত্তর উপসাগরীয় ও আরব-ইসলামি নিরাপত্তা সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটনের ওপর সৌদি আরবের নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে।

ক্রিগ বলেন, ‘রিয়াদ যে শিক্ষা নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের জায়গায় ইসরায়েলকে বসানো উচিত নয়।’ তিনি বলেন, ‘বরং শিক্ষা হলো, সৌদি আরবের এমন একটি অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের ভূমিকা ও নিয়ন্ত্রণ আরও বেশি থাকবে।’

হুতিদের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপে ইসরায়েলের আগ্রহ তাই বিশেষ করে লোহিত সাগরের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইসরায়েল ও সৌদি আরবের স্বার্থের একটি মিল তুলে ধরছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে দুই দেশ কৌশলগতভাবে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে। ক্রিগ বলেন, ‘আমেরিকার ওপর নির্ভরশীলতার জায়গায় ইসরায়েলের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি করাকে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বলা যাবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সৌদি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি কেবল একটি দুর্বলতার জায়গা বদলে আরেকটি দুর্বলতার জায়গায় যাওয়া হবে। আর সম্ভাব্যভাবে সেটি হবে আরও অনেক বেশি রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক।’সংগৃহীত ছবি

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!