ডেইলি খবর ডেস্ক: ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু ন্যাটো জোটকে ঘিরে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপে মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমানোর ঘোষণা দেওয়ার পর কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ ন্যাটোর বিকল্প নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে গোপনে আলোচনা শুরু করেছে। রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকি, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে সন্দেহ এবং ন্যাটোর ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগের কারণে ইউরোপের নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে নতুন চিন্তা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ন্যাটো ছাড়া ইউরোপ কীভাবে সংকট পরিস্থিতি সামাল দেবে, তা নিয়ে বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজছেন।দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে ন্যাটো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে গঠিত এ সামরিক জোটের কেন্দ্রীয় শক্তি ছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর থেকেই ন্যাটো নিয়ে তার অবস্থান ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র পোল্যান্ডে চার হাজার সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা বাতিল করেছে। এর আগে জার্মানি থেকে পাঁচ হাজার সেনা প্রত্যাহারের কথাও জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। পাশাপাশি ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট মোতায়েনের পরিকল্পনাও বাতিল করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তগুলো ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে নতুন আশঙ্কা তৈরি করেছে। কারণ এতদিন তাদের ধারণা ছিল, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ধীরে ধীরে কমলেও নিজেদের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যাবে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিবর্তন সেই হিসাব পাল্টে দিয়েছে।
ন্যাটো নিয়ে উদ্বেগের নতুন মাত্রা-ন্যাটো জোটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর অনুচ্ছেদ-৫ বা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা। কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যদের তার সহায়তায় এগিয়ে আসার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।কিন্তু ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর থেকেই এই নীতির প্রতি নিজের প্রতিশ্রুতি নিয়ে বারবার প্রশ্নের জন্ম দিয়েছেন। বিভিন্ন ন্যাটো দেশের সামরিক কর্মকর্তা ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় জানা গেছে, কিছু দেশ এখন এমন পরিস্থিতির পরিকল্পনা করছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র শুধু সাহায্য না করা নয়, বরং ন্যাটোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করতেও বাধা দিতে পারে।
এক সুইডিশ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ড সংকট ছিল আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। তখনই বুঝেছি, আমাদের একটি প্ল্যান বি প্রয়োজন।’ যদিও এসব আলোচনা প্রকাশ্যে হচ্ছে না। কারণ কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে যুক্তরাষ্ট্র আরও দ্রুত ন্যাটো থেকে দূরে সরে যেতে পারে।
কী হতে পারে ইউরোপের ‘প্ল্যান বি’-ন্যাটোর বিকল্প হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জয়েন্ট এক্সপিডিশনারি ফোর্স (জেইএফ)। ২০১৪ সালে যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি ন্যাটো সদস্য দেশ এই জোট গঠন করে। বর্তমানে এতে প্রধানত বাল্টিক ও নর্ডিক অঞ্চলের ১০টি দেশ রয়েছে। এ জোটের বিশেষত্ব হলো, ন্যাটোর মতো সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের বাধ্যবাধকতা এখানে নেই। ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাটো কাঠামো অকার্যকর হলে জেইএফ একটি বিকল্প হতে পারে। কারণ এর নিজস্ব গোয়েন্দা, পরিকল্পনা ও যোগাযোগ সক্ষমতা রয়েছে। তবে সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। জেইএফে ফ্রান্স, জার্মানি ও পোল্যান্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি নেই। আবার, যুক্তরাজ্যের নিজস্ব প্রতিরক্ষা খাতের বাজেট ঘাটতি এবং সামরিক সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা নিয়েও মিত্রদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
ইউরোপের সামনে নতুন বাস্তবতা-বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাটো নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি ইউরোপকে একটি কঠিন বাস্তবতার মুখে দাঁড় করিয়েছে। এতদিন ইউরোপের প্রতিরক্ষা কৌশলের কেন্দ্র ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি। কিন্তু এখন ইউরোপকে হয় বিদ্যমান ন্যাটো কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে, নয়তো বিকল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।সংগৃহীত ছবি

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :