সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

জাতিসংঘ তদন্ত দলের অভিযোগ: পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ‘নির্মূল অভিযান’ চালাচ্ছে ইসরায়েল

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ০৮:০৯ পিএম

জাতিসংঘ তদন্ত দলের অভিযোগ: পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ‘নির্মূল অভিযান’ চালাচ্ছে ইসরায়েল

ডেইলি খবর ডেস্ক: জাতিসংঘ-মনোনীত তদন্তকারীরা সোমবার (২৬ অক্টোবর) জানিয়েছেন, ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ‘গণহত্যা’ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে ‘গণনির্মূল’ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।

জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন জানিয়েছে, ১৯৬৭ সাল থেকে ইসরায়েলের দখলে থাকা পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনী অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধের পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধও চালিয়ে যাচ্ছে।

কমিশনটি সরাসরি জাতিসংঘের প্রতিনিধি হিসেবে কথা না বললেও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে একটি প্রতিবেদনে তারা জানিয়েছিল যে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের প্রাণঘাতী হামলার পর গাজা যুদ্ধে ইসরায়েল ‘গণহত্যা’ চালিয়েছে। তবে ইসরায়েল সরাসেিরএ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনের ঠিক আগের দিন প্রকাশিত নতুন এই প্রতিবেদনে তদন্ত দল জানায়, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের চাপিয়ে দেওয়া সংঘাতের পাশাপাশি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে এক ‘ব্যাপক ও সুপরিকল্পিত’ হামলা চালিয়ে যাচ্ছে

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও সামরিক বাহিনী পশ্চিম তীরে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে নিধনযজ্ঞ, নির্যাতন, ধর্ষণ ও বিভিন্ন ধরনের যৌন সহিংসতার পাশাপাশি জাতীয়তা, বর্ণ ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে চরম বৈষম্যমূলক নিপীড়ন চালাচ্ছে।

তবে, জেনেভায় অবস্থিত ইসরায়েলের মিশন জানিয়েছে, এই প্রতিবেদনটি মূলত ইসরায়েল রাষ্ট্রকে শয়তান হিসেবে চিত্রিত করা এবং এর অস্তিত্বকে অপরাধমূলক হিসেবে তুলে ধরার জন্য তদন্ত কমিশনের চালানো অপপ্রচারের অভিযানের অংশ।

এক বিবৃতিতে তারা বলে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই এই বিকৃতি প্রত্যাখ্যান করতে হবে, কমিশনের ফলাফলগুলো নামঞ্জুর করতে হবে এবং এর অবিলম্বে বিলুপ্তি দাবি করতে হবে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ তিন সদস্যের এই স্বাধীন তদন্ত দলটি ২০২১ সালে গঠন করেছিল।

দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের সাবেক বিচারক নাভি পিল্লাই ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এই তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি চলতি মাসের শুরুর দিকে নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করেন।

কমিশনের নতুন প্রতিবেদনটি ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি উভয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে প্রাণহানি এবং শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির ওপর আলোকপাত করেছে।

এতে বলা হয়, সেই মাসে গাজা থেকে ফিলিস্তিনি ইসলামপন্থি গোষ্ঠী হামাসের হামলার পর থেকে পশ্চিম তীরের পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক অবনতি ঘটেছে।

বসবাসের ‍‍`অযোগ্য‍‍` পরিবেশ সৃষ্টি

তদন্তকালে কমিশন দেখতে পেয়েছে যে, হামাসের হামলার কারণে পশ্চিম তীরের সাধারণ মানুষকে সামষ্টিকভাবে শাস্তি দেওয়ার ইচ্ছা ছিল ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিম তীরের বিভিন্ন স্থানে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর বিষয়টি তাদের উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় ও সুসংগঠিত পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয় এবং এটি রাষ্ট্রীয় নীতিরই প্রতিফলন।

এতে আরও বলা হয়, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের আচরণ এটিই নির্দেশ করে যে পশ্চিম তীরে তাদের এই ব্যাপক ও সুপরিকল্পিত হামলার অংশ হিসেবে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা সম্পর্কে তারা জানত এবং তারা তাকে প্ররোচিত করেছে।

কমিশনের চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন মুরলীধর বলেন, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা ও আহত করা এবং ঘরবাড়ি ধ্বংস করার সাথে ইসরায়েলের ক্রমাগত দায় অস্বীকার করা মূলত ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ও নির্মূল করা এবং জীবনযাত্রাকে অযোগ্য করে তোলার এক বৃহত্তর কৌশলের অংশ।

এক বিবৃতিতে ভারতীয় এই বিচারক বলেন, ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয় মর্যাদাকে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে সমতুল্য করার চেষ্টা ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার বাস্তবায়নের যেকোনো কার্যকর প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে।

প্রতিবেদনে এমন কিছু ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে কমিশন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, ইসরায়েলি বাহিনী ইচ্ছাকৃত হত্যাসহ যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়া কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বেসামরিক নাগরিকদের মারাত্মক ক্ষতি করা এবং হত্যা করার উদ্দেশ্য নিয়ে রেখেছিল।

গণহত্যার বিষয়ে তথ্যপ্রমাণ

সরকারি ইসরায়েলি পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি বার্তা সংস্থা এএফপি-র হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলায় ১,২২১ জন নিহত হয়।

এর জবাবে পরিচালিত ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে গাজার প্রায় সমগ্র জনসংখ্যা বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী ৭৪ হাজার ২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।  মন্ত্রণালয়টি হামাসের অধীনে হলেও তাদের দেওয়া পরিসংখ্যানকে জাতিসংঘ নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই প্রতিবেদনের জন্য তদন্ত করা ঘটনাগুলো দেখায় যে, গাজায় ফিলিস্তিনিদের আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও বাহিনী তাদের গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে।

তদন্ত দল ইসরায়েলকে গাজায় গণহত্যা বন্ধ করার এবং গণহত্যা ও গণহত্যার উস্কানি রোধে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ গ্রহণযোগ্যতা ও বৈধতার সংকটে ভুগছে এবং যেসব ফিলিস্তিনি ভিন্ন রাজনৈতিক মত প্রকাশ করেন তাদেরকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে... যার ফলে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোর দ্রুত, কার্যকর ও নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
তবে, প্রতিবেদনটি নিয়ে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। আজ সোমবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এই প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করার কথা রয়েছে।সংগৃহীত ছবি

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!