মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন: এবার ট্রাম্পের ক্ষমতার পরীক্ষা, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মহারণ

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: নভেম্বর ২, ২০২৬, ১১:৩২ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন: এবার ট্রাম্পের ক্ষমতার পরীক্ষা, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মহারণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আগামীকাল মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত হচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই ভোটে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে। ফলের ওপর নির্ভর করছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাকি মেয়াদে আইন পাস, নীতি বাস্তবায়ন এবং তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তের সুযোগ কতটা থাকবে।

সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে শেষ দুই বছরের শাসনকাল। পাশাপাশি ভোটের ফলকে ট্রাম্পের নেতৃত্বে দেশ কোন পথে এগোচ্ছে, সে বিষয়ে জনমতের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচন কী?

মঙ্গলবারের এই নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের সদস্যদের নির্বাচিত করবেন মার্কিন ভোটাররা। প্রতি দুই বছর পরপর যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে যে নির্বাচন হয়, সেটিই মধ্যবর্তী নির্বাচন নামে পরিচিত।

কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান কাজ হলো দেশজুড়ে কার্যকর হবে—এমন ফেডারেল আইন তৈরি ও পাস করা।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কোন রাজনৈতিক দলের হাতে থাকবে—ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি, নাকি বিরোধী ডেমোক্র্যাট পার্টি। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কতটা সহজ হবে, তাও নির্ভর করবে এই ফলের ওপর।যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ প্রেসিডেন্টের এ পর্যন্তকার কাজকর্মে কতটা সন্তুষ্ট, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলকে তার একটি পরিমাপ হিসেবেও দেখা হয়।

কারা নির্বাচিত হবেন?

কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসনে নির্বাচন হবে। সদস্যরা দুই বছরের নির্দিষ্ট মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। সাধারণত প্রতিনিধি পরিষদেই আইনের প্রস্তাব উত্থাপন ও তা নিয়ে বিতর্ক হয়। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন ছাড়া ওই কক্ষে কোনো আইন পাস করানোর ক্ষমতা হারাবেন।

ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে তারা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করতে পারবেন, নথিপত্র ও সাক্ষ্য তলব করতে পারবেন এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ওপর কংগ্রেসের নজরদারি অব্যাহত রাখতে পারবেন। ট্রাম্পকে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসনের দাবিতে তাদের সমর্থকদের চাপের মুখেও পড়তে হতে পারে।

অন্যদিকে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টিতে নির্বাচন হবে। সিনেটররা ছয় বছরের মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিনিধি পরিষদ থেকে আসা আইনের প্রস্তাব অনুমোদন বা আটকে দেয়াসহ নানা দায়িত্ব পালন করে সিনেট। এছাড়া কেবিনেটের সদস্য, রাষ্ট্রদূত এবং ফেডারেল বিচারকদের নিয়োগ অনুমোদন করে সিনেট। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি মনোনয়নের ক্ষেত্রেও সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন।

একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের বড় একটি অংশের ভোটাররা অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের রাজনীতিকদেরও নির্বাচিত করবেন। ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া ও মিশিগানের গভর্নর নির্বাচন সবচেয়ে বেশি নজর কাড়বে।

জ্বালানি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাসস্থান ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় নিয়ে চাপে থাকা অনেক ভোটারের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বড় একটি ইস্যু। মূল্যস্ফীতি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি।

আর এর একটি কারণ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধ। এছাড়া ডেমোক্র্যাটদের দাবি, ট্রাম্পের বাণিজ্য শুল্কের কর্মসূচিও যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের জন্য পণ্যের দাম বাড়িয়েছে।

এছাড়া মঙ্গলবারের এই নির্বাচনে অভিবাসনও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। রিপাবলিকানদের দাবি, ২০২৪ সালের নির্বাচনে দেয়া বড় প্রতিশ্রুতির একটি পূরণ করেছেন ট্রাম্প। তিনি সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কঠোর করেছেন এবং অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু করেছেন। আর এটি নিয়ে প্রায়ই বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। দুই দলের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকরাই এআই নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তায় একমত হয়েছেন। এ অবস্থান তাদের ট্রাম্পের বিপরীতে দাঁড় করিয়েছে। ট্রাম্প প্রযুক্তিটির বিকাশ নিয়ন্ত্রণে আইন করার ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

কোন কোন বিষয় ঝুঁকিতে রয়েছে?


প্রেসিডেন্ট ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি কংগ্রেস যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের তিনটি শাখার একটি। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট দুই কক্ষই রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে দুই কক্ষেই তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুব সামান্য।

প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসন ২১৮টি। কক্ষটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে এটিই ন্যূনতম প্রয়োজনীয় আসনসংখ্যা। তাদের সঙ্গে ভোট দেন একজন স্বতন্ত্র সদস্যও।

সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি। ডেমোক্র্যাটরা ৫১টি আসন পেলে উচ্চকক্ষের নিয়ন্ত্রণ বদলে যাবে। কারণ দুই দল ৫০টি করে আসন পেলেও বর্তমানে রিপাবলিকান ভাইস প্রেসিডেন্টের সমতা ভাঙার ভোট থাকবে।বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা অন্তত একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে নিজেদের আইন প্রস্তাব কংগ্রেসে উত্থাপনের ক্ষমতা পাবেন। অতীতে ভোটাররা প্রায়ই প্রেসিডেন্টের দলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে সেই দলকে ‘শাস্তি’ দিয়েছেন।

সাম্প্রতিক জনমত জরিপে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হার কম দেখা যাচ্ছে। জরিপ-তথ্যভিত্তিক ওয়েবসাইট সিলভার বুলেটিনের হিসাবে, দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেয়ার শুরুতে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন ছিল ৫০ শতাংশের কিছু বেশি। তবে অক্টোবরের শুরুতে তা কমে প্রায় ৩৭ শতাংশে দাঁড়ায়। অন্যদিকে ৬১ শতাংশ মানুষ তার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

তবে দুই কক্ষের সব আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা সমান নয়। কিছু আসনে রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি।

আরও পড়ুন
ইরানে কয়েক দিনের মধ্যেই পারমাণবিক হামলা চালাতে পারেন ট্রাম্প, দাবি বিশ্লেষকের
৬ ঘণ্টা আগে
ইরানে কয়েক দিনের মধ্যেই পারমাণবিক হামলা চালাতে পারেন ট্রাম্প, দাবি বিশ্লেষকের
বিবিসির যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার সিবিএস নিউজ নজর রাখার মতো সিনেটের ১০টি আসনের নির্বাচন চিহ্নিত করেছে। এসব আসন আইওয়া ও নিউ হ্যাম্পশায়ারের মতো অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত। প্রতিনিধি পরিষদের ৪২টি আসনও তাদের নজরদারির তালিকায় রয়েছে, যার মধ্যে অ্যারিজোনা ও ওহাইওর আসন আছে।

এবারের নির্বাচন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ নিয়ে দুই দলের বিরোধের কারণে। রিপাবলিকানরা কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে নিজেদের সুবিধাজনক নির্বাচনী মানচিত্র তৈরি করে সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করেছে। ডেমোক্র্যাটরাও একই পথে এগিয়েছে।

ট্রাম্পের জন্য এর অর্থ কী?

ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের যেকোনো একটির নিয়ন্ত্রণ পেলে কংগ্রেসে ট্রাম্পের পক্ষে আইন পাস করানো কঠিন হয়ে যাবে। এর ফলে তার অভ্যন্তরীণ নীতি সংক্রান্ত পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে নিজ দলের বৃহত্তর সমর্থন ছাড়াও ক্ষমতা প্রয়োগের বিভিন্ন উপায় খুঁজে পেয়েছেন ট্রাম্প।

কংগ্রেসের কোনো একটি কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে গেলে তারা কমিটিগুলো ব্যবহার করে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট থাকার সময়ের বিভিন্ন বিষয় তদন্ত করতে পারবেন। দুর্নীতির অভিযোগ, হোয়াইট হাউসের নতুন বলরুম এবং আইসিইর কর্মকৌশল তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

ট্রাম্পকে অভিশংসন করা হবে কি না, তা নিয়েও ডেমোক্র্যাট পার্টির মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। অভিশংসন হলো কংগ্রেসে অভিযোগ আনা, যা ফৌজদারি নয়, বরং রাজনৈতিক বিচারের ভিত্তি তৈরি করে।

রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্প তার মেয়াদের বাকি সময় নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন চালিয়ে যেতে পারবেন।

২০২৮ সালের নির্বাচনে এর প্রভাব কী?

মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের নাম ব্যালটে থাকে না। তবে ট্রাম্প রিপাবলিকানদের আহ্বান জানিয়েছেন, যেন তারা তার কর্মকাণ্ডের প্রতি সমর্থন জানাতে তাকে ভোট দিচ্ছেন—এমনভাবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেন।

ফল যেদিকেই যাক, বিশ্লেষকেরা তা ব্যবহার করে ট্রাম্পের নেতৃত্বে দেশ কোন পথে এগোচ্ছে, সে বিষয়ে ভোটারদের মনোভাব ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবেন।

ট্রাম্প তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হতে পারবেন না। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ২০২৮ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে কে তার উত্তরসূরি হতে পারেন, তা নিয়ে আলোচনা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের হয়ে কে সেই প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন, তা নিয়েও শুরু হতে পারে জল্পনা।সংগৃহীত ছবি

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!