ডেইলি খবর ডেস্ক: হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার কৌশল পরিবর্তনের পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের আরও বিস্তৃত জলসীমায় অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে বিশ্ববাজারে তেলের দাম উঁচু রাখার লক্ষ্যেও তেহরান এ কৌশল নিয়েছে বলে জানিয়েছেন দুই জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা। বুধবার (১৪ অক্টোবর) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকেই হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে তেহরান। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করছে ইরান।মানচিত্র দেখুন
নতুন কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি ইরানি কর্মকর্তারা। তবে তাদের একজন জানান, প্রায় ১০ দিন আগে বিধিনিষেধ অমান্যকারী বলে বিবেচিত জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে হামলার ধরন ও গতি পরিবর্তন করা হয়েছে। এর পর থেকে এসব জাহাজে হামলার ঘটনা বেড়েছে বলে তার দাবি। এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, বৈশ্বিক তেলের দাম কমানোর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রচেষ্টা ব্যাহত করাই এ কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য। সিদ্ধান্তটি ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে এবং দেশটির শাসনব্যবস্থার বিভিন্ন অংশের মধ্যে সমন্বয় রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ইরানের রাডার সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস হওয়ার পর ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সম্ভাব্য লক্ষ্য শনাক্ত করতে ছোট নৌকায় নিরস্ত্র পর্যবেক্ষক ব্যবহার করছে। তাদের কাজের মধ্যে মার্কিন নৌযান শনাক্ত করে আইআরজিসিকে তথ্য সরবরাহ করাও রয়েছে বলে ওই কর্মকর্তার দাবি।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে একটি ধাও বা ঐতিহ্যবাহী পালতোলা নৌকায় থাকা ইরানি পর্যবেক্ষকেরা আইআরজিসিকে সম্ভাব্য লক্ষ্য সম্পর্কে তথ্য দিচ্ছিলেন বলে মার্কিন বাহিনী শনাক্ত করে। পরে মার্কিন বাহিনী নৌযানটির আরোহীদের নৌকা ছেড়ে যেতে বলে এবং সেটি ধ্বংস করে। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হননি বলে দাবি করেন ওই কর্মকর্তা। তবে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি বাড়তে বাধা দিতে পারেনি বলে ওই মার্কিন কর্মকর্তা মন্তব্য করেন। তার মতে, অবশিষ্ট দ্রুতগতির নৌযানগুলো ঝুঁকিতে ফেলতে অনিচ্ছুক ইরান; দেশটির নৌবাহিনীর ওপর মার্কিন হামলার প্রভাবও এর পেছনে রয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের নতুন কৌশলের আওতায় হরমুজ প্রণালির বাইরে ওমান উপসাগর এবং আরও দূরবর্তী জলসীমায় অভিযান বিস্তারের পরিকল্পনা রয়েছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলসংলগ্ন এলাকাসহ প্রণালির বাইরেও জাহাজ লক্ষ্যবস্তু হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হরমুজ এলাকায় বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে স্বাধীন সামুদ্রিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্যের বরাত দিয়ে জানিয়েছে রয়টার্স। গত ৪৮ ঘণ্টায় ট্যাংকারসহ বাণিজ্যিক জাহাজকে ঘিরে অন্তত পাঁচটি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ড্রোন হামলার ঘটনাও রয়েছে। ব্রিটিশ নৌবাহিনী-সংশ্লিষ্ট সংস্থা ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) এবং অন্যান্য সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ হিসাব করা হয়েছে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংস্থা আইএমওর তথ্যেও ৩ থেকে ৫ অক্টোবরের মতো হামলার হার বৃদ্ধির ইঙ্গিত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, হামলার গতি বেড়ে যাওয়াকে পরিকল্পিত পদক্ষেপ বলে মনে হচ্ছে।
ইরানি দুই কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তেহরান এমন পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে, যেখানে দেশটির বিধিনিষেধ অমান্যকারী কোনো জাহাজই হরমুজ প্রণালি পার হতে পারবে না। তাদের একজন বলেন, শিগগিরই প্রণালিতে সম্পূর্ণ বন্ধের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অন্য কর্মকর্তা বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তেলের দাম কমাতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে চায় তেহরান। এ পরিস্থিতিকে তিনি দাবার খেলার সঙ্গে তুলনা করেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ বজায় রাখা এবং নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণের মাধ্যমে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। সংঘাতের অবসানে সমঝোতায় পৌঁছাতে ইরানকে চাপ দেওয়াই ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর ও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রয়টার্সের মন্তব্য চাওয়ার অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।মানচিত্র দেখুন
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার (জেএমআইসি) রোববারের প্রতিবেদনে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকিকে ‘গুরুতর’ বলে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ড্রোনের নজরদারি, লক্ষ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ এবং বেতার যোগাযোগের মাধ্যমে হয়রানির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে এই অচলাবস্থা বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। হামলার আশঙ্কা, জাহাজ পরিবহন ও বিমার ব্যয় বৃদ্ধি এবং নৌপথ স্বাভাবিক করার অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে ইরানের নতুন কৌশল, হামলার বিস্তার এবং তেলের দাম প্রভাবিত করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে রয়টার্সের প্রতিবেদনে যেসব তথ্য এসেছে, তার একটি বড় অংশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্রের বিশ্লেষণনির্ভর। এসব দাবির বিষয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।ফাইল ছ্িব, সুত্র-রয়টার্স

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :