আন্তর্জাতিক ডেস্ক: নয়াদিল্লিতে ব্যাপক ধরপাকড়ের পরও তারা যে দমে যায়নি, তা স্পষ্ট করে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং একাধিক ছাত্রসংগঠন ঘোষণা করেছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত অথবা তাকে অপসারণ না করা পর্যন্ত প্রতিদিনই তারা দিল্লির যন্তর মন্তরে জমায়েত হবে। ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সঙ্গে জ্ঞানেশ কুমারের ‘ভোট চুরি’ ও ‘যোগসাজশের’ অভিযোগকে কেন্দ্র করে তারা এই কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। খবর এনডিটিভির।
ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে আটক থাকা অবস্থায় সংগঠনটির প্রতিনিধিরা আজ শনিবার (১০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় এই ঘোষণা দেন। আজ রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত প্রতিবাদস্থলে জড়ো হওয়ার আহ্বানের পর দিল্লিজুড়ে পুলিশের দমন-পীড়নে দলটির শীর্ষ বেশ কয়েকজন নেতাসহ আরও শত শত মানুষ আটক হন।
আটক নিরীহ প্রতিবাদকারীদের ওপর ‘নির্মম নির্যাতন’ চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করে সংগঠনটি। তারা জানায়, সকাল প্রায় ১১টার দিকে দীপকের প্লেন দিল্লিতে অবতরণের পরপরই পুলিশ তাকে আটক করে নিয়ে যায়। এরপর দীপকে ও অন্যদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা তারা জানে না।
তারা আরও অভিযোগ করে, দীপকের সঙ্গে ‘অমানবিক’ আচরণ করা হচ্ছে এবং মহারাষ্ট্রের নিজ শহরে সেদিনই মারা যাওয়া তার দাদির শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার অনুমতিও তাকে দেওয়া হচ্ছে না।
দীপকের অনুপস্থিতিতে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব পাওয়া ককরোচ জনতা পার্টির নেতা আজিনকা সিন্দে ঘোষণা করেন, ‘এখন থেকে প্রতিদিন যন্তর মন্তরের উদ্দেশে মিছিল হবে, যত দিন না জ্ঞানেশ কুমারকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়।’
ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের (এসএফআই) সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘এই স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, “রোববার থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছাত্রবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়বে। শিক্ষার্থীরা সর্বত্র শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানাবে। আর পুলিশ যেখানে ব্যারিকেড দিয়ে তাদের আটকে দেবে, সেই জায়গাটিই ‘যন্তর মন্তর’ হয়ে উঠবে।”
ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট ‘ইন্ডিয়া’ও আগামী সোমবার বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী জানান, ওই দিন জোটের নেতারা সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এবং তার কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেবেন।
গতকাল শুক্রবার এই জোট ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে চার দফা দাবিসংবলিত একটি স্মারকলিপি জমা দেয়। দাবিগুলো হলো :
১) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ২০২৩ সালের সেই আইন বাতিল করা, যে আইনের মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে আজীবন আইনি দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
২) ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) অবিলম্বে স্থগিত করা এবং ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া ১৩ কোটি ৩০ লাখ ভোটারের নাম পুনর্বহাল করা।
৩) সব নির্বাচনে কাগজের ব্যালট পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া।
৪) গত দুই বছরে অনুষ্ঠিত সব বিধানসভা নির্বাচন বাতিল করা, বিশেষ করে যেসব নির্বাচনে ‘ভোট চুরি’র অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
শনিবার দিল্লিজুড়ে ১ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি মানুষকে আটক করা হয়। পুলিশ জানায়, বিক্ষোভের অনুমতি না থাকায় যন্তর মন্তরে জড়ো হওয়ার লক্ষ্যে ককরোচ জনতা পার্টির আহ্বান প্রতিহত করতে তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে চারজন সাবেক মুখ্যমন্ত্রীও রয়েছেন। তারা হলেন আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরিওয়াল, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বামপন্থী নেতা পিনারাই বিজয়ন ও মানিক সরকার।
এদিকে অভিজিৎ দীপকেকে ককরোচ জনতা পার্টির নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসের সঙ্গে আটক করা হয়। তিনি আটক থাকা অবস্থায় মহারাষ্ট্রের নিজ শহরে তার দাদির মৃত্যু হয়। পুলিশ জানায়, তাকে শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার জন্য চলে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল। তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাকে মুক্তি দেওয়া হবে কি না, তা স্পষ্ট ছিল না।
ককরোচ জনতা পাটির সমাবেশকে ঘিরে দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনীর অন্তত ২৫ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়। দিল্লি মেট্রোর ৪৫টি স্টেশনের প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দেওয়া হয়, ২৫০টিরও বেশি ট্রেন বাতিল করা হয় এবং জন্তর মন্তরের চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিত করা হয়।
পুলিশ সূত্র জানায়, নারী ও প্রবীণ নাগরিকদের প্রথমে মুক্তি দেওয়া হচ্ছিল। তবে রোববারও নিরাপত্তা বাহিনীর মোতায়েন অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগমূলক একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বর্তমানে চেন্নাইয়ে থাকা রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন: ‘সব নেতাকে গ্রেপ্তার করো। সব তরুণকে গ্রেপ্তার করো। আমাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করো। আমরা তোমাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলছি, আর আমরা পিছু হটব না...ভারতের তরুণেরা, আমি তোমাদের নিয়ে গর্বিত। প্রতিবাদ চালিয়ে যাও।’
আটক হওয়ার আগে কেজরিওয়াল বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘মোদিজি যেখানে তোমাদের বাধা দেবেন, সেখানেই বসে পড়বে। সেই জায়গাটিকেই জন্তর মন্তরে পরিণত করবে।’
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, পরিস্থিতি জরুরি অবস্থাকেও ছাড়িয়ে গেছে; এটি এখন এক ‘সুপার ইমার্জেন্সি’তে পরিণত হয়েছে।
তবে, বিজেপির মুখপাত্র রবিশঙ্কর প্রসাদ জ্ঞানেশ কুমার ও বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার (এসআইআর) পক্ষে অবস্থান নেন। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘প্রথমত, বিশৃঙ্খলা উসকে দেওয়ার প্রচেষ্টাকে ভারতের গণতন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, দেশ পরিচালিত হবে রোকসভার মাধ্যমে, রাজপথের মাধ্যমে নয়।’
ওদিকে, মুম্বাইয়ে আগস্ট ক্রান্তি ময়দানে সংহতি জানিয়ে বিক্ষোভ করার সময় প্রায় ২০০ জনকে আটক করে পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধী এবং অভিনেতা ইমরান খান।এ ছাড়াও আহমেদাবাদ ও চেন্নাইসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ এবং বিক্ষোভকারীদের আটকের খবর পাওয়া গেছে।সংগৃহীত ছবি

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :