রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

যেভাবে ট্রাম্পের অনুষ্ঠানে ড্রোন হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ করে এফবিআই

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬, ১২:২১ পিএম

যেভাবে ট্রাম্পের অনুষ্ঠানে ড্রোন হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ করে এফবিআই

ডেইলি খবর ডেস্ক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতিতে হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত ইউএফসি আয়োজনকে ঘিরে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করেছিল একটি অনলাইনভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী। বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোন দিয়ে আশপাশের ভবনে আতঙ্ক ছড়িয়ে মানুষকে সরিয়ে দেওয়া এবং পরে নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর হামলার পরিকল্পনাও ছিল তাদের। তবে এক স্বজনের দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করে হামলার আগেই পরিকল্পনাটি নস্যাৎ করে ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)।

গত ১৪ জুন হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে অনুষ্ঠিত হয় ‘ইউএফসি ফ্রিডম ২৫০’। যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানটি ছিল হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত প্রথম পেশাদার ক্রীড়া আয়োজন। একই দিন ছিল ট্রাম্পের ৮০তম জন্মদিন। ফলে অনুষ্ঠানটিকে ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও এবিসি নিউজের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, হামলার পরিকল্পনাকারীরা অনলাইন যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিলেন। পরে এফবিআই ১৯ বছর বয়সী ওহাইওর বাসিন্দা টাইজেন প্রপারের মোবাইল ফোনে একটি সিগন্যাল গ্রুপ চ্যাটের সন্ধান পায়। সেখানে প্রায় ১৯ জন সদস্য ছিল। পাশাপাশি নির্দিষ্ট এলাকা ও দায়িত্ব অনুযায়ী আরও কয়েকটি ছোট গ্রুপে আলোচনা চলছিল।

তদন্তকারীরা জানতে পারেন, গ্রুপের সদস্যরা হোয়াইট হাউসের আশপাশের এলাকা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছিলেন এবং হামলার পর পালানোর পরিকল্পনাও করছিলেন। তারা বিস্ফোরক বহনে সক্ষম ড্রোন তৈরির পাশাপাশি হামলার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহের বিষয়েও আলোচনা করেন।

পুলিশ হামলার পরিকল্পনার কথা প্রথম জানতে পারে একটি পরিবারের উদ্বেগের সূত্র ধরে। প্রপারের মা তার ছেলের আচরণ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি লক্ষ্য করেন, ছেলে অনলাইনে কিছু ব্যক্তির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছেন, অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম কিনছেন এবং কথোপকথনে ‘রিকন’ ও ‘মিশন’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করছেন।

পুলিশের কাছে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রপার তার মাকে জানিয়েছিলেন, তিনি অনলাইনে পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন। তবে পরিকল্পনার বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানান। তার কথাবার্তা ও আচরণে উদ্বিগ্ন হয়ে পরিবার বিষয়টি পুলিশকে জানায়।

এরপর ১০ জুন প্রপারের বাড়িতে যায় পুলিশ। তদন্তকারীরা দেখতে পান, তার কাছে অস্ত্র, গুলি, বডি আর্মারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম রয়েছে। পরে তার মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে হামলার পরিকল্পনা নিয়ে চলা গ্রুপ চ্যাটের সন্ধান মেলে।

তদন্তে আরও উঠে আসে, গ্রুপটির সদস্যরা টিকটক, সিম্পলএক্স, টেলিগ্রাম ও অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভুয়া নামে যোগাযোগ করতেন। তারা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতেন এবং সরকারকে উৎখাত করে নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মতো ধারণা নিয়ে আলোচনা করতেন।

গ্রুপটির সদস্যরা নিজেদের মধ্যে লক্ষ্যবস্তু নিয়েও আলোচনা করেন। তদন্তে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ইলন মাস্ক এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নাম উঠে আসে, যাদেরকে হত্যার লক্ষবস্তু করা হয়েছিল। কয়েকজন রাজনীতিকের ছবিও চ্যাটে শেয়ার করা হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

