বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩

হুতির হামরা থেকে সৌদিকে রক্ষায় এবার মিশর সেনা পাঠাবে

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২১, ২০২৬, ১২:১০ এএম

হুতির হামরা থেকে সৌদিকে রক্ষায় এবার মিশর সেনা পাঠাবে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: জায়েদি মতাদর্শের ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর উত্থানের পেছনে রয়েছে মিশরের সামরিক হস্তক্ষেপের ইতিহাস। ১৯৬২ সালে মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসেরের সমর্থনে আরব জাতীয়তাবাদী সামরিক কর্মকর্তারা জায়েদি ইমাম মুহাম্মাদ আল-বদরকে ক্ষমতাচ্যুত করলে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এতে একদিকে ছিল মিশর-সমর্থিত রিপাবলিকানরা, অন্যদিকে জায়েদিরা, যাদের তখন সমর্থন দিয়েছিল সৌদি আরব। মিশর পাঠিয়েছিল ৭০ হাজারের বিশাল বাহিনী। মেই দীর্ঘ লড়াইয়ে টিকতে পারেনি জায়েদিরা।

জায়েদিদের অস্তিত্ব সংকটের মধ্যে ১৯৯০-এর দশকে নেতৃত্বে আসেন হুসাইন বদরুদ্দিন আল-হুতি। ১৯৯২ সালে তিনি ‘শাবাব আল-মুমিনিন’ বা ‘বিশ্বাসী যুবক’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন, যা শুরুতে সশস্ত্র ছিল না। তবে ৯/১১-এর পর ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহ যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধকে সমর্থন জানালে সংগঠনটি তার বিরোধিতা করে। ২০০৪ সালে সালেহর বাহিনী সাদা প্রদেশে আল-হুতিকে ধরতে অভিযান চালালে তীব্র প্রতিরোধের পরও তিনি নিহত হন। এরপর সংগঠনটি তাদের নেতাকে হত্যার প্রতিশোধ ও নেতার আদর্শ বাস্তবায়নে ‘হুতি’ বা ‘আনসারুল্লাহ’ নামে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং সামরিক সংগ্রামের পথে এগিয়ে যায়।

দীর্ঘ কয়েক দশক পর যেই দেশটির কারণে ইয়েমেনের সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল এবং জায়েদিরা ধীরে ধীরে সংগ্রামী থেকে সশস্ত্র হয়ে হুতি গোষ্ঠীতে পরিণত হলো, সেই মিশর আবারও নতুন পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। হুতিকে মোকাবিলা এবং সৌদি আরবকে রক্ষায় সামরিক সহায়তার পথে হাঁটতে যাচ্ছে কায়রো।

রয়টার্স বলছে, এ লক্ষ্যে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীকে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় অংশ নেওয়ার অনুমোদন দেয়া হবে কি না, তা নিয়ে আগামী সপ্তাহে ভোট দিতে পারে মিশরের পার্লামেন্ট। সৌদি আরব সহায়তা চাইলে দেশটির প্রতিরক্ষায় মিশরের সামরিক বাহিনীকে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

গেল শনিবার এক ভাষণে পার্লামেন্টের অনুমোদন চেয়েছেন মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। সৌদি আরবের নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তাদের সুরক্ষায় যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত কায়রো।

ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সংঘাতের বিস্তারের মধ্যে মিশরের এই উদ্যোগ দেশটিকে সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়ার আরও কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় মিত্রদের প্রতি সমর্থন জানালেও সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়নি কায়রো।

সৌদি আরবের পাশে কেন মিশর?
সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামোয় হুতির হামলা বাড়ার পর মিশরের অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। গত মাসে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মিশর সফর করেন। এ সময় দুই দেশের দীর্ঘ উপকূলসংলগ্ন বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও লোহিত সাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়।

সৌদি আরবের নিরাপত্তা মিশরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পেছনে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত- দুই ধরনের কারণ রয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত মিশরীয়দের পাঠানো অর্থ দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎস। খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ায় এই অর্থের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

২০১৩ সালে সেনাবাহিনীর হাতে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলো মিশরের প্রেসিডেন্ট সিসির গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহযোগী। এসব দেশ মিশরকে কয়েক হাজার কোটি ডলারের সহায়তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আমানত এবং বিনিয়োগ দিয়েছে। শনিবারের ভাষণে সিসি বলেন, ওই সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর পাশে থাকার বিষয়টি মিশর কখনো ভুলতে পারে না। মিশরের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের রাখা ৫৩০ কোটি ডলারের আমানতের মেয়াদ চলতি মাসে শেষ হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে ২৬ কোটি ৭০ লাখ ডলারের সুদ।

নিরাপত্তা উদ্বেগও বাড়ছে
বিশ্লেষকদের মতে, ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা উদ্বেগও কায়রোকে আরও সক্রিয় অবস্থানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জুলাইয়ে ভূমধ্যসাগরীয় বন্দরনগরী দামিয়েত্তায় দুটি গ্যাসবাহী জাহাজে ড্রোন হামলার ঘটনা মিশরকে বুঝিয়ে দিয়েছে, আঞ্চলিক সংঘাত থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকা কঠিন।

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক এইচ এ হেলিয়ার বলেন, অনির্দিষ্টকাল ধরে এ সংঘাতের বাইরে থাকা সম্ভব নয়- এটি মিশরীয় কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারছে। দেশটির অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে সৌদি তেল পরিবহনে বাধা তৈরি হওয়ায় লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা সৌদি আরব ও মিশর- উভয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল থেকে মিশর বছরে কয়েক শ কোটি ডলার আয় করে। মিশরের রাজনৈতিক গবেষক ও সাংবাদিক শরিফ আরেফের মতে, সৌদি আরবের নিরাপত্তা মিশরের জাতীয় নিরাপত্তারও একটি অংশ।

কী ধরনের সামরিক সহায়তা দিতে পারে মিশর?
মিশরের সশস্ত্র বাহিনী আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক বাহিনী। দেশটির সক্রিয় সেনাসদস্যের সংখ্যা কয়েক লাখ। রয়েছে বড় আকারের বিমান, স্থল ও নৌবাহিনী। মিশরের বিমানবহরে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-১৬, ফ্রান্সের রাফায়েল এবং রাশিয়ার তৈরি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে মিশর বছরে প্রায় ১৩০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা পায়, যা দেশটিকে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম কিনতে সহায়তা করে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কায়রোর ‘সহায়ক ভূমিকার’ কথা উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্র চলতি বছর সহায়তার একটি অংশে মানবাধিকারসংক্রান্ত শর্তও শিথিল করেছে।

এর আগে ২০১৫ সালে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের অভিযানে বিমান ও নৌবাহিনী পাঠিয়েছিল মিশর। এ ছাড়া লিবিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় ইসলামিক স্টেটের অবস্থান লক্ষ্য করেও বিমান হামলা চালায় দেশটি। ২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পতনের পরের বছরগুলোতে সিনাই উপদ্বীপে ইসলামপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে মিশরের সেনাবাহিনী।

তবে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর থেকে বিদেশের মাটিতে বড় পরিসরে স্থলসেনা মোতায়েন করেনি মিশর। ওই যুদ্ধে কুয়েত থেকে ইরাকি বাহিনীকে হটাতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটে অংশ নিয়েছিল মিশরীয় সেনারা। এর প্রায় তিন দশক আগে প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের ইয়েমেনে সেনা পাঠিয়েছিলেন। সেই ব্যয়বহুল সামরিক হস্তক্ষেপকে পরে ভিয়েতনামে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততার সঙ্গে তুলনা করা হয়।

কী ধরনের সহায়তা প্রত্যাশিত?
সিসির ভাষণ ও পরবর্তী বক্তব্যে মিশর কী ধরনের সামরিক সহায়তা দেবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনের ভেতরে মিশরীয় স্থলসেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা কম। বরং আকাশ প্রতিরক্ষা, বিমানবাহিনীর সহায়তা এবং লোহিত সাগরে নৌবাহিনীর ভূমিকা বেশি সম্ভাব্য।

অবসরপ্রাপ্ত মিশরীয় সামরিক কর্মকর্তা ও আরব ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রধান সামির রাঘেব বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের হুমকি মোকাবিলায় আকাশ প্রতিরক্ষা এবং বিমানবাহিনীর সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়া জাহাজের নিরাপত্তা, জলদস্যুতা দমন এবং সৌদি উপকূল সুরক্ষায় নৌবাহিনীকে ব্যবহার করা যেতে পারে।

তবে কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা অধ্যয়নবিষয়ক জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, আরেকটি বড় সামরিক শক্তি যুক্ত হলেই হুতি সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে না। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, ছড়িয়ে থাকা বাহিনী এবং ভৌগোলিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে হুতিরা বড় ধরনের প্রভাব তৈরি করতে পারে। শুধু বোমা হামলা চালিয়ে হুতিকে মোকাবিলা করা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।সংগৃহীত ছবি

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!