মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর, ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

তীব্র রুশ হামলার মুখে কিয়েভে চলছে মানুষের টিকে থাকার লড়াই

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ৫, ২০২৬, ১১:২৫ পিএম

তীব্র রুশ হামলার মুখে কিয়েভে চলছে মানুষের টিকে থাকার লড়াই

ডেইলি খবর ডেস্ক: যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে সোমবার (৫ অক্টোবর) সকালে আলিনা বিরিউক নদী পার হওয়ার জন্য বাসের অপেক্ষা করছিলেন। এক সময় এই পথে এটি ছিল অত্যন্ত সাধারণ যাতায়াত, কিন্তু এখন তা রুশ ড্রোনের নিশানায় পরিণত হয়েছে।

গত সপ্তাহে রাশিয়ার হামলায় সেতুটি বেশ কয়েকবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিয়েভবাসীদের শহরের ভেতরে চলাচলের পদ্ধতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তন করতে বাধ্য করার জন্য এটি মস্কোর নতুন পরিবর্তিত একটি কৌশল।

যানজটে ঠাসা সেতুটির দিকে বিরিউক বেশ আশঙ্কাজনক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলেন।

ঠিক দুদিন আগে বিমান হামলার সতর্কঘণ্টা বেজে ওঠার সময় তিনি এই সেতুটি হেঁটেই পার হচ্ছিলেন। তবে বিপদ সংকেতের পর তিনি এবং তার মা দৌড়ে অন্য প্রান্তে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।

বিরিউকের মনে পড়ে, তিনি দ্রুত দৌড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। এ সময় চারপাশে মানুষজন তাড়া দেওয়ার জন্য চিৎকার করছিল; আর অন্যদিকে হৃদরোগে ভোগা তার মাকে তিনি দ্রুত পা চালাতে তাগিদ দিচ্ছিলেন। বিরিউক বলেন, “আমি তাকে বলেছিলাম ‍‍`তোমার বুকে ব্যথা করলেও কিছু যায় আসে না, কষ্টটা সেরে যাবে!’ কিন্তু যদি একটা শাহেদ ড্রোন এসে পড়ে, তবে সব শেষ!"

নিরাপদে বাড়ি পৌঁছানোর পর নিজেকে মাত্র একদিনের বিরতি দিয়ে বিরিউক আবারও নদী পার হতে চলে এসেছেন—কারণ নদীর ওপারে গিয়ে তাকে নতুন একটি ব্যাংক কার্ড সংগ্রহ করতে হবে।

বিরিউক বলেন, ‘এটি মাত্র পাঁচ মিনিটের বিষয়, আপনাকে কেবল অন্য পাড়ে পৌঁছাতে হবে। মানুষের তো চাকরি আছে, পড়াশোনা আছে, টুকটাক কাজ আছে।’

‘দিন-রাত শুধু ধ্বংসের ছবি’

কিয়েভবাসীদের জন্য দৈনন্দিন জীবনযাত্রা বজায় রাখা পছন্দের চেয়ে প্রয়োজনের তাগিদই বেশি, তবে এই চ্যালেঞ্জ দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‍‍`এসিএলইডি‍‍`-র তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বার্তা সংস্থা এএফপি-র একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিয়েভ ২০২২ সালের মার্চের পর থেকে এবার সবচেয়ে তীব্র রুশ হামলার মুখোমুখি হচ্ছে।

কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিচকো সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, শহরটি এক ‘ভয়াবহ বা অত্যন্ত নাটকীয় পরিস্থিতির’ মধ্যে রয়েছে এবং শত্রুরা যেহেতু কিয়েভকে তছনছ করে দিচ্ছে, তাই এখন শহরের যুদ্ধকালীন প্রস্তুতিতে থাকা উচিত।

এ সপ্তাহের শেষে মস্কো কূটনীতিক এবং বিদেশিদের ইউক্রেনের রাজধানী ত্যাগ করার আহ্বান জানালে কিয়েভের সহযোগীরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে আতঙ্ক ছড়ানোর অভিযোগ তোলে।

স্থানীয় বাসিন্দা মিকিতা কোভালচুক জানান, নতুন করে শুরু হওয়া এসব হামলার ভয়াবহতা নাগরিকরা তীব্রভাবে অনুভব করছেন। তিনি বলেন, ‘আগে এসব শুধু রাতে ঘটত। এখন প্রতিদিন, দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টাই ঘটছে। আমি বাড়িতে এবং আমার কর্মস্থলের কাছে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনি। আমি যখন ঘরের বা কাজের জায়গার জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই, তখন এগুলো দেখতে পাই।’

২৮ বছর বয়সী এই যুবক মধ্যাহ্নভোজে একটি হটডগ খাচ্ছিলেন এবং সাইরেনের এক বিরল বিরতির সুযোগে শরতের রোদের উষ্ণতা উপভোগ করছিলেন।

মাত্র কয়েকশত মিটার দূরে দাঁড়িয়ে ছিল ইউক্রেনের ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেসের পোড়া কঙ্কাল—যা আগের সপ্তাহে ভরদুপুরে চালানো এক ড্রোন হামলায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

হামলার এক সপ্তাহ পরেও বাতাসে পোড়া গন্ধ ভেসে আসার মধ্যেও সেখানে দুমড়েমুচড়ে যাওয়া গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে ছিল, যেখানে মানুষজন ছবি তোলার জন্য থামছিল।

কোভালচুক বলেন, ‘জীবন দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। তবে আমরা কোনো না কোনোভাবে মানিয়ে নিচ্ছি।’

মস্কো তাদের লক্ষ্যবস্তুর তালিকা দীর্ঘ করার সাথে সাথে ক্রমাগত মানিয়ে নেওয়ার এই প্রয়োজনীয়তা আরও দ্রুত গতি পেয়েছে। শপিং সেন্টার, ডাক যোগাযোগ, রেলপথ, ইন্টারনেট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, ডেটা সেন্টার এবং এখন সেতু-একের পর এক লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে।

সাড়ে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধের মধ্যে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে থাকা ব্যবসা-বাণিজ্যগুলোর জন্য এই চ্যালেঞ্জটি স্বভাবতই তীব্র।

‍‍`হঠাৎ করেই কান্না পায়‍‍`

কিয়েভের একটি জনপ্রিয় ক্রিমিয়ান রেস্তোরাঁ চেইন ‍‍`মুসাফির‍‍`-এর একটি শাখার ২৮ বছর বয়সী ব্যবস্থাপক কেসেনিয়া ডোকানোভা একটি বিশাল লাল রঙের জেনারেটর পরীক্ষা করতে ব্যস্ত ছিলেন। শীতকালে পুনরায় দেখা দেওয়া দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাট মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে এটি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম।

জেনারেটরের পরিচিত গর্জন গত শীতের স্মৃতিগুলো ফিরিয়ে আনে, যখন রাশিয়ার ক্রমাগত হামলায় কিয়েভ টানা কয়েকদিন ধরে অন্ধকার ও তীব্র ঠান্ডায় ডুবে গিয়েছিল।

ডোকানোভা এখন আগামী মাসগুলোর জরুরি পরিস্থিতির জন্য ক্রমাগত পরিবর্তনশীল একটি সম্ভাব্য পরিকল্পনা তৈরি করতে কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘খাদ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে... একটি রেস্তোরাঁর জন্য সবচেয়ে খারাপ যা ঘটতে পারে তা হলো পানির অভাব—আমাদের রিজার্ভ ট্যাংক আছে, তবে তা বেশিদিন টিকবে না।’

টেলিকম সরবরাহকারীদের ওপর কয়েকটি হামলার পর, ডোকানোভার দলটি ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেলে কী করণীয় তা নিয়ে আলোচনা শুরু করে। তিনি গ্রাহকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কীভাবে কর্মচারীদের যাতায়াত এবং পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যায় তা নিয়েও ভাবছিলেন।

যদিও কিয়েভজুড়ে ঘনঘন বিকট বিস্ফোরণের শব্দে ডোকানোভা এখন আর তেমন চমকে ওঠেন না, তবুও কখনো কখনো মানসিক চাপ অতিরিক্ত হয়ে যায়।

কেসেনিয়া ডোকানোভা বলেন, ‘যেকোনো সাধারণ মুহূর্তে আপনি যখন ট্রলিবাস বা বাসে গিয়ে বসেন, তখন হঠাৎ করেই কান্না চলে আসে। সকালে প্রস্তুত হওয়ার সময় আপনি উপলব্ধি করবেন- কেঁদে আর কী লাভ? আপনাকে তো সামনে এগিয়ে যেতেই হবে।’সংগৃহীত ছবি

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!