বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩

এবার বড় প্রশ্নের মুখে মক্কা চুক্তি, চাপে পাকিস্তান

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬, ১০:৪১ পিএম

এবার বড় প্রশ্নের মুখে মক্কা চুক্তি, চাপে পাকিস্তান

ডেইলি খবর ডেস্ক: ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা আয়োজনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে আঞ্চলিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পর গত মাসে পাকিস্তান তার সম্প্রসারিত কূটনৈতিক তৎপরতায় একটি বড় মাইলফলক অর্জন করে। ইসলামের পবিত্রতম নগরী মক্কায় সৌদি ও তুরস্কের সঙ্গে একটি ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে ইসলামাবাদ।
গত ৭ আগস্ট মক্কায় স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বলা হয়েছে, চুক্তির কোনো এক পক্ষের ওপর হামলাকে সব পক্ষের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এ কারণে চুক্তির এই ধারার সঙ্গে ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর তুলনা শুরু হয়।ক্যালেন্ডার অ্যাপ বাছুন

পরবর্তীতে চুক্তির এই অঙ্গীকার খুব দ্রুতই পরীক্ষার মুখে পড়ে। ৮ সেপ্টেম্বর ইরানের সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবে ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
তবে রিয়াদের সঙ্গে সামরিক পাল্টা অভিযানে ইসলামাবাদ কিংবা আঙ্কারা কেউই অংশ নেয়নি। তারা এর পরিবর্তে কঠোর কূটনৈতিক বিবৃতি দেয়ার পথ বেছে নেয়।
পাকিস্তানের জন্য এখন বড় প্রশ্ন হলো- সৌদির প্রতি নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি কীভাবে রক্ষা করবে ইসলামাবাদ, অথচ একই সঙ্গে কীভাবে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এড়াবে?

হুতিদের হামলার পরপরই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ সাংবাদিকদের বলেন, পাকিস্তান এই চুক্তির শর্তের কারণে “বাধ্য” এবং প্রয়োজন হলে তা মেনে চলবে।
তবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান স্পষ্ট করে বলেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে কোনো আলোচনা এখনো হচ্ছে না।

১০ সেপ্টেম্বর ইসলামাবাদে সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, পাকিস্তান একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, এটি একটি বাস্তবতা... কিন্তু এই মুহূর্তে এ ধরনের কোনো আলোচনা নেই।
এই প্রতিক্রিয়ায় রাজনৈতিক সংহতি এবং সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এর ফলে সৌদির সঙ্গে জোটের সম্পর্ক এবং প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে স্পর্শকাতর সম্পর্ক- দুটির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে পাকিস্তান।

কঠিন ভারসাম্যে পাকিস্তান-সৌদি আরবে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রিয়াদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে গভীর হয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত পৃথক দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা কাঠামোর আওতায় চলতি বছরের এপ্রিলে সৌদি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করে যে পাকিস্তানের সেনা সদস্যদের পাশাপাশি পাকিস্তান বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান ও সহায়ক বিমান সৌদির কিং আবদুলআজিজ বিমানঘাঁটিতে পৌঁছেছে।

উপসাগরীয় বিষয়াবলি সম্পর্কে অবগত এক পাকিস্তানি কর্মকর্তা বলেন, ইসলামাবাদের বর্তমান অবস্থান কিছুটা হলেও ২০১৫ সালের সংকটের পুনরাবৃত্তি।
সেবার পাকিস্তানের পার্লামেন্ট ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেয়ার পরিবর্তে নিরপেক্ষ থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছিল। ওই সিদ্ধান্তে রিয়াদের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপড়েন সৃষ্টি হয়।

ইসলামাবাদভিত্তিক থিংকট্যাংক সানোবার ইনস্টিটিউটের প্রধান কামার চিমা বলেন, এই জোট রাষ্ট্রীয় পক্ষগুলোর সঙ্গে লড়াই করবে এবং প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করবে। এটি কৌশলগত গভীরতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ, যা সৌদি খুঁজছে।

পাকিস্তানের জন্য পরিস্থিতি এখনো অস্থির এবং তা অনেকটাই হুতিদের তৎপরতার সঙ্গে সম্পর্কিত।-পাকিস্তানি ওই কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আরও তীব্র হলে অথবা সৌদির কৌশলগত স্থাপনাগুলোতে মোতায়েন পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটলে, ইসলামাবাদে জনমত ও রাজনৈতিক চাপ সরকারকে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতে পারে।

এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বর্তমান অস্পষ্ট অবস্থানই ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির সরাসরি পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।
চিমা বলেন, এই পর্যায়ে হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা চালানো পাকিস্তানের জন্য কোনো বিকল্প নয়।

পাকিস্তানের জন্য এই কৌশলগত সমীকরণের সবচেয়ে জটিল উপাদান হলো ইরান। প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ অরক্ষিত সীমান্ত ভাগ করে নেয়া দুই দেশ নিয়মিতভাবে পারস্পরিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে।

হুতিদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সামরিক অভিযান তেহরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, ইরানের একটি প্রক্সির বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়লে পাকিস্তান-ইরান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং একই সঙ্গে পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে নতুন নিরাপত্তা চাপ তৈরি হতে পারে।

ইরানের বাইরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিয়া জনগোষ্ঠীর আবাস পাকিস্তান। তাদের একটি বড় অংশ উইলায়াত-ই ফকিহ মতবাদের অধীনে ধর্মীয় দিকনির্দেশনার জন্য তেহরানের দিকে তাকিয়ে থাকে।

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের বিমান হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর পাকিস্তানে যে সহিংসতা ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল, দেশটির সামরিক নেতৃত্ব তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলেও তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে সাম্প্রদায়িক সংবেদনশীলতা সবসময়ই একটি বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে থেকে যায়।
অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কাও তাৎক্ষণিক। পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি এবং হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা দ্রুত দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে

তিন দেশ, তিন ধরনের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার-জোটটির সামনে আরও একটি গভীর সমস্যা রয়েছে- পাকিস্তান, সৌদি ও তুরস্কের হুমকি সম্পর্কে অভিন্ন ধারণা নেই।
পাকিস্তানের প্রধান সামরিক উদ্বেগ এখনো ভারত। এর সঙ্গে সীমান্তপারের জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের সঙ্গে উত্তেজনাও পাকিস্তানের নিরাপত্তা হিসাবকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সৌদির অগ্রাধিকার ভিন্ন। রিয়াদের প্রধান উদ্বেগ হলো নিজেদের ভূখণ্ড, জ্বালানি অবকাঠামো ও সামুদ্রিক রুট সুরক্ষিত রাখা। একই সঙ্গে ইরান এবং হুতিদের মতো সশস্ত্র অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর হুমকি মোকাবিলা করাও তাদের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য, বিশেষ করে দেশটির দক্ষিণ সীমান্তে।

তুরস্কের নিরাপত্তা পরিধি আরও বিস্তৃত। এর মধ্যে রয়েছে সিরিয়া, ইরাক, পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও ককেশাস।
এই ভিন্ন ভিন্ন অগ্রাধিকার একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে- কোনো সদস্য যদি এমন একটি সংঘাতের মুখোমুখি হয়, যেটিকে অন্য সদস্য নিজের সংঘাত হিসেবে মনে করে না, সেক্ষেত্রে তাকে রক্ষায় বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক মূল্য দিতে প্রত্যেক সদস্য কি প্রস্তুত থাকবে? সংগৃহীত ছবি,সূত্র: মিডল ইস্ট আই 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!