গ্রুপটির ‘হান্টার্স’ নামের একটি চ্যাটে হোয়াইট হাউসের আশপাশের এলাকার আকাশচিত্র এবং পালানোর পথ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। হামলার পর কোথায় আশ্রয় নেওয়া হবে, সে বিষয়েও পরিকল্পনা করা হয়। নেব্রাস্কার একটি পুরোনো গির্জাকে সম্ভাব্য নিরাপদ স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

এফবিআইয়ের তদন্তে আরও জানা যায়, হামলার জন্য শুধু ড্রোন নয়, গুলি চালানোর একটি দলও প্রস্তুত করা হচ্ছিল। তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, চ্যান্ডলার স্ক্যাগস নামে ২১ বছর বয়সী এক তরুণকে সম্ভাব্য স্নাইপার হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রপার তাকে ওয়াশিংটনে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল।

প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, হামলার কয়েক দিন আগে গ্রুপের এক সদস্য মাইকেল থমাস চ্যাটে লেখেন, ‘এটা রক্তক্ষয়ী ঘটনা হতে যাচ্ছে।’ অন্য সদস্যরাও হামলা সফল করার বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

তদন্তে প্রপারের কর্মকাণ্ডেরও নানা তথ্য উঠে আসে। তিনি ওহাইওর একটি ল্যান্ডস্কেপিং প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছেড়ে দেন এবং অস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম কেনেন। তার পরিবার পরে জানতে পারে, উচ্চবিদ্যালয়ের সমাপনী উপলক্ষে পাওয়া প্রায় ৩ হাজার ডলার তিনি এসব সরঞ্জাম কিনতে ব্যয় করেছেন।

তার ঘর তল্লাশি করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একটি নোটবুকও পায়। এতে বিভিন্ন রাজনীতিক ও তারকার নামের পাশাপাশি সরকার সম্পর্কে তার নানা বিশ্বাস ও অভিযোগের কথা লেখা ছিল বলে তদন্তকারীরা জানান।

১১ জুন জিজ্ঞাসাবাদের সময় প্রপার হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত ইউএফসি আয়োজনকে ঘিরে সমন্বিত হামলার পরিকল্পনার কথা স্বীকার করেন বলে প্রসিকিউটররা দাবি করেছেন। তিনি জানান, গ্রুপের সদস্যরা মনে করতেন যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ভেঙে ফেলে’ নতুন করে গড়ে তুলতে হবে এবং হামলাটি তাদের কথিত বিপ্লবের সূচনা করতে পারে।

এরপর প্রপারকে আটক করে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং আদালতের নথিতে তার বিরুদ্ধে সহিংসতার চিন্তাভাবনার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

তবে প্রপার গ্রেপ্তার হওয়ার পরও গ্রুপটির অন্য সদস্যরা পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তাদের কথোপকথনে হামলা থেকে সরে আসার সুযোগ শেষ হয়ে গেছে; এমন মনোভাবও প্রকাশ পায়।

এ ঘটনায় প্রপারের পাশাপাশি ক্যালিফোর্নিয়ার ব্রায়ান ওমর রোয়া, মাইকেল অ্যালান থমাস, মিসৌরির ড্যানিয়েল এসক্রিজ এবং নেব্রাস্কার আব্রাহাম হারমোসিলো আলভারেজসহ আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

তদন্তকারীদের দাবি, আলভারেজ ‘শেফার্ড’ নামে গ্রুপটিতে পরিচিত ছিলেন এবং হামলার পরিকল্পনা ও সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিলেন। অন্যদিকে থমাসের বাড়ি থেকে রাইফেল, গুলি ও একটি পিস্তল জব্দের কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ফেডারেল প্রসিকিউটররা পরে কয়েকজনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে বস্তুগত সহায়তা দেওয়ার ষড়যন্ত্র ও হত্যার ষড়যন্ত্রসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনেন। সংশ্লিষ্ট সবাই অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন।

এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেল বলেন, পুরো অভিযানটি ছিল একাধিক অঙ্গরাজ্যজুড়ে পরিচালিত একটি সমন্বিত আইনশৃঙ্খলা অভিযান। তার মতে, বড় ধরনের জনসমাগমের অনুষ্ঠানকে ঘিরে মানুষের নিরাপত্তার জন্য হুমকি শনাক্ত ও তা মোকাবিলায় এফবিআই ও তাদের সহযোগী সংস্থাগুলো কাজ করেছে। সূত্র : দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!