ডেইলি খবর ডেস্ক:ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে ডনাল্ড ট্রাম্প যখন ক্রমেই হতাশ হয়ে উঠছিলেন, তখন তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন- তেহরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন সফর থেকে প্রেসিডেন্ট কোনো বড় ধরনের অগ্রগতি আনতে পারেন কি না। কিন্তু শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসে ট্রাম্পের কাছে উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্যের খবর ছিল না বলেই মনে হয়েছে। ওয়াশিংটনে ফেরার পথে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, চীনের নেতা শি জিনপিং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন এবং তিনিও একমত যে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা উচিত নয়। তবে এগুলো এমন বক্তব্য, যা চীন আগেও জানিয়েছিল।চীনা নেতাকে নিয়ে ট্রাম্প ফক্স নিউজের ব্রেট বেয়ারকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘তিনি যুদ্ধের সমাপ্তি দেখতে চান। তিনি সাহায্য করতে চান। যদি তিনি সাহায্য করতে চান, সেটা ভালো। কিন্তু আমাদের সাহায্যের প্রয়োজন নেই।’
প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, ইরান ইস্যুতে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করার আগে তারা ট্রাম্প ও শি’র বৈঠকের ফলাফল দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এখন প্রেসিডেন্টকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে- ইরানের বিরুদ্ধে আরও হামলা চালানোই কি দীর্ঘায়িত এই সংঘাতের সমাপ্তির সবচেয়ে কার্যকর পথ? যে সংঘাত তার পূর্বাভাস দেয়া ছয় সপ্তাহের সময়সীমা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে, জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে এবং অর্থনীতি নিয়ে তার জনপ্রিয়তা কমিয়ে দিয়েছে। শুক্রবার চীনের স্থানীয় সময় সকালে ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে তার সামরিক অভিযান চলবে!
আলোচনার সঙ্গে পরিচিত সূত্রগুলো বলছে, প্রশাসনের ভেতরে কীভাবে এগোনো হবে তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। পেন্টাগনের কিছু কর্মকর্তাসহ একাংশ আরও আক্রমণাত্মক কৌশলের পক্ষে, যার মধ্যে লক্ষ্যভিত্তিক হামলার বিষয়ও রয়েছে। তাদের আশা, এতে ইরানের ওপর চাপ আরও বাড়বে এবং তেহরান আপসে বাধ্য হবে।অন্যদিকে, আরেক অংশ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ট্রাম্প নিজেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এই পথেই বেশি ঝুঁকেছেন। তার আশা ছিল, সরাসরি আলোচনা ও অর্থনৈতিক চাপের সমন্বয় ইরানকে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে বাধ্য করবে। কিন্তু এপ্রিল মাসে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার পর থেকে চুক্তির শর্ত নিয়ে তেহরানের অবস্থানে তেমন পরিবর্তন আসেনি। শুক্রবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, আমি এটা দেখেছি, আর যদি প্রথম বাক্যটাই আমার পছন্দ না হয়, তাহলে আমি পুরো বিষয়টাই ফেলে দিই। তিনি ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবের প্রসঙ্গে এ কথা বলেন।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এ সপ্তাহের শুরুতে আত্মবিশ্বাস দেখিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, তিনি জ্যারেড কুশনার, স্টিভ উইটকফ এবং আরব বিশ্বের কয়েকজন মিত্রের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ফোনে কথা বলেছেন। তেহরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর দায়িত্ব ট্রাম্প যেসব শীর্ষ কূটনীতিককে দিয়েছেন, তাদের কথাই উল্লেখ করছিলেন তিনি। ভ্যান্স বলেন- দেখুন, আমি মনে করি আমরা অগ্রগতি করছি। মূল প্রশ্ন হলো- আমরা কি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছি, যা প্রেসিডেন্টের নির্ধারিত লাল রেখা পূরণ করবে? তিনি আরও বলেন, এ মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট আমাদের কূটনৈতিক পথেই এগোতে বলেছেন, আর আমি সেটাতেই মনোযোগ দিচ্ছি।
তবে ইরান তাদের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত না দেয়ায় ট্রাম্প ক্রমেই অধৈর্য হয়ে উঠছেন। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ। পাশাপাশি ইরানের নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ বিভাজনও আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। মার্কিন প্রস্তাবের প্রতি ইরানের সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়া এবং সাম্প্রতিক বক্তব্য অনেক কর্মকর্তাকে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করেছে- তেহরান আদৌ কোনো বাস্তবসম্মত চুক্তিতে আগ্রহী কি না। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি সিএনএনকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে সব ধরনের বিকল্প রয়েছে। তবে তার প্রথম পছন্দ সবসময়ই কূটনীতি। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা রয়েছে, আর প্রেসিডেন্ট এমন চুক্তিই গ্রহণ করবেন যা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন।ন্যাটোয় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত আইভো ডালডার বলেন, তিনি হুমকি দিয়ে দেখেছেন, কাজ হয়নি। আলোচনা করেও দেখেছেন, সেটাও কাজ করেনি। এখন তিনি এই অচলাবস্থা থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে বের করার চাপ বাড়ছে। যুদ্ধের কারণে ভোটাররা অর্থনৈতিক চাপে পড়েছেন। ফলে প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। রিপাবলিকানরা আশঙ্কা করছেন, নভেম্বরে এর রাজনৈতিক মূল্য তাদের দিতে হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের গড় দাম প্রতি গ্যালনে ৪ দশমিক ৫০ ডলারের বেশি হয়ে গেছে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকলে দাম আরও বাড়তে পারে। মূল্যস্ফীতিও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এপ্রিল মাসে তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো মজুরি বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে মূল্যস্ফীতি।শেয়ারবাজার এখনো মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও করপোরেট নেতারা পর্দার আড়ালে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর দ্রুত সমাধানের চাপ বাড়াচ্ছেন। সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রিটের নির্বাহীদের সঙ্গে কথা বলা ট্রাম্পের এক উপদেষ্টা বলেন, তারা শুধু যুদ্ধের শেষ চায়। তিনি সামগ্রিক বার্তাটিকে বর্ণনা করেন এভাবে- যেভাবেই হোক, দ্রুত শেষ করুন।
ট্রাম্প বরাবরই যুদ্ধের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রভাবকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, পরিস্থিতি তিনি যতটা খারাপ হবে ভেবেছিলেন, ততটা হয়নি। এ সপ্তাহের শুরুতে অর্থনৈতিক উদ্বেগের প্রশ্ন উড়িয়ে দেয়ার পর তিনি আবারও একই অবস্থান জোর দিয়ে তুলে ধরেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমি আমেরিকানদের আর্থিক অবস্থা নিয়ে ভাবি না। আমি কারও কথাই ভাবি না। আমি শুধু একটি বিষয় নিয়ে ভাবি- ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র পেতে দেয়া যাবে না। এটাই একমাত্র বিষয়, যা আমাকে প্রভাবিত করে। পরে ফক্স নিউজের ব্রেট বেয়ার তার ওই মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করলে ট্রাম্প বলেন, এটা ছিল নিখুঁত বক্তব্য। আমি আবারও একই কথা বলব।তবুও ট্রাম্প ও তার টিম ভালোভাবেই বুঝতে পারছে যে তারা একটি সংকটপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। একদিকে ইরান ইস্যুতে রাজনৈতিক বিজয় খোঁজা, অন্যদিকে দ্রুত ফুরিয়ে আসা রাজনৈতিক সময়সীমা। ট্রাম্পের ওই উপদেষ্টা স্বীকার করেন, আমি যখন রাস্তায় গাড়ি চালাতে চালাতে ৫ ডলার গ্যাসের দাম দেখি, তখন সেটা আমাকে ভীষণ আতঙ্কিত করে। তিনি আরও বলেন, তারা একটা পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এটা আর বেশি দিন চলবে না। যেভাবেই হোক, তারা প্রণালিটি খুলবে- ওটা খুলতেই হবে।ছবি-সংগৃহীত

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :