রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩

আল জাজিরার বিশ্লেষণ: ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার বিরোধে নতুন মাত্রা

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১০, ২০২৬, ০৯:৫৬ এএম

আল জাজিরার বিশ্লেষণ: ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার বিরোধে নতুন মাত্রা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার নতুন এ নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। এর আগে আদালটির বিচারক, কৌঁসুলি ও এর কাজে সহায়তাকারী বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল ওয়াশিংটন। এবার পুরো আদালতকে লক্ষ্যবস্তু করায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার বিরোধ নতুন মাত্রা পেল।

আল জাজিরার বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এমন পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওতে মার্কো রুবিও বলেন, ‘এই অবৈধ আদালতের সঙ্গে লেনদেন নিষিদ্ধ করা হবে। এর ফলে আদালতটির সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ কমবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজ করার সক্ষমতা দুর্বল হবে। আমাদের বার্তা স্পষ্ট, যুক্তরাষ্ট্র ও মার্কিন জনগণ এই ভুয়া আইসিসির এখতিয়ারাধীন নয়।’তিনি আরও বলেন, ‘আইসিসি হয় তাদের হুমকি বন্ধ করবে, নয়তো আমরা আইসিসির কার্যক্রম বন্ধ করে দেব।’

নিষেধাজ্ঞার পেছনে আফগানিস্তান ও গাজা তদন্ত

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন নিষেধাজ্ঞার পক্ষে যুক্তি হিসেবে আফগানিস্তানে সংঘটিত কথিত অপরাধের বিষয়ে আইসিসির চলমান তদন্তের কথা উল্লেখ করেছে। ওই তদন্তের আওতায় মার্কিন সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা পড়তে পারেন বলে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ রয়েছে।

এ ছাড়া গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানাকেও যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

শুক্রবারের ঘোষণার আগে আইসিসির কয়েকজন বিচারক ও কৌঁসুলি, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ও ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের এক বিশেষ প্রতিবেদক এবং আদালতকে প্রমাণ সরবরাহকারী কয়েকটি ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংগঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

নিষেধাজ্ঞার নিন্দা আইসিসির

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছেন আইসিসির উপপ্রধান কৌঁসুলি নাজহাত শামীম খান। শুক্রবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনি বলেন, এ নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানানো উচিত।

তার ভাষায়, ‘আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনের শাসন এবং একটি স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠানের কাজকে দুর্বল করাই এ নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য।’

তবে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আদালতের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি। খান বলেন, আইসিসি তার বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে কাজ, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া চালিয়ে যাবে।

এক বিবৃতিতে আইসিসি সদস্যদেশগুলোকে আদালতের প্রতি সমর্থন আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, ইতিহাস এ মুহূর্তের মূল্যায়ন করবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, বিশেষ করে ব্যাপক নৃশংসতার শিকার ব্যক্তিরা জানতে চাইবেন, তাদের সুরক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হওয়ার সময় বিশ্ব কী ভূমিকা নিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আইসিসির সদস্য নয়

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হলো রোম সংবিধি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এ চুক্তির সদস্য নয়। তবে আদালতের দীর্ঘদিনের অবস্থান হলো, আইসিসির সদস্যদেশগুলোর ভূখণ্ডে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগে অন্য দেশের নাগরিকদেরও বিচার করা যেতে পারে।

এ পর্যন্ত কোনো মার্কিন নাগরিকের বিরুদ্ধে বিচার শুরু করার উদ্যোগ নেয়নি আইসিসি। তবে আফগানিস্তান-সংক্রান্ত তদন্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ রয়েছে।

২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রণীত একটি আইনেও আইসিসির বিচারের জন্য মার্কিন নাগরিকদের প্রত্যর্পণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই আইনে আইসিসির হাতে কোনো মার্কিন নাগরিক আটক হলে তাকে মুক্ত করতে সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমোদনও রয়েছে। সমালোচকেরা আইনটির এ বিধানকে ‘হেগ আক্রমণ ধারা’ বলে অভিহিত করেন।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি পূর্ববর্তী প্রশাসন, বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্বাধীন সরকারগুলো, আইসিসিকে সমর্থন দিয়েছে এবং আদালত প্রতিষ্ঠার মূলনীতির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রভাবের আশঙ্কা

মানবাধিকার পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে আইসিসির তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন, তথ্য সংগ্রহকারী এবং তদন্তে সহায়তাকারী ব্যক্তিদের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব ফ্রেজার ভ্যালির আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক মার্ক কার্স্টেন বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই আইসিসির সমর্থকেরা আদালতটির ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপের আশঙ্কা করে আসছিলেন।

আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘মূল উদ্বেগ ছিল শুধু ব্যক্তিদের ওপর নয়, আদালতটির ওপরও নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির আশঙ্কাই এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে।’

এদিকে আইসিসি থেকে অন্য দেশগুলোকে সরে আসার আহ্বানও জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিদেশি সহায়তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে আইসিসির সম্পর্ক বিবেচনা করা হতে পারে বলেও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার, মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও আইসিসির বিরোধ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংগৃহীত ছবি, সূত্র: আল জাজিরা

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!