শনিবার, ০৪ জুলাই, ২০২৬, ২০ আষাঢ় ১৪৩৩

ইরানের শহীদ সর্বোচ্চ নেতা খামেনির জানাজা ও দাফনের ৭ দিনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ৪, ২০২৬, ০৭:৪৬ এএম

ইরানের শহীদ সর্বোচ্চ নেতা খামেনির জানাজা ও দাফনের ৭ দিনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু

ডেইলি খবর ডেস্ক:  যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় শহীদ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষবিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা গতকাল শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে। সাত দিন ধরে এ অনুষ্ঠান চলবে।

রাজধানী তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় জানাজা ও শোক মিছিলের প্রথম দিন ইসলামী বিপ্লবের এই শহীদ নেতা এবং তাঁর সঙ্গীদের প্রতি বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এটি শহীদ নেতার জানাজার প্রথম পর্যায়। গতকাল এ অনুষ্ঠানে লাখো মানুষের ঢল নামে। সব মিলিয়ে প্রায় ৪০টি দেশের দুই কোটির মতো লোকের সমাগম ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সাবেক সর্বোচ্চ নেতা ও নিজের বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা পড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। তবে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী তাঁকে এ বিষয়ে অনুমোদন দেয়নি। আলী খামেনির জানাজা পড়ানোর জন্য মোজতবা খামেনি এখনো কাউকে মনোনীত করেননি বলে জানা গেছে।

প্রায় চার দশক ধরে বিপ্লবকে পথ দেখিয়ে আসা শহীদ নেতাকে জাতি ও বিদেশিরা বিদায় জানানোর মুহূর্তে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান শোক পালনে ঐক্যবদ্ধ।

৮৬ বছর বয়সে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় শাহাদাতবরণ করেন, যা ছিল অঞ্চলটিকে কাঁপিয়ে দেওয়া এক যুদ্ধের সূচনা। গতকাল থেকে সাত দিন ধরে তেহরান থেকে কোম, নাজাফ থেকে মাশহাদ পর্যন্ত এই শোক অনুষ্ঠানে মুসলিমবিশ্ব সংহতি প্রকাশ করবে।

যুদ্ধের ক্ষত বুকে শেষবিদায়ভোরে শহীদ নেতার মরদেহ এবং তাঁর সঙ্গীদের মরদেহ তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় আনা হয় এবং দুই দিনব্যাপী সর্বজনীন বিদায় অনুষ্ঠানের আগে প্রধান প্রার্থনা কক্ষে রাখা হয়।

শ্রদ্ধা নিবেদনকারী প্রথম বিদেশি অতিথিদের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া ও আফগানিস্তানের ধর্মীয় স্কলার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা ছিলেন। শহীদ সর্বোচ্চ নেতাকে সম্মান জানাতে ইরানের স্বীকৃত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিরাও এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

শহীদ নেতার জানাজায় যোগ দিতে রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত, জর্জিয়া, কিউবাসহ প্রায় ৪০টি দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা ইরানে পৌঁছেছেন। বাংলাদেশ থেকে এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম।

শহীদ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষবিদায়ের শোক অনুষ্ঠান মূলত গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত থেকে শুরু হয়। রাতের শোক অনুষ্ঠানটি ইমাম খোমেনি হুসাইনিয়ার পাশেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটি মূলত নেতার শাহাদাতস্থলের ঠিক পাশেই।

শোকাবহ এ অনুষ্ঠানে তাঁর স্মরণে শোকগাথা পাঠকারীরা নানা শোকগাথা পরিবেশন করেছেন এবং ইসলামী বিপ্লবের শহীদ নেতার শোকে নওহা পড়েছেন।

সাম্প্রতিক যুদ্ধে নেতার পরিবার এবং তাঁর কার্যালয়ের কর্মীদের আত্মীয়রা শহীদ নেতাকে বিদায় জানাতে সমবেত হয়েছিল।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তাঁদের শহীদ নেতার বিদায় এবং জাঁকজমকপূর্ণ শেষকৃত্য মিছিলের আগে দেওয়া এক বার্তায় সব ইরানিকে শোক অনুষ্ঠানে বিপুল সংখ্যায় এগিয়ে আসার আহবান জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নেতার নাম, চিন্তাধারা ও উত্তরাধিকার জাতির ঐতিহাসিক স্মৃতিতে চিরকাল থেকে যাবে।

প্রেসিডেন্ট এই শাহাদাতকে একটি গভীর ক্ষতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে বলেছেন, এটি এমন একটি মুহূতর্, যা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ভিত্তিবিশ্বাস, আদর্শ এবং একটি মহান জাতির ইচ্ছাশক্তিকে প্রকাশ করে। তিনি বলেন, ‘বীরোচিত ইরান যখন ইসলাম ও বিপ্লবের একনিষ্ঠ সেবককে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন আমি জাতি-ধর্ম-রাজনৈতিক মতাদর্শ-নির্বিশেষে সবাইকে অংশগ্রহণের আহবান জানাচ্ছি, যা জাতীয় ঐক্য এবং ইসলামী প্রতিষ্ঠানের মহান আদর্শের প্রতি আনুগত্যের এক স্থায়ী চিত্র তুলে ধরবে।’

এই উপস্থিতিকে সন্ত্রাস ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে একটি চূড়ান্ত জবাব হিসেবে উল্লেখ করেন পেজেশকিয়ান। এটিকে বিশ্বের কাছে জাতির ঐক্য ও সংকল্পের একটি সুস্পষ্ট বার্তা হিসেবে বর্ণনা করে তিনি জোরালো কণ্ঠে বলেন, স্বাধীনতা, ধর্মীয় গণতন্ত্র এবং প্রতিরোধের পতাকা, যা নেতা কয়েক দশকের সংগ্রামের মাধ্যমে উঁচুতে তুলে ধরেছিলেন, তা কখনো নামানো যাবে না।

ইরানি কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, এই জানাজা ও শেষবিদায় অনুষ্ঠানে ১৫ থেকে ২০ মিলিয়ন শোকাহত মানুষের সমাগম হবে। শোকাহত মানুষ রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবে, যা আধুনিক ইতিহাসে নজিরবিহীন ভক্তি ও জাতীয় ঐক্যের এক প্রদর্শনী হবে।

আজ শনিবার এবং আগামীকাল রবিবার গ্র্যান্ড মোসাল্লায় মরদেহ শায়িত রাখার পর সোমবার তেহরানের মধ্য দিয়ে শোকযাত্রা বের হবে এবং অনুষ্ঠান চলমান থাকবে। পবিত্র ধর্মীয় নগরী কোমে আরো কিছু আনুষ্ঠানিকতা নির্ধারিত রয়েছে। এরপর ইরাকের বাগদাদ, কারবালা ও নাজাফে শোক অনুষ্ঠান হবে এবং সব শেষে ৯ জুলাই মাশহাদে দাফন সম্পন্ন হবে।

এদিকে ইরানের আইন ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি বলেছেন, ইরান এয়ার ফ্লাইট ৬৫৫ ভূপাতিত হওয়ার বার্ষিকী এবং প্রয়াত নেতার স্মরণ উভয়ই ইরানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতার প্রতিফলন। তিনি এক্সে লিখেছেন, আজকের দিনে ইরানি জাতি তার শহীদ নেতার স্মৃতিকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি ফ্লাইট ৬৫৫-এর শহীদদেরও স্মরণ করছে।

১৯৮৮ সালে পারস্য উপসাগরের আকাশে ইউএসএস ভিনসেন্স কর্তৃক ইরান এয়ার ফ্লাইট ৬৫৫ ভূপাতিত করার বার্ষিকী হিসেবে ইরান ৩ জুলাই পালন করে, যে ঘটনায় ৬৬ জন শিশুসহ বিমানে থাকা ২৯০ জন যাত্রীর সবাই নিহত হয়।

আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানানো এবং পরবর্তী সময়ে যুদ্ধজাহাজটির কমান্ডারকে পদক প্রদান করার জন্য ইরানি কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র সমালোচনা করে আসছেন।

ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কমান্ডার মেজর জেনারেল আহমদ ওয়াহিদি ইসলামী বিপ্লবের শহীদ নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন এবং তাঁর পথ অনুসরণ করার অঙ্গীকার করেছেন।

গতকাল জাতীয় ইরানি টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানি জাতি বিপ্লবের শহীদ নেতার আদর্শ থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হবে না। তিনি বলেন, ‘আমরা তাঁর থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হব না। আমাদের হৃদয়, আত্মা ও চেতনায় তাঁর স্থান রয়েছে। আমাদের সবার জন্য, আমাদের প্রিয় ইরানের জন্য এবং ইসলামী জাতির জন্য তিনি স্থায়ী ও চিরন্তন এবং আমরা তাঁকে কখনো বিদায় জানাব না।’

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের শত্রুদের উদ্দেশে আইআরজিসি কমান্ডার আরো বলেন, ‘যারা এই ভূমির সম্মান দেখতে চায় না, তাদের জানা উচিত যে আমাদের শহীদ ইমামের পবিত্র রক্ত ​​বিশ্বব্যাপী কাফের শক্তির বিরুদ্ধে প্রিয় ইসলামের বিজয়ের পথে আরেকটি মোড় ঘুরিয়ে দেবে এবং তোমাদের দোসররা এমন দিন কখনো দেখবে না, যেদিন এই জাতি আত্মসমর্পণ করবে।’

ইরানের স্পিকারের সঙ্গে হাফিজ উদ্দিনের সাক্ষাৎ, খামেনি হত্যার নিন্দা বাংলাদেশের

নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শহীদ হওয়ার পর বাংলাদেশ প্রথমে শুধু শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছিল। তবে চার মাস পর এবার আনুষ্ঠানিকভাবে ওই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ। ইরানের ইসলামিক কনসালটেটিভ অ্যাসেম্বলির স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফের সঙ্গে বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিন্দা জানান বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

গতকাল তেহরানে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষবিদায়ের রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা উপলক্ষে ইরান সফরে এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং তাঁর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি জাতীয় শোকের এ সময়ে ইরান সরকার ও ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের প্রতি বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের সংহতি প্রকাশ করেন। স্পিকার ইরান ও বাংলাদেশের মধ্যে শতাব্দী প্রাচীন বন্ধুত্ব এবং গভীর সাংস্কৃতিক ও মানুষে মানুষে সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন।

তেহরানে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোট : আলী খামেনির জানাজায় অংশ নিতে রাজধানী তেহরানে গেছেন জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের প্রতিনিধিরা। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপির নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলে আরো রয়েছেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও রাজশাহী মহানগর আমির ড. মো. কেরামত আলী, মো. নুরুল আমীন এমপি, পীরজাদা সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা এমপি, ডা. এস এম খালিদুজ্জামান এবং এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।

খামেনির কফিনে লাল পতাকা : খামেনির কফিনের ওপর দেশটির মাশহাদ শহরের ইমাম রেজা মাজারের লাল পতাকা রাখা হয়েছে। আগামী ৯ জুলাই ওই মাজারেই খামেনিকে দাফন করা হবে। জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির মিডল ইস্ট অ্যান্ড ইসলামিক পলিটিকস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাদের হাশেমি আল জাজিরাকে জানান, এই লাল পতাকা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হুসাইন ইবনে আলীর আত্মত্যাগের প্রতীক। সংগৃহীত ছবি

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!