মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬, ২৬ ফাল্গুন ১৪৩২

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাবনায় শুধুই ইসরায়েল, সংঘাতের উত্তাপে পুড়ছে আরব দেশগুলো

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: মার্চ ১০, ২০২৬, ০১:১২ পিএম

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাবনায় শুধুই ইসরায়েল, সংঘাতের উত্তাপে পুড়ছে আরব দেশগুলো

ডেইলি খবর ডেস্ক: ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার ইরানের পাল্টা হামলায় যখন উপসাগরীয় দেশগুলো একের পর এক আঘাতের মুখে পড়ছে, তখন তাদের অনেকেরই অভিযোগ— যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও তাদের সামরিক ঘাঁটি থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতের মতো দেশগুলো মনে করছে, ইরানের হামলা থেকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা তারা পাচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও সামরিক সহায়তায় ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় মিত্রদের মধ্যে একটি স্পষ্ট ‘স্তরভেদ’ বা অগ্রাধিকার ব্যবস্থা রয়েছে।
সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকেই তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চজুড়ে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে। ইরানের এসব পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো, বেসামরিক স্থাপনা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন ও কুয়েত, অর্থাৎ যেসব উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) দেশের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বা যেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আছে সেসব দেশও এর আওতায় পড়েছে। পাশাপাশি ইরাকেও হামলা হয়েছে।
তেহরান ইসরায়েলের ওপরও হামলা চালিয়েছে। তবে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র আজারবাইজান ও তুরস্কের আকাশসীমা অতিক্রম করেছে। কিছু হামলার দায় তেহরান অবশ্য অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, ইসরায়েল ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ বা ভুয়া হামলার মাধ্যমে পরিস্থিতি অস্থির করে আরব দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে টানার চেষ্টা করছে।এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি ইরানি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে প্রায় ১৫০ জন স্কুলছাত্রী রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর অসন্তোষ-নিজেদের ভূখণ্ডে মার্কিন সেনা ও সামরিক স্থাপনা থাকা সত্ত্বেও অনেক উপসাগরীয় দেশ মনে করছে, ইরানের হামলা থেকে তাদের রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট ব্যবস্থা নেয়নি। কিছু আরব কর্মকর্তা প্রকাশ্যেই এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত মার্কিন ও ইসরায়েলি স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তাকে নয়।
এ পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোটের মূল্য নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে কিছু উপসাগরীয় কর্মকর্তা চুক্তি পুনর্বিবেচনা করছেন এবং প্রয়োজনে ‘ফোর্স মেজর’ ধারা প্রয়োগের কথাও ভাবছেন।
সাবেক সৌদি গোয়েন্দা প্রধান প্রিন্স তুর্কি আল-ফয়সাল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ধনকুবের খালাফ আহমদ আল-হাবতুরের মতো ব্যাপক পরিচিত ব্যক্তিরা এই সংঘাতকে ‘নেতানিয়াহুর যুদ্ধ’ বলে সমালোচনা করেছেন। তাদের ইঙ্গিত, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কঠোর অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রকে প্রভাবিত করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় মিত্রদের অস্ত্র সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘অস্ত্র শ্রেণিবিন্যাস’ বা অগ্রাধিকার নীতি অনুসরণ করছে।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক ও আইন অধ্যাপক জর্জ বিশারাত বলেন, ‘ইসরায়েল প্রতি বছর প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক অনুদান পায়। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র যেমন পরিবর্তিত এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ব্যবহারেরও সুযোগ পায়।’ তার মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কাঠামোগত, আর উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক মূলত বাণিজ্যিক। তিনি বলেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র কিনে। কিন্তু এটি অনুদান নয়, বাণিজ্যিক লেনদেন এবং এর সঙ্গে নানা শর্ত জড়িত, যা ইসরায়েলের ক্ষেত্রে থাকে না।’
যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে যে অস্ত্র দেয়, তার বেশিরভাগই সামরিক সহায়তার অংশ। তেল আবিব খুব সামান্য অংশের মূল্য দেয়। প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দেয়।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় আগ্রাসন শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে। এছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের কাছে ৬ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয়। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগেই এই অনুমোদন দেয়া হয়।
এমনকি গত সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসন জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে ইসরায়েলের কাছে আরও ১৫১ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয়। ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্র এফ-১৫ ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমান, নির্ভুল লক্ষ্যভেদী বোমা এবং হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্রও সরবরাহ করছে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে একমাত্র ইসরায়েলের কাছেই যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান রয়েছে। ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি জরুরি গোলাবারুদ মজুত কেন্দ্রও রয়েছে, যার নাম ‘ওয়ার রিজার্ভ স্টকপাইল অ্যামুনিশন–ইসরায়েল’।
