বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার ও যুদ্ধ শেষ হলে হরমুজ খুলে দেবে ইরান

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ০৮:৪১ এএম

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার ও যুদ্ধ শেষ হলে হরমুজ খুলে দেবে ইরান

ডেইলি খবর ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ওপর থেকে নৌ অবরোধ তুলে নেয় এবং চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটায়, তবে হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করবে ইরান। একইসঙ্গে দেশটি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চলমান আলোচনা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার কথাও জানিয়েছে।
স্থানীয় সময় সোমবার (২৭ এপ্রিল) যুদ্ধে মধ্যস্থতার সঙ্গে যুক্ত দুজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এই প্রস্তাব পৌঁছানো হয়েছে। তাদের দাবি, ইসলামাবাদ-ভিত্তিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে উভয় পক্ষের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগ চলছে।
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রস্তাব গ্রহণ করবেন বলে মনে হচ্ছে না। পাকিস্তানের মাধ্যমে আমেরিকানদের কাছে পৌঁছানো এই প্রস্তাবে সেই মতবিরোধগুলো অমীমাংসিতই থেকে যাচ্ছে, যার জেরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধে জড়িয়েছিল। এছাড়া মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এমন কোনো চুক্তি নাকচ করে দিয়েছেন যেখানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত নেই।
সোমবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রুবিও বলেন, ‘আমরা তাদের পার পেয়ে যেতে দিতে পারি না। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, যেকোনো চুক্তি বা সমঝোতা যেন এমন হয় যা তাদের যেকোনো মূল্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দৌড় থেকে নিশ্চিতভাবে বিরত রাখে।’
একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালি নিয়ে অচলাবস্থায় আটকে আছে। যুদ্ধোত্তর সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হতো। মার্কিন অবরোধের মূল লক্ষ্য হলো ইরানকে তাদের তেল বিক্রি করা থেকে বিরত রাখা, যাতে তারা গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। এর ফলে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে যেখানে তেল সংরক্ষণের জায়গা না থাকায় তেহরানকে উৎপাদন বন্ধ করে দিতে হবে।
অন্যদিকে, প্রণালিটি বন্ধ থাকায় ট্রাম্পের ওপরও চাপ বাড়ছে। গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তেল ও গ্যাসোলিনের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। এটি তার উপসাগরীয় মিত্রদের ওপরও চাপ সৃষ্টি করেছে, যারা তাদের তেল ও গ্যাস রপ্তানির জন্য এই জলপথ ব্যবহার করে।
অবরোধ অবসানের নতুন দাবি-মধ্যপ্রাচ্যের এ সংকটকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশে সার, খাদ্য এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বজুড়ে অনেক দেশের মধ্যে এ নিয়ে হতাশা বাড়ছে। নতুন করে অবরোধ অবসানের দাবি করেছে বিভিন্ন দেশ।
ইরানের প্রস্তাবে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পরবর্তী কোনো তারিখ পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ট্রাম্প বলেছিলেন, তার যুদ্ধে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল তেহরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা ধ্বংস করা।
প্রস্তাবটি সম্পর্কে অবগত দুই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, চলতি সপ্তাহে ইরান ও পাকিস্তানের কর্মকর্তাদের মধ্যে এই রুদ্ধদ্বার আলোচনা হয়েছে। ইরানের এই প্রস্তাবের কথা প্রথম প্রকাশ করে সংবাদ সংস্থা অ্যাক্সিওস।
এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রাশিয়া সফরে রয়েছেন। মস্কো দীর্ঘকাল ধরে তেহরানের প্রধান সমর্থক। রাশিয়া ইরানকে এখন কোনো সাহায্য করবে কি না বা করলে কী ধরনের সাহায্য করবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেলের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। অপরিশোধিত তেলবোঝাই ট্যাঙ্কারগুলো উপসাগরে আটকা পড়ে আছে। কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ কেন্দ্রে পৌঁছানোর কোনো উপায় নেই।
সোমবার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ‘ব্রেন্ট ক্রুড’ (অপরিশোধিত তেল) তেলের বাজারদর ব্যারেল প্রতি ১০৮ ডলারের উপরে গিয়ে ঠেকেছে, যা যুদ্ধ শুরুর সময়কার দামের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।
হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার দাবি-বাহরাইনের নেতৃত্বে একটি যৌথ বিবৃতিতে বেশ কিছু দেশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ খুলে দেওয়ার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সোমবার নিরাপত্তা পরিষদে বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে মানবিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। এই চাপের প্রভাব এখন খালি তেলের ট্যাঙ্কে, খালি তাকে (দোকানের শেলফ) এবং শূন্য থালায় গিয়ে পড়ছে।’
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস কোনো কৌশল ছাড়াই যুদ্ধে নামার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে বলেন, এই ধরনের সংঘাতের সমস্যা সবসময় একই রকম; এটি কেবল যুদ্ধে জড়ানো নিয়ে নয়, আপনাকে এ থেকে বেরোনোর পথও জানতে হবে।’
ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাঁ-নোয়েল বারোট সব পক্ষেরই সমালোচনা করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কোনো স্পষ্ট লক্ষ্য ছাড়াই এবং আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইরানে হামলা করার পর এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার জন্য ইরানকে দায়ী করে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রণালি হলো বিশ্বের ধমনী। এগুলো কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।
রাশিয়ায় পুতিনের সঙ্গে ইরানের শীর্ষ কূটনীতিকের বৈঠক-গত সপ্তাহে ট্রাম্প ৭ এপ্রিল করা যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়েছেন, যার ফলে লড়াই অনেকটা থেমেছে। কিন্তু একটি স্থায়ী সমাধান এখনও অধরা।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাস জানিয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সোমবার সেন্ট পিটার্সবার্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দেখা করেছেন। পুতিন ইরানি জনগণের প্রশংসা করে বলেছেন যে তারা সাহস ও বীরত্বের সঙ্গে তাদের সার্বভৌমত্বের জন্য লড়ছেন। তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে রাশিয়া সম্ভাব্য সবকিছু করবে।আরাঘচি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টিভির একজন সাংবাদিককে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের নেতারা এই যুদ্ধে তাদের কোনো লক্ষ্যই অর্জন করতে পারেননি। এ কারণেই তারা আলোচনার জন্য বলছে। আমরা এখন এটি বিবেচনা করছি।’
পাকিস্তান যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে থমকে যাওয়া আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে, তখনই এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলো। এ সপ্তাহের শুরুতে ইসলামাবাদে এই আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। তবে ট্রাম্প তার প্রতিনিধিদের সফর বাতিল করেন এবং ফোনে আলোচনার পরামর্শ দেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তার মতে, ইরান ওমানের সঙ্গে প্রণালিটি ভাগ করে নেয়। তারা এখন ওমানকে রাজি করানোর চেষ্টা করছে যাতে এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে ‘টোল’ বা মাশুল আদায়ের একটি ব্যবস্থা চালু করা যায়। তবে ওমানের প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
মধ্যস্থতার সঙ্গে জড়িত ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ইরান নতুন আলোচনার আগে মার্কিন অবরোধ অবসানের দাবিতে অনড়। পাকিস্তান-নেতৃত্বাধীন মধ্যস্থতাকারীরা দুই দেশের মধ্যকার এই বিশাল দূরত্ব ঘুচানোর চেষ্টা করছেন।
তেহরান অনেক ভালো প্রস্তাব দিয়েছে : ট্রাম্প-ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার সাংবাদিকদের বলেছেন, পাকিস্তানে মার্কিন প্রতিনিধিদের সফর বাতিল করার পর তেহরান একটি অনেক ভালো প্রস্তাব পাঠিয়েছে।
ট্রাম্প এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি, তবে জোর দিয়ে বলেছেন যে, তার অন্যতম শর্ত হলো ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না। অপরদিকে, ইরান দাবি করে আসছে যে তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ সরিয়ে ফেলতে চায়, যা বোমা তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানে অন্তত ৩ হাজার ৩৭৫ জন এবং লেবাননে ২ হাজার ৫২১ জন নিহত হয়েছেন। লেবাননে ইসরায়েল ও ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে লড়াই শুরু হয়েছিল ইরান যুদ্ধ শুরুর দুই দিন পর থেকে। এছাড়া ইসরায়েলে ২৩ জন এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে ১২ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। দক্ষিণ লেবাননে ১৫ জন ইসরায়েলি সৈন্য,  ১৩ জন মার্কিন সেনা এবং ৬ জন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও তিন সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে। এই সাময়িক বিরতি সত্ত্বেও উভয় পক্ষই একে অপরের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। হিজবুল্লাহ এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় চলা এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়নি।ছবি-সংগৃহীত

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!