ডেইলি খবর ডেস্ক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম ইলেকশনস। চার বছরের প্রেসিডেন্ট মেয়াদের ঠিক মাঝপথে বা দুই বছরের মাথায় এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনে ট্রাম্পের দলের জয় নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। ফলে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকতে পারে— এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বা তার দল হেরে গেলে প্রেসিডেন্টকে কি ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে?
প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ছাড়ার কি কোনো সুযোগ আছে?
সরাসরি উত্তর হলো, না। এই নির্বাচনে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি পরাজিত হলেও তাকেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের পদে বহাল থাকতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন চার বছরের মেয়াদের জন্য। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ব্যালট পেপারে সরাসরি প্রেসিডেন্টের নাম থাকে না। তাই এই নির্বাচনে দল হারলেও ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদ হারানোর বা পদত্যাগ করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
তবে নির্বাচন হেরে গেলে এবং কংগ্রেসে বিরোধীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্পের ক্ষমতা পুরোপুরি অবরুদ্ধ বা সীমিত হয়ে পড়বে।
কী এই মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং কীভাবে পরিচালিত হয়?
আমেরিকার দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা বা কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণ করতেই মূলত মধ্যবর্তী নির্বাচন পরিচালিত হয়। এই নির্বাচনের মাধ্যমে দুটি প্রধান কক্ষের প্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়-
১. হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস (প্রতিনিধি পরিষদ) : নিম্নকক্ষের ৪৩৫টি আসনের সবকটিতেই প্রতি দুই বছর পর পর ভোট হয়।
২. সিনেট : উচ্চকক্ষের ১০০টি আসনের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ (প্রায় ৩৪ থেকে ৩৫টি আসন) আসনে প্রতি দুই বছর পর পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
বর্তমান কংগ্রেসে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের ঝুলিতে দুটি কক্ষেরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে তাদের আসন সংখ্যা ২১৮ এবং সিনেটে তাদের রয়েছে ৫৩টি আসন। এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এবং সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখার লড়াইয়ে নেমেছে রিপাবলিকানরা। পক্ষান্তরে, ডেমোক্র্যাটদের জন্য প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেতে নিট ৪টি আসন এবং সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে নিট ৪টি আসনে অতিরিক্ত জয়ের প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপ কী বলছে?
নির্বাচনের কয়েক দিন আগে প্রকাশিত বিভিন্ন জনমত জরিপে ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের জন্য বেশ কিছু উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে-
ইকোনমিস্ট/ইউগভ জরিপ : সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ৪৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক দেশ ও নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম হতাশাবাদী। ৭০ শতাংশ মানুষ মনে করছেন আমেরিকার সার্বিক অবস্থা দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এ ছাড়া অর্ধেকের বেশি মানুষ মনে করছেন দেশটি ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি ও ট্রাম্পের ভাবমূর্তি : ভোটারদের প্রায় ৩৪ শতাংশ আমেরিকান অর্থনীতির অবস্থা ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিকে দেশের এক নম্বর সমস্যা মনে করেন। ট্রাম্প যেভাবে অর্থনৈতিক সংকট সামলাচ্ছেন, সে বিষয়ে প্রায় ৬৭ শতাংশ ভোটার তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
ভোটের ব্যবধান : প্রতিনিধি পরিষদের দৌড়ে ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের চেয়ে প্রায় ৭ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছে (ডেমোক্র্যাট ৪৬ শতাংশ, রিপাবলিকান ৩৯ শতাংশ)। নারী, ল্যাটিনো, কৃষ্ণাঙ্গ এবং শিক্ষিত তরুণেরা ডেমোক্র্যাটদের দিকে ব্যাপকভাবে ঝুঁকেছেন।
রয়টার্স/ইপসোস জরিপ : এই জরিপ অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের সার্বিক গ্রহণের হার বা অপ্রুভাল রেটিং ৩২ শতাংশের কাছাকাছি নেমে এসেছে, যা তার চলতি মেয়াদের সর্বনিম্ন।
নির্বাচনে হেরে গেলে ট্রাম্প যেসব বাধার মুখে পড়বেন-
যদি মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেয়, তবে ট্রাম্পের অবশিষ্ট দুই বছরের প্রেসিডেন্টের মেয়াদ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে পঙ্গু হয়ে যেতে পারে। প্রধান যে জায়গাগুলোতে তিনি বাধার মুখে পড়বেন-
আইনি অচলাবস্থা বা ‘গ্রিডলক’ :
কংগ্রেসে বিরোধী দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্পের কোনো নতুন আইন, করনীতি বা নতুন সামাজিক প্রকল্প পাস করার ক্ষমতা আটকে যাবে। যেকোনো আইন পাস করাতে হলে তাকে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে আপস করতে হবে। ডেমোক্র্যাটরা বাজেট পাসে সায় না দিলে দেশে ‘গভর্নমেন্ট শাটডাউন’ বা সরকারি অর্থায়ন বন্ধের ঝুঁকি তৈরি হবে।
কড়া তদন্ত ও আদালতের সমন :
প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ যে দলের হাতে থাকে, সংসদীয় সবকটি প্রধান বিচার বিভাগীয় এবং অর্থবিষয়ক কমিটির প্রধান হন সেই দলেরই সদস্যরা। ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় এলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, ক্যাবিনেট কর্মকর্তা, এমনকি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক লেনদেন ও নীতিনির্ধারণ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করতে পারবেন এবং সাক্ষ্য প্রমাণের জন্য সমন পাঠাতে পারবেন।
অভিশংসন বা ইমপিচমেন্টের তীব্র ঝুঁকি :
প্রতিনিধি পরিষদ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে তারা সামান্য মেজরিটি বা সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিশংসন প্রস্তাব পাস করিয়ে দিতে পারেন। যদিও ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করতে সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৬৭ জন সদস্যের ভোটের দরকার পড়বে, যা পাওয়া কঠিন। তবুও অভিশংসনের বিষয়টি ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ ভাগকে তীব্র রাজনৈতিক চাপে রাখবে।
বিচারক ও শীর্ষ কর্মকর্তা নিয়োগে বাধা :
সিনেটে যদি রিপাবলিকানরা মেজরিটি হারায়, তবে ট্রাম্প চাইলেই নিজের পছন্দের কোনো বিচারক, ফেডারেল বিচারপতি, রাষ্ট্রদূত বা মন্ত্রী নিয়োগ দিতে পারবেন না। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী সিনেটের অনুমোদন ছাড়া শীর্ষ প্রশাসনিক বা বিচারিক পদগুলোতে কাউকে স্থায়ীকরণ করা যায় না। ডেমোক্র্যাটরা সে ক্ষেত্রে অনুমোদন আটকে রাখতে পারবে।
কেবল নির্বাহী আদেশের ওপর নির্ভরতা :
কংগ্রেসে আইন পাস করা বন্ধ হয়ে গেলে ট্রাম্পকে মূলত প্রেসিডেন্টের বিশেষ ক্ষমতা বা ‘এক্সিকিউটিভ অর্ডারের’ (নির্বাহী আদেশ) ওপর ভরসা করে টিকে থাকতে হবে। তবে আইনগতভাবে এই ধরনের আদেশের ব্যাপ্তি সীমিত এবং এগুলো প্রায়ই সুপ্রিম কোর্ট বা আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে বাতিল হয়ে যায়।
সারসংক্ষেপে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে হেরে গেলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের গদি বা পদ হারাতে হবে না ঠিকই, কিন্তু মার্কিন আইনসভা বিরোধী দলের হাতে চলে গেলে তিনি প্রেসিডেন্ট ভবনে কার্যত ‘ক্ষমতাহীন ডানা ভাঙা’ এক শাসকে পরিণত হবেন।ছবি-সংগৃহীত, সূত্র : দ্য কনভারসেশন ও ইউএসভোট ফাউন্ডেশন

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :