ডেইলি খবর ডেস্ক: হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখনো নিজেদের হাতেই রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে কোনো শান্তি আলোচনা শুরু করার আগ্রহ নেই বলে দাবি করেছে ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প টানা দুই সপ্তাহের বিমান হামলা স্থগিত করার পর সোমবার (২৭ জুলাই) এ অবস্থান জানায় তেহরান। একই সঙ্গে ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি কতটা কার্যকর তা পরীক্ষা করছে দেখছে দেশটি। খবর রয়টার্সের।
টানা ১৩ রাত ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার জবাবে ইরানও মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায়। তবে ট্রাম্প ওই অভিযান স্থগিত করেন। এর পর ইরান জানায়, যুক্তরাষ্ট্র যতদিন হামলা বন্ধ রাখবে, ততদিন তারাও পাল্টা হামলা স্থগিত রাখবে।
মার্কিন হামলা বন্ধ হওয়ার খবরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্বস্তি ফিরে আসে। বৈশ্বিক তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দ্রুত কমে যায়। গত সপ্তাহে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার অতিক্রম করার পর সোমবার সকালে ব্রেন্টের দাম ৮ শতাংশের বেশি কমে ৮৯ ডলারের নিচে নেমে আসে।
তবে যুদ্ধবিরতির এই পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই পরীক্ষা করে দেখছে তেহরান এমন ইঙ্গিতও মিলেছে। সোমবার জর্ডান জানায়, তারা দুটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। অন্যদিকে ইরাকের নিরাপত্তা সূত্র জানায়, উত্তর ইরাকে ইরানবিরোধী কুর্দি গোষ্ঠীর একটি ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা হয়েছে। তবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
মার্কিন এক কর্মকর্তা ও বিভিন্ন মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করার লক্ষ্যে পরিচালিত বিমান হামলা থেকে আর উল্লেখযোগ্য সামরিক সাফল্য অর্জনের সুযোগ নেই এমন পরামর্শই ট্রাম্পকে দিয়েছিলেন দেশটির সামরিক কর্মকর্তারা। তাদের মতে, হামলার উপযুক্ত লক্ষ্যবস্তুও ক্রমশ ফুরিয়ে আসছিল।
রয়টার্সকে ওই মার্কিন কর্মকর্তা জানান, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বিশেষভাবে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ দ্রুত কমে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
এদিকে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ দাবি করেন, আলোচনার সুযোগ করে দিতেই ট্রাম্প সামরিক অভিযান স্থগিত করেছেন। ট্রাম্প, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ মার্কিন কর্মকর্তারা একাধিকবার বলেছেন, ইরান এখন সমঝোতার জন্য মরিয়া।
তবে সোমবার তেহরানে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি সেই দাবি সরাসরি নাকচ করে দেন।
তিনি বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরুর কোনো অনুরোধ ইরান করেনি।
বাঘায়ি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার অনুরোধ জানিয়েছে এ ধরনের খবর সম্পূর্ণ মনগড়া। তিনি বলেন, কূটনীতির পথ ইরান ত্যাগ করেনি, তবে এ ধরনের পদক্ষেপ তাদের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণও পুনর্ব্যক্ত করেছে তেহরান।
ইরানের একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম সোমবার এক অবগত সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা ছয়টি জাহাজকে সোমবার সকালে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওই সূত্রের দাবি, একটি জাহাজ দুর্ঘটনারও শিকার হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমগুলো জানায়, ইরান পূর্বেই ঘোষণা করেছিল যে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের জন্য নির্ধারিত রুটই বৈধ। এর বাইরে অন্য সব রুট ঝুঁকিপূর্ণ এবং সেগুলো ব্যবহার করা যাবে না।
ট্রাম্প নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করেছিলেন, কারণ ইরানের অভিযোগ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র জাহাজগুলোকে ওমান উপকূল ঘেঁষে চলাচলের নির্দেশ দিচ্ছিল। ইরান বলছে, বৈধ নৌপথ তাদের উপকূলসংলগ্ন চ্যানেল দিয়েই এবং সেই পথের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে।
তেহরানের দাবি, ওই পথ ব্যবহারকারী জাহাজের ওপর তদারকি চালানোর পাশাপাশি তারা ট্রানজিট ফি আদায়েরও অধিকার রাখে।
দুই সপ্তাহের এই সংঘাতে ইরানে বহু মানুষ নিহত হয়েছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের সেতু, সুড়ঙ্গসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। পাল্টা হামলায় প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে চার মার্কিন সেনাকে হত্যা করে ইরান। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর কিছু বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলা চালায় তেহরান, যা তাদের ভাষ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার প্রতিশোধ।
গত সপ্তাহে ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীও লোহিত সাগরে সৌদি আরবের তেল পরিবহন কার্যক্রম অবরোধের ঘোষণা দেয়। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায় এবং তেলের দামও বাড়তে শুরু করে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান স্থগিত হওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠেছে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে ওয়াশিংটনের হাতে কার্যকর কী ধরনের চাপ প্রয়োগের সুযোগ অবশিষ্ট রয়েছে।
গত জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) পৌঁছেছিল, যার আওতায় আগস্টের শেষ নাগাদ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল।
তবে হরমুজ প্রণালির বিষয়ে ওই সমঝোতার ব্যাখ্যা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, সমঝোতা অনুযায়ী প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে ইরান বলছে, ওই সমঝোতা তাদেরকেই প্রণালিতে চলাচল তদারকির ক্ষমতা দিয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে ওমানের সঙ্গে একটি পৃথক চুক্তির চেষ্টা করছে তেহরান। প্রণালির বিপরীত উপকূল নিয়ন্ত্রণকারী দেশ ওমানের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল তেহরান সফর করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি জানান, ওই আলোচনা ইতিবাচক হয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, যিনি ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন কিন্তু পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় অংশ নেননি, তিনি চলতি সপ্তাহের শুরুতে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন।সংগৃহীত ছবি

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :