শনিবার, ০৭ মার্চ, ২০২৬, ২৩ ফাল্গুন ১৪৩২

ইরান যুদ্ধ কোথায় গিয়ে শেষ হবে তা এখনও বড় প্রশ্ন

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: মার্চ ৭, ২০২৬, ১২:০৯ পিএম

ইরান যুদ্ধ কোথায় গিয়ে শেষ হবে তা এখনও বড় প্রশ্ন

ডেইলি খবর ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুনভাবে সাজিয়ে দেয়া এক সপ্তাহের সহিংসতার পর এখন দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু লক্ষ্য হয়তো অর্জনের কাছাকাছি, আবার কিছু লক্ষ্য এখনও অনেকটাই কল্পনাপ্রসূত। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যখন দাবি করেন যে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা থাকা উচিত, তখন তা সম্ভবত এই যুদ্ধের সম্ভাব্য সমাপ্তি সম্পর্কে সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
প্রথম নজরে বিষয়টি প্রায় অবাস্তব, বরং হাস্যকর বলেই মনে হয়। কারণ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় নেতা নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা ৮৮ জন জ্যেষ্ঠ আলেম এমন এক রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন, যার জন্মই হয়েছে আমেরিকান প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মাধ্যমে। তারা হোয়াইট হাউসের নির্দেশ মেনে চলবে, এমন ধারণা অনেকের কাছেই অযৌক্তিক।
তবে ট্রাম্পের এই দাবি এবং নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে উত্তরসূরি হিসেবে না চাওয়ার মন্তব্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রকাশ করে। প্রথমত, ট্রাম্প মনে করেন ভেনেজুয়েলার মডেল এখানে কাজ করতে পারে। অর্থাৎ সামরিক চাপের মাধ্যমে কোনো সরকারকে বদলে যেতে বাধ্য করা, সরাসরি সরকার বদলানো নয়।
কিন্তু ইরান একটি কঠোর, আক্রমণাত্মক এবং ভারী অস্ত্রে সজ্জিত স্বৈরশাসিত রাষ্ট্র, যা গত এক সপ্তাহ ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগেই দেশটি নিজেদের বহু সংখ্যক নাগরিককে হত্যা করেছে। সুতরাং ক্ষমতাচ্যুত ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর তেলনির্ভর দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনব্যবস্থার মতো সহজ কোনো বাস্তবতা এখানে নেই। তবুও ট্রাম্পের এই আকাক্সক্ষা দেখায় যে, তাদের যুদ্ধ কোন দিকে যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, এই মন্তব্য রাজনৈতিক সমঝোতার ইঙ্গিতও দেয়। ইরানের তুলনামূলক মধ্যপন্থী প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান শুক্রবার সকালে মধ্যস্থতার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাতার এবং ফ্রান্সের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আবার দোহায় আঘাত হানে, যা অন্তত এটুকু বোঝায় যে তেহরানের ভেতরে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেন, ইরান আলোচনা করতে চায়, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তাদের চেয়েও বেশি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়। শুক্রবার তিনি ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করেন- যা ইঙ্গিত দেয় যে ট্রাম্প হয়তো সামরিকভাবে তেহরানের পতন ঘটানোর বদলে কোনো রাজনৈতিক সমাধান খুঁজছেন। ইরানে নতুন কোনো নেতা ক্ষমতায় এলে একটি নতুন চুক্তির সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতাই এখনও সবচেয়ে সম্ভাব্য পথ বলে মনে হচ্ছে।
ট্রাম্পের উচ্চকণ্ঠ আত্মবিশ্বাস, যা তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আরও জোরালোভাবে তুলে ধরছেন সম্ভবত তা কূটনৈতিক দরকষাকষিতে সর্বোচ্চ চাপ তৈরি করার কৌশল। বৃহস্পতিবার ট্রাম্প আবারও ইরানে জনবিদ্রোহের সম্ভাবনার কথা বলেন। তবে এটি এখনও যুক্তরাষ্ট্রের সুস্পষ্ট সামরিক লক্ষ্যগুলোর অংশ হয়ে ওঠেনি, যদিও মার্কিন সামরিক কমান্ড সেন্টকম প্রতিদিনই কিছু লক্ষ্য অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
বৃহস্পতিবারের এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানায়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে এবং ৩০টির বেশি ইরানি নৌযান ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে। এতে বোঝা যায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত দুটি সামরিক লক্ষ্য প্রায় পূরণ হতে চলেছে। এদিকে খামেনির মৃত্যুর পর এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও তার উত্তরসূরি ঘোষণা না হওয়া এখন বেশ চোখে পড়ার মতো বিষয় হয়ে উঠেছে। তার মৃত্যুর আগেই উত্তরাধিকার পরিকল্পনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ছিল। কিন্তু অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং নতুন নেতা কতদিন টিকে থাকবেন, কারণ ইসরাইল তাকে হত্যা করার হুমকি দিয়েছে, এই ভয় ঘোষণাকে বিলম্বিত করে থাকতে পারে। নেতৃত্বের এই শূন্যতাই সম্ভবত যুদ্ধের প্রথম অপ্রত্যাশিত ফলাফল।