এছাড়া আয়রন ডোম, ডেভিডস স্লিং এবং অ্যারো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণেও যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দেয়। তবে এসব সুবিধা যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলো পায় না।
উপসাগরীয় দেশগুলোর অস্ত্র ক্রয়-উপসাগরীয় দেশগুলো মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র কিনে থাকে। তারা ইসরায়েলের মতো সামরিক অনুদান পায় না। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের কাছে ৯ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয়। ২০২৫ সালে দুই দেশের মধ্যে প্রায় ১৪২ বিলিয়ন ডলারের ঐতিহাসিক অস্ত্র চুক্তিও হয়।কংগ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে কাতার প্রায় ৪৭ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনেছে। কুয়েত ও বাহরাইনও নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে যুক্তরাষ্ট্র এফ-১৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি করে, সেটিও মূলত সৌদি আরব ও কাতারের কাছে। আর সংযুক্ত আরব আমিরাতকে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান দেয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনও উপসাগরীয় দেশ যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান পায়নি।
ওয়াশিংটন উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে বোয়িং এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি হেলিকপ্টারও বিক্রি করে থাকে। এছাড়া প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং টার্মিনাল হাই অলটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) ব্যবস্থা বিক্রি করা হয়েছে।জর্জ বিশারাতের মতে, এসব তথ্যই যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ‘স্পষ্ট স্তরভেদ’ তুলে ধরে। তার ভাষায়, ‘ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কাঠামোগত। অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক মূলত লেনদেনভিত্তিক।’
জিসিসি দেশগুলোতে ইরানের হামলা-যুদ্ধ শুরুর আগে জিসিসি দেশগুলোর কয়েকজন নেতা যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা না বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, এতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়বে। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতির সময় দেয়া এসব সতর্কবার্তা উপেক্ষিত হয়।
এরপরই আশঙ্কামতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় অনেক দেশের মধ্যে প্রতারিত হওয়ার অনুভূতিও তৈরি হয়েছে।চলমান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানের সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। দেশটির তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ১ হাজার ৪০০টিরও বেশি হামলায় চারজন নিহত এবং ১১৪ জন আহত হয়েছেন।
আল ধাফরা বিমানঘাঁটি, বন্দর, হোটেল, আবাসিক এলাকা এবং একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হয়েছে।
অন্যদিকে সৌদি আরবে হামলার লক্ষ্য ছিল জ্বালানি অবকাঠামো, রিয়াদের মার্কিন দূতাবাস, রাস তানুরা তেল শোধনাগার এবং শায়বাহ তেলক্ষেত্র। কাতারে মেসাইয়িদ ও রাস লাফান শিল্পনগরী এবং তেল–গ্যাস স্থাপনায় হামলা হয়েছে। আল উদেইদে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি লক্ষ্য করেও হামলা হয়েছে।
এছাড়া বাহরাইনে মিনাস সালমানে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তরে হামলা চালিয়েছে ইরান। কুয়েতে আলি আল সালেম বিমানঘাঁটিতে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে ইরান।
ইউক্রেনের সহায়তা-বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও ইসরায়েলের মতো বহুস্তরভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাদের নেই। এদিকে ইরান সস্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে ব্যবহার করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দেয়ার কৌশল নিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন ইউক্রেনের অভিজ্ঞতার দিকে তাকাচ্ছে। রাশিয়ার সঙ্গে চার বছরের যুদ্ধে ইউক্রেন ব্যাপক ড্রোন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো চাইলে তারা ড্রোন প্রতিরোধে নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে প্রস্তুত।
তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি পূরণ করতে চাই। এর বিনিময়ে আমরা প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রতিরোধ ব্যবস্থা দিতে পারি’।
‘মিত্রদের বিপদে ফেলে দেয়া’-হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘাত মধ্যস্থতা বিশেষজ্ঞ সুলতান বারাকাত বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরান যুদ্ধের ঝুঁকি সম্পর্কে জানত, তবুও তারা এই যুদ্ধের পথে এগিয়েছে। তার মতে, এতে উপসাগরীয় দেশগুলো মনে করছে— তাদের স্বার্থ উপেক্ষা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘অনেকেরই মনে হতে পারে যে তাদের কার্যত বিপদের মুখে ফেলে দেয়া হয়েছে’। বারাকাত সতর্ক করে বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো যদি সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়, তাহলে পুরো অঞ্চল বহু বছরের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। (সংগৃহীত-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি ছবি)



 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!