বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩

গাজার শিশুদের ঘুড়িকেও ভয় পাচ্ছে ইসরাইল, কেড়ে নিচ্ছে ওড়ানোর স্বাধীনতা

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ২৬, ২০২৬, ০২:৪৫ পিএম

গাজার শিশুদের ঘুড়িকেও ভয় পাচ্ছে ইসরাইল, কেড়ে নিচ্ছে ওড়ানোর স্বাধীনতা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: গাজায় যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যে শৈশবের স্বাভাবিক আনন্দগুলোও ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে শিশুদের ঘুড়ি ওড়ানো। সীমান্তবর্তী ইসরায়েলি এলাকায় গাজা থেকে কয়েকটি ঘুড়ি উড়ে যাওয়ার পর বিষয়টি নিয়েও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইসরায়েল।
আগস্ট ২০২৬-এ গাজা থেকে সীমান্তবর্তী ইসরায়েলি সম্প্রদায়ের দিকে কয়েকটি ঘুড়ি উড়ে যায়। পরে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, উদ্ধার করা ঘুড়িগুলোতে কোনো সন্দেহজনক বস্তু পাওয়া যায়নি এবং সেগুলো কোনো হুমকিও তৈরি করেনি। এরপরও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ঘোষণা দেন, বেলুনকে ঘুড়ি এবং ঘুড়িকে ড্রোন হিসেবে বিবেচনা করা হবে—সেগুলোতে বিস্ফোরক থাকুক বা না থাকুক। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও কাটজ হুঁশিয়ারি দেন, ঘুড়ি ওড়ানোর সঙ্গে জড়িতদের লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে এবং সম্ভাব্য উৎক্ষেপণস্থল হিসেবে চিহ্নিত এলাকার বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হতে পারে।

পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ আগস্ট গাজার বিভিন্ন ফিলিস্তিনি কমিটি অভিভাবকদের সন্তানদের ঘুড়ি ওড়াতে নিষেধ করার আহ্বান জানায়। ঘুড়ি নিজে বিপজ্জনক বলে নয়, বরং ঘুড়ির সুতো ধরে থাকা শিশুটিই হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই এ সতর্কতা।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এক মা জানান, তার ১০ বছর বয়সী ছেলে প্রতি গ্রীষ্মে ঘুড়ি ওড়াত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি আর সন্তানকে ঘুড়ি ওড়াতে দিতে চান না।

গাজায় ঘুড়ি নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগের পেছনে অবশ্য একটি পুরোনো ঘটনাপ্রবাহ রয়েছে। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ‘গ্রেট মার্চ অব রিটার্ন’ আন্দোলনের সময় কিছু ফিলিস্তিনি অগ্নিসংযোগকারী ঘুড়ি ও বেলুন ব্যবহার করেছিলেন। এসবের কারণে ইসরায়েলের কৃষিজমিতে আগুন লাগার ঘটনাও ঘটে। ফিলিস্তিনি আন্দোলনকারীরা এগুলোকে প্রতিরোধের একটি পদ্ধতি হিসেবে দেখলেও ইসরায়েল এগুলোকে সন্ত্রাসবাদ ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।

তবে বর্তমানে যে ঘুড়িগুলো নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেগুলোতে কোনো দাহ্য বা বিস্ফোরক উপাদান ছিল না বলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীই জানিয়েছে। ফলে সমালোচকদের প্রশ্ন, একটি সাধারণ শিশুর ঘুড়িকেও যদি সশস্ত্র ড্রোনের সমতুল্য বিবেচনা করা হয়, তাহলে ‘নিরাপত্তা হুমকি’র সংজ্ঞা কোথায় গিয়ে থামবে?

ফিলিস্তিনি জীবনের সর্বত্রই নিরাপত্তার ছায়া
বিশ্লেষণধর্মী এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনিদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রই ক্রমে নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচিত হচ্ছে। চেকপোস্টে দাঁড়ানো এক তরুণ, সামরিক অভিযানের সময় আটক হওয়া শিশু কিংবা বসতির কাছাকাছি জমিতে কাজ করা কৃষক—প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় পড়ছেন।

পশ্চিম তীরেও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কার্যালয় ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা, প্রাণহানি, সম্পত্তি ধ্বংস এবং ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করেছিল। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তরের (ঙঈঐঅ) তথ্যেও বাড়িঘরে হামলা, কৃষিজমিতে বিধিনিষেধ, গবাদিপশু ও জলপাইগাছের ক্ষতি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও বাস্তুচ্যুতির বিভিন্ন ঘটনা উঠে এসেছে।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতও ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেওয়া এক পরামর্শমূলক মতামতে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অব্যাহত উপস্থিতিকে অবৈধ বলে উল্লেখ করে। আদালত ইসরায়েলের বসতি স্থাপন নীতি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে।

‘নিরাপত্তা’র সংজ্ঞা কার জন্য?
ইসরায়েলি সামরিক কর্মকাণ্ডের প্রভাব শুধু ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। লেবানন ও সিরিয়াতেও বিভিন্ন সময়ে ইসরায়েলি হামলা হয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যেখানে সীমান্তও প্রতিবেশী জনগোষ্ঠীকে সামরিক কর্মকাণ্ডের প্রভাব থেকে পুরোপুরি নিরাপদ রাখতে পারছে না।

প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এসব কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যায় বারবার ‘নিরাপত্তা’ শব্দটি সামনে আসে। কিন্তু বোমা হামলা, দখলদারত্ব, বাস্তুচ্যুতি কিংবা ভূখণ্ড হারানোর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাঁরা জীবন কাটাচ্ছেন, তাঁদের কাছে নিরাপত্তার অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।

আর এই জায়গাতেই একটি সাধারণ ঘুড়ি হয়ে উঠেছে প্রতীকী। প্লাস্টিকের ব্যাগ দিয়ে তৈরি ঘুড়িটি অত্যন্ত দুর্বল; তার উদ্দেশ্য দখল করা নয়, আকাশে ওড়া। ধ্বংসস্তূপ ও বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবুর মধ্যে বসবাস করা একটি শিশুর কাছে ঘুড়ি ওড়ানো হয়তো স্বাধীনতার অনুভূতি পাওয়ার সামান্য একটি সুযোগ। শিশুটির শরীর যেখানে আটকে আছে, তার ঘুড়িটি সেখানে মুক্তভাবে উড়তে পারে।

তাই গাজায় ঘুড়ি নিয়ে তৈরি হওয়া আতঙ্ক শুধু একটি খেলনা নিয়ে নিরাপত্তা বিতর্ক নয়। এটি এমন এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে সংঘাতের কারণে একটি শিশুর স্বাভাবিক শৈশবও ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।
একজন মায়ের আশঙ্কা যেন পুরো পরিস্থিতিটিকে এক বাক্যে তুলে ধরে—‘ঘুড়ি ওড়াবে না, তারা দেখে ফেলতে পারে।’

এই আশঙ্কাই প্রশ্ন তুলছে—যখন একটি শিশুর ঘুড়িও আকাশে ওড়ার জন্য নিরাপদ নয়, তখন সেই শিশুর জন্য শৈশবের কতটুকু জায়গা অবশিষ্ট থাকে? ছ্ি-সংগৃহীত,সূত্র: মিডলইস্ট মনিটর

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!