বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই, ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ঝুঁকি, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমাল আইএমএফ

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ৯, ২০২৬, ০৮:৪২ এএম

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ঝুঁকি, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমাল আইএমএফ

ডেইলি খবর ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে আবারও যুদ্ধ শুরু হওয়ায় অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর ‘অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির’ কথা উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আবারও কমিয়েছে।

বুধবার (৮ জুলাই) আইএমএফ জানিয়েছে, এ বছর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩.০ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা গত এপ্রিলের পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল ৩.১ শতাংশ। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।

সংস্থাটির ‍‍`ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক‍‍` (বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি) আপডেটে এই প্রাক্কলনটি করা হয়েছিল সাম্প্রতিক ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার ঠিক আগে।

আইএমএফ-এর গবেষণা বিভাগের উপ-পরিচালক পেত্যা কোয়েভা ব্রুকস সাংবাদিকদের বলেন, ‘গত রাতের ঘটনাবলি অর্থনৈতিক পরিস্থিতির চারপাশের অনিশ্চয়তা এবং ঝুঁকিগুলোকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে যাচ্ছি।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের যুদ্ধবিরতি শেষ বলে ঘোষণা করার পর এবং রাতে মার্কিন বাহিনী ইরানে তীব্র আঘাত হানবে বলে জানানোর পর বুধবার পেত্যা কোয়েভা ব্রুকস এই মন্তব্য করেন।

এ বছর এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো সংস্থাটি তাদের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমাল। এই প্রবৃদ্ধির হার ২০২৫ সালের তুলনায় অর্থনৈতিক মন্দা বা ধীরগতিরই ইঙ্গিত দেয়।

চলতি বছর বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে ৪.৭ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা আগের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি।

কোয়েভা ব্রুকস আশা করছেন যে, যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে প্রায় নয় মাস (তিন প্রান্তিক) সময় লাগবে। তবে যেসব ধাক্কার কারণে তেলের দাম এবং মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়ে, তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও বড় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিবাচক প্রভাব

আপাতত প্রবৃদ্ধির সামগ্রিক পূর্বাভাস কিছুটা কমানো হলেও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের জোরালো চাহিদা এবং গতিশীলতা যুদ্ধের ক্ষতিকর প্রভাবকে আংশিকভাবে পুষিয়ে দিচ্ছে।

আইএমএফ আশা করছে যে, ২০২৭ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে ৩.৪ শতাংশে পৌঁছাবে।

আইএমএফ-এর গবেষণা বিভাগের প্রধান ডেনিজ ইগান এই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়াটিকে ‘ভি-শেপড রিকভারি’ বা দ্রুত পতনের পর সমগতিতে দ্রুত উত্থান হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ডেনিজ ইগান এএফপি-কে বলেন, ইরানের যুদ্ধের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে দেরি হওয়া, দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা এবং অতিরিক্ত খরচের কারণে এ বছর বিশ্ব অর্থনীতি আরও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে।

তবে এই ক্ষতির প্রভাব সব দেশে সমান নয়, দেশভেদে এটি ভিন্ন।

সংস্থাটি জানায়, যুদ্ধ অঞ্চলের বাইরের জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলো বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ থেকে লাভবান হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রযুক্তি-চালিত অগ্রগতির সাথে যুক্ত অর্থনীতিগুলো জ্বালানি আমদানিকারক হওয়া সত্ত্বেও শক্তিশালী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বজায় রাখছে।

সংস্থাটি আরও যোগ করে, এর বিপরীতে, প্রযুক্তি খাতের সাথে যুক্ত নয় এমন জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর অর্থনৈতিক গতিশীলতা দুর্বল হয়ে পড়ছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরানকে লক্ষ্য করে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা তেহরানকে পাল্টা জবাব দিতে বাধ্য করে। এর ফলে তারা মূলত হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে ফেলে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।

এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যায়, যা বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে বড় চাপ সৃষ্টি করে। পরে সাময়িক মার্কিন-ইরান চুক্তির মাধ্যমে শত্রুতা স্থগিত হলে তেল ও গ্যাস সরবরাহ পুনরায় শুরু হয়েছিল, কিন্তু এখন আবার যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।

‍‍`চোখে পড়ার মতো বৈষম্য‍‍`

বিশ্ব অর্থনীতি যুদ্ধের ধাক্কা ধারণার চেয়ে ভালোভাবে সামাল দিতে পারলেও আইএমএফ সতর্ক করে বলেছে, সামগ্রিক বৈশ্বিক চিত্রটি দেশগুলোর মধ্যকার চোখে পড়ার মতো বৈষম্যকে আড়াল করে দেয়।

যুদ্ধ শুরুর পর উদীয়মান এশিয়ার দেশগুলোতে খুচরা পেট্রোলের দাম ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে লাতিন আমেরিকায় বেড়েছে মাত্র ১৫ শতাংশ।

চলতি বছর মার্কিন অর্থনীতি ২.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও, মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১.২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে মাত্র ০.৭ শতাংশ করা হয়েছে।

ইউরো অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও সংশোধন করে এ বছর ০.৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ফ্রান্সের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ০.৬ শতাংশ—যা আগের পূর্বাভাসের চেয়ে ০.৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কম।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অবশ্য সামান্য ইতিবাচক সংশোধনীর মাধ্যমে ৪.৬ শতাংশ করা হয়েছে।

এসব সত্ত্বেও আইএমএফ সতর্ক করেছে যে, যুদ্ধের পূর্ণ প্রভাব এখনো পুরোপুরি কেটে যায়নি।

জ্বালানি সরবরাহ কমে যাওয়ার এই সংকটে জরুরি বা কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড় করায় সাময়িক স্বস্তি মিলেছে, তবে সামনে আবারও মন্দাভাব দেখা দিতে পারে। বাণিজ্যের এই বিভাজন বা খণ্ডন আরও ত্বরান্বিত হতে পারে, যার ফলে পণ্যের দাম আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তা সত্ত্বেও কিছু আশার আলো রয়েছে বলে আইএমএফ জানিয়েছে।

বিশ্বের প্রযুক্তি সরবরাহ চেইনের সাথে যুক্ত প্রধান কিছু অর্থনীতি যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অচলাবস্থার মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও ইতিবাচক চমক দেখিয়েছে। এআই-সম্পর্কিত হার্ডওয়্যার রপ্তানিকারক শীর্ষ চার দেশ তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড এবং মালয়েশিয়া স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে।

ডেনিজ ইগান আরও বলেন, এ বছর উচ্চ মূল্যস্ফীতির যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা কেবল সাময়িক স্থবিরতা মাত্র, মূল্যস্ফীতি হ্রাসের মূল ধারাটি এতে পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।ফাইল ছবি

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!