রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬, ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩

এক দশকেই বিশ্বের এলএনজি পরাশক্তি বনে গেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৬, ০৮:৫৫ পিএম

এক দশকেই বিশ্বের এলএনজি পরাশক্তি বনে গেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

ডেইলি খবর ডেস্ক: মাত্র এক দশকের ব্যবধানে বৈশ্বিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাজারে অভূতপূর্ব উত্থান ঘটিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৫ সালে যেখানে দেশটির এলএনজি রফতানি ছিল প্রায় শূন্যের কোটায়, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুটে। এর মাধ্যমে কাতার ও অস্ট্রেলিয়াকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি রফতানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

জ্বালানি খাতবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনার্জি ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ অব ওয়ার্ল্ড এনার্জি অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক এলএনজি রফতানি বেড়েছে প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে প্রায় ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ, বিশ্বে এলএনজি সরবরাহ বৃদ্ধির প্রায় ৯৩ শতাংশই এসেছে এককভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

এক দশকে আমূল পরিবর্তন
২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি রফতানি ছিল ০ দশমিক ০৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুটেরও কম। সে সময় কাতার ছিল বিশ্বের শীর্ষ রফতানিকারক, যার রফতানি ছিল ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। অস্ট্রেলিয়াও দ্রুত উৎপাদন বাড়াচ্ছিল।

কিন্তু ২০২৫ সালে চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি রফতানি বেড়ে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুটে, যা আগের দশকের তুলনায় ২০০ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি। একই সময়ে কাতারের রফতানি হয় ৩ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট এবং অস্ট্রেলিয়ার ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট।

এর ফলে বৈশ্বিক এলএনজি রফতানি বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারিত্ব বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ৪ শতাংশে।

শেল বিপ্লবই বদলে দিয়েছে চিত্র
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই উত্থানের মূল ভিত্তি হলো ‘শেল গ্যাস বিপ্লব’। নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ স্বল্প ব্যয়ে প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন সম্ভব হওয়ায় দেশটি দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হয়।

এর পাশাপাশি মেক্সিকো উপসাগরীয় উপকূলে আগে থেকেই গড়ে ওঠা পাইপলাইন, সংরক্ষণাগার, সমুদ্রবন্দর, পেট্রোকেমিক্যাল অবকাঠামো এবং দক্ষ জনশক্তি এই প্রবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।

যেসব টার্মিনাল একসময় বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানির জন্য নির্মিত হয়েছিল, সেগুলোর অনেকগুলোই পরে এলএনজি রফতানি কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নীতির সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নতুন প্রকল্পে বেড়েছে সরবরাহ
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি রফতানি বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে লুইজিয়ানার প্ল্যাকেমিনস এলএনজি প্রকল্প এবং করপাস ক্রিস্টি স্টেজ-৩ প্রকল্প।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) হিসাব অনুযায়ী, শুধু প্ল্যাকেমিনস প্রকল্প থেকেই ২০২৫ সালে বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহ বৃদ্ধির ৬০ শতাংশের বেশি এসেছে।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি চুক্তিগুলো তুলনামূলকভাবে নমনীয় হওয়ায় ক্রেতারা ইউরোপ, এশিয়া বা লাতিন আমেরিকার যেকোনও বাজারে সহজে চালান ঘুরিয়ে নিতে পারেন। এই সুবিধাও আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন এলএনজির চাহিদা বাড়িয়েছে।

সবচেয়ে বেশি গ্যাস নিয়েছে ইউরোপ
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি সরবরাহ দৈনিক গড়ে ১০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ঘনফুটের তুলনায় অনেক বেশি।

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট এলএনজি রফতানির প্রায় ৬৮ শতাংশই গেছে ইউরোপে।

ইউরোপ রাশিয়া, কাতার, আলজেরিয়া ও নাইজেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকেও এলএনজি আমদানি করেছে। তবে কোনও দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহের কাছাকাছি যেতে পারেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপ এখনও আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। তবে পাইপলাইনের পরিবর্তে এলএনজির মাধ্যমে গ্যাস আমদানির ফলে দেশগুলো এখন প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন উৎস থেকে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে।

রেকর্ড উৎপাদনের সুফল
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন দৈনিক রেকর্ড ১০৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪ শতাংশের বেশি। বর্তমানে বিশ্বের মোট প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

দেশটির অ্যাপালাচিয়া অঞ্চল সবচেয়ে বড় গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্র হলেও পাইপলাইনের সীমাবদ্ধতা সেখানে উৎপাদন বৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে রয়েছে।

অন্যদিকে পারমিয়ান বেসিনে তেল উত্তোলনের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ গ্যাসও উৎপাদিত হচ্ছে। আবার টেক্সাস ও লুইজিয়ানার হেইনসভিল অঞ্চল উপসাগরীয় উপকূলের এলএনজি টার্মিনালের কাছাকাছি হওয়ায় রপ্তানির জন্য এটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বৈশ্বিক গ্যাস বাণিজ্যে নতুন বাস্তবতা
একসময় প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজার মূলত আঞ্চলিক ছিল। উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার বাজার প্রায় আলাদাভাবে পরিচালিত হতো।

কিন্তু এলএনজির দ্রুত বিস্তারের ফলে সেই পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। এখন একটি অঞ্চলে সরবরাহ ব্যাহত হলে তার প্রভাব অন্য অঞ্চলের দামেও পড়ছে।

২০২৫ সালে আন্তঃআঞ্চলিক এলএনজি বাণিজ্য বেড়েছে প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। বিপরীতে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস বাণিজ্য কমেছে প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

বর্তমানে আন্তঃআঞ্চলিক প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় ৫৫ শতাংশই এলএনজির মাধ্যমে হচ্ছে। এক দশক আগে এই হার ছিল ৪০ শতাংশেরও কম।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি প্রবৃদ্ধি এখনও শেষ হয়নি। প্ল্যাকেমিনস ও করপাস ক্রিস্টি প্রকল্পের সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে গোল্ডেন পাস, পোর্ট আর্থার এবং রিও গ্র্যান্ডে এলএনজি প্রকল্প নির্মাণাধীন।

২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি রফতানি দৈনিক গড়ে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৭ সালেও নতুন টার্মিনাল চালু হওয়ায় রফতানি আরও বাড়বে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি দশকের শেষ নাগাদ বিশ্বের মোট এলএনজি বাজারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ, দীর্ঘ সময় এবং পর্যাপ্ত পাইপলাইন অবকাঠামো প্রয়োজন। পাশাপাশি রফতানি বাড়তে থাকলে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসের দামও বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে আরও বেশি সংযুক্ত হয়ে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, ২০২৫ সালে শুধু বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি রফতানিকারকই হয়নি যুক্তরাষ্ট্র; বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে নতুন সরবরাহের প্রায় পুরোটাই এসেছে দেশটি থেকে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত গুরুত্ব আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে। সূত্র: ওয়েল প্রাইস

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!