আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নাইন-ইলেভেন হামলার ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০০১ সালের ওই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শুরু হওয়া একের পর এক যুদ্ধ ও সামরিক অভিযানে বিশ্বজুড়ে বিপর্যস্ত হয়েছে লাখ লাখ মানুষের জীবন। ২০০১ সালের পর থেকে প্রতি বছরই বিশ্বের কোনো না কোনো দেশে বোমা হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) এ সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল-কায়েদার ১৯ হামলাকারী চারটি বাণিজ্যিক বিমান ছিনতাই করে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনে হামলা চালায়। এতে প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে আসে বড় পরিবর্তন। ২০০৩ সালে ইরাকে হামলা চালানোর সময় তৎকালীন ইরাকি শিক্ষার্থী ওমরের বয়স ছিল ১৮ বছর। তিনি বলেন, ‘মুহূর্তেই সবকিছু কেমন বদলে গিয়েছিল।’ যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, ইরাকে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র রয়েছে। পরে এই দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয়।
‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’, নিহত ৪৫ লাখের বেশি-নাইন-ইলেভেনের এক মাসেরও কম সময় পর যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে হামলা চালায়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এই অভিযানকে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা ওয়ার অন টেরোর’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। এরপর আফগানিস্তান, ইরাক ও মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে একের পর এক যুদ্ধ ও সামরিক অভিযান চালানো হয়।
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধগুলোতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে আনুমানিক ৪৫ লাখ থেকে ৪৭ লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার সরাসরি এবং ৩৬ লাখ থেকে ৩৮ লাখ মানুষ রোগ, অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত জটিলতায় পরোক্ষভাবে মারা গেছেন।
আফগানিস্তান: সরাসরি নিহত ১ লাখ ৭৬ হাজার-২০০১ সালের ৭ অক্টোবর ‘অপারেশন এন্ডিউরিং ফ্রিডম’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তালেবান ক্ষমতা হারালেও যুদ্ধ চলে প্রায় ২০ বছর। যুক্তরাষ্ট্রের চার প্রেসিডেন্টের সময় ধরে চলা এই সংঘাত ছিল দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধ।
‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রকল্পের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধে সরাসরি প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার মানুষ নিহত হন। ক্ষুধা, রোগ ও চিকিৎসা না পাওয়া কারণে মারা যান আরও কয়েক লাখ। যুদ্ধের আগে আফগানিস্তানে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার হার ছিল ৬২ শতাংশ। যুদ্ধের পর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯২ শতাংশে। অবিস্ফোরিত অস্ত্র ও স্থলমাইন এখনও বেসামরিক মানুষের মৃত্যু ও আহত হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরাক: সরাসরি নিহত ৩ লাখ ১৫ হাজার-আফগানিস্তানে হামলা শুরুর দুই বছরেরও কম সময় পর ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ ইরাকে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। ওমর বলেন, ‘আমাদের সেই বোমার শব্দগুলোর কথা মনে পড়ে, আমরা খুব ভয় পেয়েছিলাম।’ যুদ্ধ যখন বাগদাদে পৌঁছেছিল, তখন বিপদ সত্ত্বেও তার কয়েকজন বন্ধু পরিস্থিতি দেখতে বেরিয়ে পড়েছিলেন। ওমরের ভাষ্য, ‘আমি তাদের বলেছিলাম, তোমরা কেন যাচ্ছ? তারপর তারা গেল, আর ফিরে আসেনি। সেই কথা মনে পড়লে খুব কষ্ট হয়।’
বিমান ও ড্রোন হামলা - স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিমান ও ড্রোন অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৪ সাল থেকে ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের হিসাবে, পাকিস্তানে ৪২৩টি মার্কিন হামলায় আনুমানিক ২ হাজার ৪৯৯ থেকে ৪ হাজার ১ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে বেসামরিক মানুষের সংখ্যা ৪২৪ থেকে ৯৬৬।
ইয়েমেনেও অন্তত ১৮৬টি হামলা ও অভিযান চালানো হয়েছে। এতে অন্তত ৮৫৩ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ১৫৮ জন বেসামরিক। এছাড়া সোমালিয়ায় ২০০১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ১৯ থেকে ২৩টি হামলায় ১৮৮ থেকে ২৭৬ জন নিহত হয়েছেন।২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে লিবিয়ায় বিক্ষোভ দমনের সময় বেসামরিক মানুষকে রক্ষার জন্য জাতিসংঘের অনুমোদনে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বিমান অভিযান চালায়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে, সাত মাসে লিবিয়ায় চালানো হয় প্রায় ৯ হাজার ৭০০টি হামলা। পরে বিদ্রোহী যোদ্ধাদের হাতে গাদ্দাফি বন্দি ও নিহত হন।
