বুধবার, ০৮ এপ্রিল, ২০২৬, ২৫ চৈত্র ১৪৩২

হরমুজ প্রণালি পারাপারে প্রতিটি জাহাজ থেকে ১০ লাখ ডলার টোল নেবে ইরান

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: এপ্রিল ৮, ২০২৬, ০৭:৩০ পিএম

হরমুজ প্রণালি পারাপারে প্রতিটি জাহাজ থেকে ১০ লাখ ডলার টোল নেবে ইরান

ডেইলি খবর ডেস্ক: পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা চলাকালীন আগামী দুই সপ্তাহ নতুন করে খুলে দেওয়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী প্রতিটি জাহাজ থেকে ১০ লাখ ডলার করে আদায় করতে চাইছে ইরান। খবর ডেইলি মেইলের।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাতে এক ঘোষণায় জানান, ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি পুনরায় খুলে দেবে। এই সময়ের মধ্যে উভয় পক্ষ ১০ দফা শান্তি পরিকল্পনা বিবেচনা করে দেখবে।তবে চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্তাবলী এখনো প্রকাশ করা হয়নি। আজ বুধবার (৮ এপ্রিল) প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্কাই নিউজকে বলেন, ‘পয়েন্টগুলো খুব ভালো এবং সেগুলোর বেশিরভাগই চূড়ান্ত হয়েছে। যদি এটি কার্যকর না হয়, তবে আমরা খুব সহজেই আগের অবস্থানে (যুদ্ধে) ফিরে যাব।’
তবে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই দুই সপ্তাহের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর ওপর ১০ লাখ ডলার পর্যন্ত ‘টোল’ ধার্য করতে চায় ইরান। কয়েক সপ্তাহব্যাপী চলা এই সংঘাতের পর দেশ পুনর্গঠনের কাজে এই টোলের টাকা ব্যবহার করবে ইরান।ইরানের দেওয়া ১০ দফা পরিকল্পনায় আরও বলা হয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রকে প্রণালির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে হবে, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার স্বীকার করতে হবে, ইরানের ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং এই অঞ্চল থেকে সমস্ত সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে। মঙ্গলবার ট্রাম্প এই চুক্তিকে ‘সম্পূর্ণ ও নিরঙ্কুশ বিজয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অ্যাক্সিওস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী,ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার আলোচকদের চুক্তির দিকে এগোনোর নির্দেশ দেওয়ার পরই এটি সম্ভব হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মোজতবা খামেনির ‘সবুজ সংকেত’ ছাড়া এই চুক্তি সম্ভব হতো না।
এদিকে, ইরানের এই টোল আদায়ের দাবির পর গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিটি এখন ‘তেহরান টোলবুথ’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। ব্লুমবার্গের তথ্যমতে, জাহাজ মালিকদের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মধ্যস্থতাকারী কোম্পানিগুলোকে জাহাজের কার্গো, গন্তব্য এবং মালিকানা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানাতে হবে। ইরান প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য অন্তত এক ডলার টোল ধরছে—যা চীনা ইউয়ান বা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে পরিশোধ করতে হবে। একটি গড়পড়তা তেল ট্যাঙ্কারের জন্য এই চার্জ দাঁড়ায় ২০ লাখ ডলার। সব অনুমোদিত হলে আইআরজিসি-র বোটগুলো সেই জাহাজকে পাহারা দিয়ে পার করে দেবে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী পাঁচ বছরে এখান থেকে ৫০ হাজার কোটি (৫০০ বিলিয়ন) ডলার আয় হতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ পোস্টে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে জট কমাতে সাহায্য করবে এবং এখান থেকে প্রচুর অর্থ আয় হবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, ইরানের ওপর হামলা বন্ধ হলে তাদের অভিযানও বন্ধ থাকবে। তিনি তার এক পোস্টে বলেন, ইরানের সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা তদারকিতে ভূমিকা রাখবে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা-দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতি এবং আলোচনার সুযোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও মার্কিন আইনপ্রণেতা ম্যাক্সওয়েল ফ্রস্ট তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, ‘শেষ মুহূর্তের যুদ্ধবিরতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেই হঠকারী সিদ্ধান্তগুলোকে মুছে দেয় না, যা আমাদের এই সংকটে ফেলেছে। আমাদের এই অবৈধ যুদ্ধে কখনোই জড়ানো উচিত হয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন বিপজ্জনক যুদ্ধবাজ লোক, তিনি আমাদের এই সংকটে ঠেলে দিয়েছেন এবং যুদ্ধাপরাধ করার হুমকি দিয়েছেন।’ মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রাক্তন গোয়েন্দা বিশ্লেষক এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ভিক্টর লাগ্রুন এসব উদ্বেগের প্রতিধ্বনি করে বলেছেন, ‘ইরানের ১০  দফা পরিকল্পনা এবং এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র কী অর্জন করেছে- সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো অস্পষ্ট।’
লাগ্রুন আরও বলেন, ‘প্রত্যেক মার্কিন নাগরিকের মতো আমিও বিশ্বাস করি, শান্তি একটি ভালো বিষয়; কিন্তু বর্তমান প্রশাসন যেভাবে বারবার সাফল্যের সংজ্ঞাকে পরিবর্তন করেছে (লক্ষ্যমাত্রা বদলেছে), তাতে আমি আশঙ্কা করছি, এই যুদ্ধ আমাদের আরও শত শত কোটি ডলার এবং মার্কিনীদের প্রাণ কেড়ে নেওয়া অব্যাহত রাখবে।’ যুদ্ধবিরতির এই ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম নাটকীয়ভাবে কমেছে। ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ১৫ শতাংশ কমে ব্যারেল প্রতি ৯৫ ডলারে নেমে এসেছে, যা মঙ্গলবার সকালেও ১১৬ ডলার ছিল।ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার আজ সকালে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। তিনি এই যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এটি এই অঞ্চলের জন্য স্বস্তির মুহূর্ত নিয়ে আসবে। তিনি উপসাগরীয় অংশীদারদের সঙ্গে ‘হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা’ পুনরুদ্ধারের বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন।এদিকে ইসরায়েলের বিরোধী দলীয় নেতা ইয়াইর লাপিদ এই চুক্তির তীব্র সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে ব্যর্থ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের ইতিহাসে এমন রাজনৈতিক বিপর্যয় আর কখনো ঘটেনি। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার মূল বিষয়ে যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছিল, ইসরায়েল তখন টেবিলের ধারেকাছেও ছিল না।’পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের মধ্যস্থতায় এবং শেষ মুহূর্তে চীনের হস্তক্ষেপে এই চুক্তিটি সম্ভব হয়েছে। বেইজিং মূলত যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনা করে তেহরানকে নমনীয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরবর্তী দুই সপ্তাহের জন্য স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনায় বসবে। যদিও আল জাজিরা ও অন্যান্য সূত্রের মতে, এই পথ খুব একটা সহজ হবে না।সংগৃহীত ছবি

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!