বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

ট্রাম্পের হারের পর এবার ব্যাকফুটে ইসরায়েল, স্বস্তিতে ইউক্রেন-ইরান

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: নভেম্বর ৫, ২০২৬, ১১:০৬ এএম

ট্রাম্পের হারের পর এবার ব্যাকফুটে ইসরায়েল, স্বস্তিতে ইউক্রেন-ইরান

ডেইলি খবর ডেস্ক: মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল বড় ধাক্কা খেয়েছে। রিপাবলিকান পার্টিকে হারিয়ে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। এর ফলে বিশ্বরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে যাচ্ছে। বিগত দুই বছর ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে যেসব একতরফা পরিবর্তন এনেছিলেন, এই ফলের পর সেগুলো এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল। বিশেষ করে ইরান, ইসরায়েল এবং ইউক্রেনের মতো প্রধান বিশ্ব রাজনৈতিক ইস্যুতে এর প্রত্যক্ষ ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে যাচ্ছে। খবর সিএনএনের।

ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে ক্ষমতা পাওয়ায় ট্রাম্পের ওপর বড় চাপ তৈরি হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নির্বাহী ক্ষমতার বলে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে তার হাতে এখনও বেশ কিছু স্বাধীন সুযোগ রয়ে গেছে। ফলে পরাজয়ের পর ট্রাম্প কী আন্তর্জাতিক বিষয়ে কিছুটা নমনীয় হয়ে আপসে যাবেন, নাকি আরও বেশি আক্রমণাত্মক রূপ নেবেন— তা নিয়ে চলছে চরম বিশ্লেষণ।

ইরানের উল্লাস এবং নতুন অনিশ্চয়তা : মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দল হেরে যাওয়ায় ইরান কৌশলগতভাবে উল্লাস প্রকাশ করছে। রিপাবলিকান পার্টির হারের অন্যতম প্রধান কারণ যে ইরান যুদ্ধ, তা স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন। তবে এই উল্লাসের মধ্যেও ইরান পরবর্তী দিনগুলোর জন্য সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তারা নতুন বিমান হামলা কিংবা সম্ভাব্য কূটনৈতিক আলোচনার সংকেত— উভয় পরিস্থিতির জন্যই প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুঁশিয়ারি দিয়ে লিখেছেন, মার্কিন সরকার যদি আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টিকারীদের সেবা করতে গিয়ে নিজের দেশের জনগণের রায়কে উপেক্ষা করে, তবে তাদের বড় ধরনের ভুলের মাশুল দিতে হবে। অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন নির্বাচনের ফলাফলে ওয়াশিংটনের মূলনীতি বদলে যাবে বলে যারা ভাবছে তারা চরম ভুল করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন ভোটাররা এই যুদ্ধের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। বর্তমানে কাতারের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা আবার কিছুটা সচল হয়েছে। ভোটের আগে ইরান শর্তসাপেক্ষে দুই দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিল। এখন ট্রাম্প নিজের মুখ বাঁচাতে একটি চুক্তির দিকে যেতে পারেন, অথবা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সামরিক ক্ষমতা প্রদর্শনের চেষ্টা করতে পারেন।

চরম বিপাকে ইসরায়েল :ভোটের দিনই ইসরায়েলে হঠাৎ মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের ট্রাম্পের ঘোষণা একটি বড় ধাক্কা ছিল। এরপর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বিশাল জয়ের খবরটি ইসরায়েলের জন্য চরম সংকট তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এখন উভয় রাজনৈতিক দলেই ইসরায়েলের নীতি ও গাজা যুদ্ধ নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল ওরেন মন্তব্য করেছেন, আমরা একটি যুগের সমাপ্তিতে এসে পৌঁছেছি। তার মতে, মার্কিন সহায়তার সমাপ্তি কেবল শুরু মাত্র। ভবিষ্যতে ইসরায়েলের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বন্ধ হওয়া এবং আয়রন ডোম-এর মতো প্রতিরক্ষামূলক প্রযুক্তির যৌথ উন্নয়নও থমকে যেতে পারে। এমনকি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এত দিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেসব ভেটো ক্ষমতা দিয়ে ইসরায়েলকে রক্ষা করত, সেটিও সংকুচিত হতে পারে।

একই সঙ্গে জেরুজালেম পোস্টের সাবেক সম্পাদক ইয়াকোভ কাটজ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, অস্ত্র বিক্রি বন্ধ হওয়া, নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়া এবং যৌথ অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাতিলের মতো বিষয়গুলো এখন ইসরায়েলের সামনে বড় হুমকি। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ব্যাপক কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। নির্বাচনের আগে তিনি নিজের পার্লামেন্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন এবং তার জায়গায় সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বে নতুন বিরোধী সমীকরণ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

ইউক্রেনের স্বস্তি ও পুতিনের চাল : কিয়েভে এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে কিছুটা স্বস্তির বাতাস বইছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রেসিডেন্ট ভোলোদিমির জেলেনস্কির ওপর ট্রাম্প যে চাপ সৃষ্টি করে আসছিলেন, তাতে জেলেনস্কির অবস্থান বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ট্রাম্প একদিকে জেলেনস্কির পদত্যাগের দাবি করছিলেন। অন্যদিকে রাশিয়ার সুবিধা হয় এমন কূটনৈতিক চাপের পথ বেছে নিয়েছিলেন।

নির্বাচনের ফলাফলের পর ইউক্রেন প্রকাশ্যে খুব বেশি আনুষ্ঠানিক মন্তব্য না করলেও ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা ওয়াশিংটনে ক্ষমতার যেকোনো পরিবর্তন সত্ত্বেও মার্কিন কংগ্রেসের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক রক্ষা করে যাবেন। পেট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পেতে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রাখবেন। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্ষমতা কিছুটা কমে যাওয়ায় ইউক্রেনের জন্য মার্কিন নীতি ইতিবাচক মোড় নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে ইউক্রেনের জন্য একটি বড় আশঙ্কার জায়গা হচ্ছে সময়সীমা। ট্রাম্পের ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে এসে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ট্রাম্পের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আগামী এক বছরের মধ্যে ইউক্রেনে সর্বোচ্চ সামরিক চাপ প্রয়োগ করে যুদ্ধক্ষেত্রে বড় জয় ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!