যুদ্ধ শুরু করার সময় যুক্তরাষ্ট্র হয়তো কে ক্ষমতায় আছে তা না জেনেও চলতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ কতদিন চলবে সেটি ভাবার সময় এই অনিশ্চয়তা সমস্যায় ফেলতে পারে। এক সপ্তাহ পর দেখা যাচ্ছে, এই শূন্যতা একই সঙ্গে বিশৃঙ্খলা এবং সুযোগ তৈরি করছে। ইরান এখনও শক্তি প্রদর্শন করার চেষ্টা করছে। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা আগের তুলনায় কম কার্যকর এবং কম ঘনঘন হলেও তারা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এটি দেখানোর জন্য যে তারা পরাজিত হয়নি।
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেন, সামরিক অভিযান নির্ধারিত সময়ের আগেই এগোচ্ছে এবং এমন একজন নতুন সর্বোচ্চ নেতা দরকার যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যথেষ্ট সামঞ্জস্যপূর্ণ হবেন, যাতে দশ বছর পর আবার হামলা করতে না হয়। এটি এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি যা ট্রাম্পের চুক্তি করার প্রবণতা এবং দ্রুত ও অপ্রত্যাশিত সামরিক পদক্ষেপের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কিন্তু এত বড় আকারের যুদ্ধে পরিকল্পনা ও উচ্চাকাক্সক্ষা দ্রুত ভেঙে পড়তে পারে। ইতিমধ্যেই দুটি বড় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। প্রথমত, ইসরাইল লেবাননের দুর্বল হয়ে পড়া সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে অভিযান চালাচ্ছে। অভিযানের ঘোষণা দেয়ার মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ব্যাপক এলাকা খালি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইসরাইল তাদের দীর্ঘদিনের শত্রুকে ‘নিরস্ত্র’ করতে চায়। কিন্তু এটি হয়তো কয়েক মাসের স্থলযুদ্ধে রূপ নিতে পারে, অথবা আগের বছরের মতো প্রতিদিন বিমান হামলার মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার অবস্থায় ফিরে যেতে পারে।
ইসরায়েলের উত্তরের এই অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক কৌশলের অংশ ছিল বলে মনে হয় না। তাই এটিকে আলাদা সংঘাত হিসেবে দেখা উচিত হলেও এটি একটি প্রতিদ্বন্দ্বী গতিশীলতা তৈরি করছে। ফলে ইসরাইল আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতিতে কম আগ্রহী হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যা পুরো প্রথম সপ্তাহ জুড়েই অব্যাহত ছিল। এতে বোঝা যায় ইরানের সামরিক কঠোরপন্থীরা চাইছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররাই আগে পিছিয়ে যাক। ইরানের জন্য এটি অস্তিত্বের লড়াই। প্রকাশ্য দুর্বলতা দেখানো মানে হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বোমাবর্ষণে তৈরি বাস্তব দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়া। ইরানে যদি কোনো শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য নেতা না থাকে, যিনি ড্রোন বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন, তাহলে এই হামলাগুলো, যদিও প্রায়ই প্রতিহত করা হচ্ছে, তা যেকোনো কূটনৈতিক সমাধানের পথ বন্ধ করে দিতে পারে।
ইরানের ড্রোন একসময় ফুরিয়ে যেতে পারে। কিন্তু তাদের কাছে অন্য অসম যুদ্ধের কৌশলও রয়েছে- যেমন হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়া বা বিদেশে সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা করা। এসব পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রকে বিরক্ত করতে পারে এবং শান্তি প্রক্রিয়া ব্যাহত করতে পারে। এই অভিযান যেভাবে দ্রুত এগোচ্ছে, তা যুদ্ধের প্রচলিত সময়সীমা ও ধারণাকে ভেঙে দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর লক্ষ্য তালিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত উন্নত বিমান শক্তি এক সপ্তাহে এমন সাফল্য এনে দিয়েছে, যা ২৩ বছর আগে অর্জন করতে মাসের পর মাস লাগতে পারত।
তবুও বিশৃঙ্খলার নিয়ম একই থাকে।
২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের কয়েক সপ্তাহ আগে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ড বলেছিলেন, যুদ্ধ ছয় দিন, ছয় সপ্তাহ চলতে পারে। ছয় মাস লাগবে বলে মনে হয় না।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দফার দখল অভিযান শুরু হয়েছিল এই বিশ্বাস নিয়ে যে ইরাকের জনগণ বিদ্রোহ করে তাদের শাসকদের প্রত্যাখ্যান করবে। বাস্তবে ইরাকের বড় অংশই মার্কিন স্থলসেনাদের তাড়াতে বিদ্রোহ করে এবং যুদ্ধ আট বছর ধরে চলে। বর্তমান যুদ্ধটি ভিন্ন সময়ে ঘটছে। এমন এক যুগে যখন নৈতিক অবস্থান দখল করার প্রতিযোগিতা আগের মতো তীব্র নয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও গেমের মতো যুদ্ধের উল্লাস বাস্তব যুদ্ধের বিভীষিকাকে আড়াল করে দেয়। এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অর্থনৈতিক অস্থিরতা ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে-এটা প্রায় নিশ্চিত।
এ সপ্তাহে সংঘাত ও ধ্বংসের গতি নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। কিন্তু সপ্তাহ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো এক বাস্তবতা আবার সামনে এসেছে- কূটনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তা। (অনলাইন সিএনএন থেকে অনুবাদ)। সংগৃহীত ছবি
 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!