ডেইলি খবর ডেস্ক: বিশ্বের নতুন নতুন অঞ্চল ও দেশে ছড়িয়ে পড়ছে যুদ্ধ। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা ও হুমকি অব্যাহত রেখেছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যে বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে। এদিকে পারস্য উপসাগর ছাপিয়ে ইরানযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে নতুন নতুন অঞ্চলে। বিশেষ করে এখন তীব্র উত্তেজনা চলছে লোহিত সাগর উপকূলে। সেখানে ইয়েমেনের ইরানসমর্থিত হুথি বিদ্রোহী ও সৌদি আরবের মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া কাস্পিয়ান সাগরে ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেন হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মিশরের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দরনগরী দামিয়েত্তায় ড্রোন হামলার কারণে দুটি জাহাজে আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে। ইরাকে ইরানসমর্থিত মিলিশিয়াদের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে রাশিয়া ও ইউক্রেনের পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চলছেই। এ যুদ্ধের আঁচ লেগেছে পোল্যান্ডেও। এর মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক উত্তেজনা এখন আরও বহুমুখী ও জটিল রূপ নিয়েছে। আর এসব যুদ্ধে বিভিন্ন দেশে সামরিক-বেসামরিক মানুষের হতাহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। তবে যুদ্ধ বন্ধে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত : ইরানের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে গত বুধবার রাতভর হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। তারা বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর ওপর আকস্মিক হামলার পাল্টা জবাব দিতে এসব হামলা চালানো হয়। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)
গতকাল বৃহস্পতিবার এক্সে এক পোস্টে জানায়, জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে গত মঙ্গলবার হামলা করেছিল ইরান। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশটিতে ‘শক্তিশালী জবাব’ দেওয়া হচ্ছে।
আল-জাজিরা জানিয়েছে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক জায়গায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। দেশটির আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানায়, কেশম দ্বীপে তিনটি বিস্ফোরণ হয়েছে। বুশেহর প্রদেশেও বিস্ফোরণ হয়েছে। এ ছাড়া খুজেস্তান প্রদেশের আবাদান শহরে, হোরমোজগান প্রদেশের বন্দর আব্বাসে, আবু মুসা, সিরিক, কিশ শহরেও একাধিক হামলার খবর জানিয়েছে ইরানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব জানিয়েছে, ইরাক থেকে সৌদি তেলের স্থাপনায় চালানো ড্রোন হামলার জবাবে তারা ইরানসমর্থিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ)-এর বিভিন্ন ঘাঁটিতে গত বুধবার হামলা চালিয়েছে। পিএমএফ-এর দাবি, এসব হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত এবং ৩২ জন আহত হয়েছেন। এর জবাবে ইরান আবারও জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি ও হরমুজ প্রণালিতে থাকা জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালায়। আইআরজিসি জানিয়েছে, ‘শিশুহত্যায় জড়িত থাকা মার্কিন সামরিক বাহিনীর আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের জবাব দিতে’ তারা জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানঘাঁটি এবং একটি কমান্ড সেন্টারে আকস্মিক হামলা চালায়। সম্প্রতি সিরিয়ার আল-তানফ ঘাঁটিতে মার্কিন কমান্ড সেন্টারে হামলা চালায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
এর আগে টানা ১৩ রাতের ধারাবাহিক হামলার পর গত শুক্রবার ইরানের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, তারা ইরানের অস্ত্র ও সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল। যদিও সপ্তাহ না ঘুরতে সে অবস্থান থেকে সরে এসেছে মার্কিন বাহিনী।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ওই সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, এ যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ পাঁচ মাস পেরিয়েছে। শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
ট্রাম্প ইরানকে কঠোর হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, মার্কিন সেনাদের ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে, যুক্তরাষ্ট্র কঠোর জবাব দেবে। অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান দেশবাসীকে শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ইরান অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবে না।
মিশরের গ্যাস বন্দরে বিস্ফোরণ: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। গত বুধবার মিশরের দামিয়েত্তা প্রাকৃতিক গ্যাস বন্দরে ড্রোন হামলায় বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তবে ওই হামলার জবাবে মিশর এখনও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যামব্রের তথ্য অনুযায়ী, দামিয়েত্তা বন্দরে একটি জাহাজে ড্রোন আঘাত হানলে আগুন ছড়িয়ে পাশের আরেকটি জাহাজেও পৌঁছে যায়। নাবিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তবে এ হামলার দায় এখনও কোনো পক্ষ স্বীকার করেনি।
এদিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ও মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তির মধ্যে টেলিফোনে আলোচনা হয়েছে। তারা গাজা ও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানান।
হুতিদের হামলা থেকে জাহাজের নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক জোট গঠনের উদ্যোগ: লোহিত সাগরে হুতিদের হামলা থেকে তেলবাহী জাহাজ রক্ষা করতে একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের চেষ্টা করছে সৌদি আরব। এই আলোচনার বিষয়ে অবগত দুজন ব্যক্তি গত বুধবার এমন তথ্য জানিয়েছেন। জোটটি ঠিক কাদের নিয়ে গঠিত হবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে ডজনখানেক দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
হুতিরা ২০ জুলাই জানায়, ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরবের তথাকথিত অবরোধের জবাবে তারা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ আরোপ করছে। তবে ইয়েমেন অবরোধের বিষয়টি অস্বীকার করেছে রিয়াদ। তার পর থেকে হুতিরা জানিয়েছে, তারা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। জবাবে সৌদি আরবও ইয়েমেনের হুদাইদাহ বন্দরে হুতিদের সামরিক স্থাপনাগুলোয় বিমান হামলা চালিয়েছে। তাদের মতে, হুতিরা এই বন্দর ব্যবহার করে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে হুমকি দিত।
এই অবরোধ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে চলমান ইরানযুদ্ধে নতুন এক ফ্রন্ট খুলে দিয়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে পারস্য উপসাগরের বাইরের তেল ও অন্যান্য সরবরাহকারী ট্যাঙ্কারগুলোয় হামলা আরও বেড়ে গেছে। সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও বড় প্রভাব পড়েছে। গত বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা সাম্প্রতিক মাসগুলোর অন্যতম বড় মূল্যবৃদ্ধি।
এদিকে, রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথি গোষ্ঠী দক্ষিণ লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের কাছ থেকে ফি আদায়ের পরিকল্পনা করছে। যদিও এ পরিকল্পনা কবে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।
অন্যদিকে কাস্পিয়ান সাগরে গত শনিবার ইরানের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন- এমন দাবি করেছে তেহরান। ওই হামলায় এক নাবিক নিহত ও অপর একজন আহত হয়েছেন। তেহরান হুশিয়ারি দিয়েছে, এই হামলার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, নৌযানটি ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এর ফলে ইরান-ইউক্রেন রেশারেশি যুদ্ধে গড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি যানে ড্রোন হামলা: দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একটি ইঞ্জিনিয়ারিং যানে বিস্ফোরক ড্রোন হামলার তীব্র প্রতিবাদ করেছে ইসরায়েল। লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগও এনেছে তারা। গত বুধবার ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়, গত মঙ্গলবার গভীর রাতে অধিকৃত দক্ষিণ লেবাননের ‘আলি তাহের রিজ’ অঞ্চলে আইডিএফের একটি বিস্ফোরকবোঝাই যানে ড্রোন হামলা চালায় লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী। তবে এই হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছে তারা। আইডিএফ জানিয়েছে, এই ঘটনার পর তারা পাল্টা কামান হামলা চালায়।
এদিকে গাজার কেন্দ্রস্থলে আল-মুত্তাকিন মসজিদ ও বাস্তুচ্যুতদের তাঁবুতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত একজন নিহত এবং ২০ জন আহত হয়েছেন। ২৮ জুলাই চালানো এই হামলায় শত শত মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছে।
পোল্যান্ডের ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র: ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলায় গতকাল বৃহস্পতিবার অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন। হামলা ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর লভিভ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। রাশিয়ার ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিবেশী পোলিশ ভূখণ্ডে পড়ে বিস্ফোরিত হলে ন্যাটো ও পোল্যান্ড যুদ্ধবিমান আকাশে পাঠায়। পোল্যান্ড ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার জন্য রাশিয়াকে দোষারোপ করেছে। সিএনএন জনায়, গতকাল বৃহস্পতিবার সকালের দিকে পোলিশ ভূখণ্ডের প্রায় ৯০ কিলোমিটার ভেতরে পড়ে ক্ষেপণাস্ত্রটি বিস্ফোরিত হয়। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বলেছেন, ক্ষেপণাস্ত্রটি রাশিয়ার কেএইচ-১০১ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এক বিবৃতিতে বলেছেন, রাশিয়া ৭০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ২৮০টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এ ছাড়া ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়ার এই হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজধানী কিয়েভ এবং ইউক্রেনসংলগ্ন পোল্যান্ডের সীমান্তের পশ্চিমাঞ্চলীয় লিভিভ অঞ্চলে আঘাত হানা।
পোল্যান্ডে ক্ষেপণাস্ত্র পড়ার ঘটনায় ন্যাটোর ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তার পাশাপাশি এ যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা আরও জোরালো হচ্ছে। ছবি-সংগৃহীত সুত্র-আলজাজিরা, সিএনএন, রয়টার্স।

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :