সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

ইরানে হামলা নিয়ে এবার নেতানিয়াহু-সেনাপ্রধানের নজিরবিহীন বিরোধ

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ১২:১৫ পিএম

ইরানে হামলা নিয়ে এবার নেতানিয়াহু-সেনাপ্রধানের নজিরবিহীন বিরোধ

ডেইলি খবর  ডেস্ক: ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও দেশটির সেনাপ্রধান আইয়াল জামিরের মধ্যে নজিরবিহীন বিরোধ তৈরি হয়েছে। ইসরায়েলের টেলিভিশন চ্যানেল ১২-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর দেওয়া একটি সামরিক নির্দেশ কার্যকর করতে আপত্তি জানিয়েছেন জামির। প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের অভিযান নির্বাচনের ঠিক আগে ইরানের সঙ্গে নতুন করে সংঘাতের সূত্রপাত করতে পারে।

রোববার প্রকাশিত প্রতিবেদনে নাম প্রকাশ না করা সূত্রের বরাতে বলা হয়, নির্দিষ্ট অভিযানের বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। তবে জামির এ নিয়ে আরও আলোচনা এবং নেতানিয়াহুর কাছ থেকে অভিযানের আইনগত অনুমোদনসংক্রান্ত স্বাক্ষরিত নথি চেয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় বিষয়টি নিয়ে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এক সামরিক সূত্রের বরাতে চ্যানেল ১২ জানায়, প্রস্তাবিত পদক্ষেপের ফলে ইরানের সঙ্গে সংঘাত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এমন এক সংবেদনশীল সময়ে ভুল হিসাব থেকে বড় ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে রাজনৈতিক স্বার্থে ইরান ইস্যু ব্যবহারের চেষ্টা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

তবে এ প্রতিবেদনকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন নেতানিয়াহু। চ্যানেল ১৪-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জামিরের সঙ্গে তার কোনো বিরোধ হয়নি। একই সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু দাবি করেন, সম্প্রতি তিনি ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদকে ইরানের সরকার উৎখাতের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এ বক্তব্যের সঙ্গে সাম্প্রতিক দিনগুলোর নির্দিষ্ট সামরিক নির্দেশের সম্পর্ক স্পষ্ট নয়।

এর আগে বৃহস্পতিবার চ্যানেল ১৩-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যক্তিগত এক বৈঠকে জামির জানিয়েছিলেন, নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালানোর কোনো সামরিক প্রয়োজনীয়তা তারা দেখছেন না। তবে হামলা প্রয়োজন বলে নির্ধারিত হলে তা চালানো হবে বলেও তাকে উদ্ধৃত করা হয়।

২৭ অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে নেতানিয়াহু ইরানের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত বাধানোর চেষ্টা করছেন কি না, তা নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক চলছে। বিরোধীদের অভিযোগ, নির্বাচনে সুবিধা পেতে কিংবা ভোট পেছাতে তিনি যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেন। নেতানিয়াহু অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বিরোধী নেতারা রোববারের প্রতিবেদন প্রকাশের পর নেতানিয়াহুর সমালোচনা করেন। বিরোধী দলের নেতা গাদি আইজেনকোট বলেন, দেশের নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা উচিত নয়। সেনাপ্রধান জামিরের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনি বলেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াইয়ের হাতিয়ারে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না।

বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদ অভিযোগ করেন, নির্বাচন পেছানোর উদ্দেশ্যে নেতানিয়াহু ইরানের সঙ্গে সংঘাত বাড়াতে চাইছেন। সাবেক উপসেনাপ্রধান ও ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলানও জামিরের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, স্পষ্ট নিরাপত্তাগত কারণ, কৌশলগত লক্ষ্য ও দায়িত্বশীল পরিকল্পনা ছাড়া কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়।

ইসরায়েল বেইতেনু পার্টির নেতা আভিগদর লিবারম্যানও অভিযোগ করেন, নির্বাচন ঠেকাতে নেতানিয়াহু জোর করে দেশকে সামরিক অভিযানের দিকে ঠেলে দিতে পারেন। এ পরিস্থিতিতে সেনাপ্রধানকে সেনাবাহিনী ও সেনাসদস্যদের ঝুঁকির মুখে না ফেলার আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে রোববার ইরানের সম্ভাব্য হামলা নিয়ে আবারও হুঁশিয়ারি দেন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, ইরান বা তাদের মিত্ররা নির্বাচন বানচাল করতে হামলা চালাতে পারে বলে ইসরায়েলের কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আক্রমণ ও প্রতিরক্ষা—দুই ধরনের অভিযানের জন্য প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।

নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তেল আবিবের ওপর পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ছবি পোস্ট করা হয়। এর সঙ্গে এমন বক্তব্যও ছিল, তিনি পুনর্র্নিবাচিত না হলে ইসরায়েল দ্বিতীয় হলোকাস্টের মুখে পড়তে পারে। অ্যাক্সিওসের সাংবাদিক বারাক রাভিদের দাবি, পোস্টটি নিয়ে হোয়াইট হাউসে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এতে ইরান ভুল হিসাব করে হামলা চালাতে পারে এবং যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়।

এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, রোববার ইরানে কোনো হামলা চালানো হবে না। এর আগে ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে সমঝোতা করবেন, নাকি দেশটিকে পুরোপুরি পরাস্ত করার পথে যাবেন—এটাই এখন তার সামনে প্রধান প্রশ্ন। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে বলেও দাবি করেন ট্রাম্প।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি পাল্টা বলেছেন, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলেও তেহরানের নীতিতে পরিবর্তন আসবে না। রোববার তেহরানে এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, যুদ্ধ হবে কি হবে না, তা যা-ই হোক, ইরানের নীতি একই থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আগেও দুবার চেষ্টা করে ফল দেখেছে; আবার চেষ্টা করলেও ভিন্ন ফল পাবে না।

গত ৮ এপ্রিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এতে সবচেয়ে তীব্র লড়াই বন্ধ হলেও হরমুজ প্রণালির আশপাশে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ ঘটেছে। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের বিরোধ অব্যাহত রয়েছে। ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধও চলছে।

জুনে সংঘাতের স্থায়ী অবসানের পথ তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারকে সম্মত হলেও পারস্পরিক চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগে তা ভেস্তে যায়। এরপর তেহরান আবার আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। রোববার কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তেহরানে ছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

আরাগচি বলেন, চলমান যুদ্ধ সবকিছু বদলে দিয়েছে এবং নতুন বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। তার ভাষায়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ও এই জলপথ পরিচালনার পদ্ধতি আর আগের মতো থাকবে না। শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য অঞ্চলটিকে বিদেশি সেনার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতির দিকে এগোতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।সংগৃহীত ছবি,সূত্র: দ্য টাইমস অব ইসরায়েল

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!