শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩

যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ৭ দিনের ‘রোডম্যাপ’ ইরানের

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬, ০৯:১৫ পিএম

যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ৭ দিনের ‘রোডম্যাপ’ ইরানের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ অবসানে সাত দিনের একটি ‘রোডম্যাপ’ বা রূপরেখা প্রস্তাব করেছে ইরান। এতে সাত দিনের মধ্যে সংঘাত বন্ধ, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড়, তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে। আজ শুক্রবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গতকাল বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের কাছে পরিকল্পনাটি তুলে ধরেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্মত হওয়া সমঝোতা স্মারকের শর্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সংঘাত বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয় রয়েছে।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে প্রস্তাবটি পাঠানো হয়। এতে সাত দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণের আহ্বান জানানো হয়েছে। এসব শর্ত পূরণ হলে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা পুনরায় শুরু করা এবং গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিতে চলাচলের ওপর আরোপিত অবরোধ তুলে নেওয়ার পথ তৈরি হবে।

হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ বর্তমানে সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। এর কারণে তেল ও গ্যাস রপ্তানি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে সাংবাদিকদের কাছে ইরানের এই প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এরই মধ্যে প্রায় সাত মাসে গড়িয়েছে।

দুই পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলার পর গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হয়। এরপর থেকে দুই দেশ আবারও ওই সমঝোতায় ফিরতে পারে—এমন খুব বেশি লক্ষণ দেখা যায়নি। তবে তেহরান জানিয়েছে, সমঝোতায় ফিরে যাওয়া সম্ভব।

যেসব শর্ত দিয়েছে ইরান

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী সাত দিনের মধ্যে গাজা ও লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সংঘাত বন্ধ করতে হবে।

এ ছাড়া ওয়াশিংটন ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে দেবে। এসব সম্পদের পরিমাণ কমপক্ষে ১২ বিলিয়ন ডলার বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইরানের তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং দেশটির ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে।

সাত দিনের মেয়াদের শেষ দিনে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা অবিলম্বে শুরু করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই কর্মসূচিকে সংঘাতের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ইরানের প্রস্তাবটি জুনে হওয়া সমঝোতা স্মারকের সঙ্গে অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এতে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র সাত দিন। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় ১৭ জুন স্বাক্ষরিত ওই সমঝোতায় আলোচনার জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা রাখা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেটি ভেঙে পড়ে।

অস্পষ্ট ভাষার কারণে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। এরপর তারা পাল্টাপাল্টি হামলা চালায়। একপর্যায়ে ৭ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই চুক্তিকে ‘শেষ’ বলে ঘোষণা করেন।

আরাগচি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছি।’

অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যুদ্ধ শেষ করবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের। কারণ তেহরান এই লড়াই চালিয়ে যেতে চায় না।

ফক্স নিউজের ‘স্পেশাল রিপোর্ট উইথ ব্রেট বেয়ার’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে পারি, তখন একে অপরকে হত্যা করার পথে যাওয়া উচিত নয়। কিন্তু ইসরায়েলের উসকানির কারণে তারা আমাদের ওপর এই যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু আমরা এটি চালিয়ে যেতে চাই না। এটি শেষ করতে চায় কি না, আমেরিকাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

বৃহস্পতিবার প্রচারিত ওই সাক্ষাৎকারে সম্প্রচারক প্রতিষ্ঠানের অনুবাদ করা বক্তব্যে এসব কথা উঠে আসে।

এর আগে বুধবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে পেজেশকিয়ান বলেন, ওয়াশিংটনের সামনে ইরান ‘হাঁটু গেড়ে মাথা নত করবে না’। একই সময়ে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনার কথা স্বীকার করেন।

ফক্স নিউজের সাক্ষাৎকারে পেজেশকিয়ান আরও বলেন, ‘বর্তমান আমেরিকান সরকার যদি আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়, তাহলে ভালো। তা না হলে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে হোক কিংবা পরে—তাতে আমাদের কী আসে যায়?’

চলতি মাসের শুরুতে পেজেশকিয়ান বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সমঝোতা স্মারকের আওতায় নিজেদের প্রতিশ্রুতিতে ফিরে আসে, তাহলে তেহরান ‘তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা পদক্ষেপ নেবে’।

হোয়াইট হাউসের এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসন ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক আলোচনা’ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে এক কর্মকর্তা বলেছেন, ওয়াশিংটন কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য তাড়াহুড়ো করবে না।

ইরানের এক নিরাপত্তা সূত্র আল-জাজিরাকে জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ইরানের শর্ত ও প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করলে কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরানের নতুন প্রস্তাব থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা খুব বেশি এগোয়নি।

জেনেভা গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক ইতিহাস ও রাজনীতির অধ্যাপক সাইরাস শায়েখ আল-জাজিরাকে বলেন, ‘মূলত তেমন কিছুই পরিবর্তন হয়নি।’

তিনি বলেন, ইরান ‘যুদ্ধের সময় অর্জন করা অতিরিক্ত ক্ষমতা ধরে রাখতে চায় এবং জুনের সমঝোতা স্মারকই ভবিষ্যৎ রোডম্যাপের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত—এমন অবস্থানে অনড় রয়েছে।’ অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ‘মূলত এই রোডম্যাপ নিয়ে আলোচনা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে যাচ্ছে’।

অধ্যাপক শায়েখের মতে, নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সংঘাত অবসানের দিকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা কম।

আরাগচি সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনের আগে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো ‘ভালো হবে’। তবে সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেজেশকিয়ান এর আগে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো চুক্তি মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময়ের সঙ্গে যুক্ত থাকবে না।

এদিকে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিভিন্ন সংঘাতে অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশটির শীর্ষ কূটনীতিক শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের আলোচনায় উত্তেজনা কমানো এবং সংলাপের শর্ত নিয়ে আলোচনা হয়েছে।সংগৃহীত ছবি

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!