২০১৪ সালে ইরাক ও সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘অপারেশন ইনহেরেন্ট রিজলভ’-এ ব্যাপক বিমান ও স্থল অভিযান চালানো হয়। এতে কয়েক ব্যবহার করা হয়েছিল দশ হাজার বোমা। ২০১৮ সালের মধ্যে ধ্বংস ও প্রাণহানির মাত্রা ব্যাপক হয়ে ওঠে। কর্মকর্তারা ১ হাজার ৪১৭ বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করলেও সামরিক অভিযানে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণকারী লন্ডনভিত্তিক সংগঠন এয়ারওয়ার্সের হিসাবে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ৮ হাজার ২৬৪ থেকে ১৩ হাজার ৩৬০ হতে পারে।
‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রকল্পের হিসাবে, নাইন-ইলেভেনের পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, ফিলিপাইন, লিবিয়া ও সিরিয়ায় ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ নিজেদের দেশেই বা বিদেশে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছে মানুষ। গত বছর ইরান ও পাকিস্তান প্রায় ২৯ লাখ আফগানকে সীমান্তের ওপারে ফেরত পাঠিয়েছে। ইরাকে ২০০৩ সালের আগ্রাসনের দুই দশক পরও ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন।৪০ বছর বয়সী আফগান নারী আয়েশা জীবনের বড় একটি সময় আফগানিস্তান ও ইরানের মধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়ে কাটিয়েছেন। ১৯৯৪ সালে তার পরিবার প্রথম আফগানিস্তান ছেড়ে যায়। ২০০০ সালে তারা ফিরে আসে। পরে ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের পর আবার দেশ ছাড়ে।
ইরানে ১১ বছর থাকার পর তাকে ও তার সন্তানদের বহিষ্কার করে আফগানিস্তানে ফিরতে বাধ্য করা হয়। আয়েশা বলেন, ‘আমি বহুবার গিয়েছি এবং ফিরে এসেছি। সর্বশেষ আমরা সেখানে ১১ বছর ছিলাম। কিন্তু এরপর ইরানিরা আমাদের বের করে দেয় এবং আমার সন্তানদের স্কুল থেকেও বের করে দেয়।’
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সেনাদের ওপর প্রভাব-আফগানিস্তানে ৮ লাখের বেশি মার্কিন সেনা দায়িত্ব পালন করেছেন এসব যুদ্ধে। ২০২১ সালে সর্বশেষ মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত সেখানে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা নিহত এবং ২০ হাজার আহত হন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও মিত্র দেশগুলোর বাহিনী মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ সেনা নিহত এবং ২৩ হাজার ৫০০-এর বেশি আহত হয়েছেন দেশটিতে।
ডিফেন্স ক্যাজুয়ালটি অ্যানালাইসিস সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী, ইরাক যুদ্ধে ৩ হাজার ৪৮১ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৩১ হাজারের বেশি আহত হন। যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি খরচও ছিল বিপুল। ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে নাইন-ইলেভেন পরবর্তী যুদ্ধে অংশ নেয়া সাবেক সেনাদের চিকিৎসা ও অন্যান্য সহায়তার পেছনে ২০৫০ সাল পর্যন্ত ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন থেকে ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। এর বড় অংশ এখনও পরিশোধ করা হয়নি। অনেক সাবেক সেনা এখনও মানসিক স্বাস্থ্যসংকটের মধ্যে রয়েছেন।
‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রকল্পের পরিচালক স্টেফানি সাভেল আল জাজিরাকে বলেন, ‘নাইন-ইলেভেনের পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হওয়ার তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও সাবেক সেনাদের আত্মহত্যায় মৃত্যুর সংখ্যা চার গুণ বেশি। মানুষ বেশি হারে মানসিক সমস্যা ও আঘাত নিয়ে ফিরে আসছে এবং এরপরও তাদের অতীতের তুলনায় অনেক বেশি ঘনঘন পুনরায় যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে।’
‘অন্তহীন যুদ্ধের’ খরচ ৮ ট্রিলিয়ন ডলার-দুই দশকের যুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র আনুমানিক ৫ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এর সঙ্গে আগামী কয়েক দশকে সাবেক সেনাদের চিকিৎসা ও সহায়তার জন্য বরাদ্দ রয়েছে আরও ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে মোট খরচ অন্তত ৮ ট্রিলিয়ন ডলার।
২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ পরিচালনার পেছনে যত অর্থ ব্যয় করছে, ততটাই সুদ পরিশোধে ব্যয় করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর এই ঋণের বোঝা বহনের ভার পড়বে বর্তমানের ২৫ বছরের কম বয়সী প্রজন্মের ওপর। জরিপগুলোতে দেখা গেছে, বিদেশে আগ্রাসী যুদ্ধ চালানোর বিষয়ে মার্কিন জনগণের আগ্রহ কম। ইরানের বর্তমান যুদ্ধও দেশটির জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয়।
সাভেল বলেন, ‘ট্রাম্পকে ভোট দেয়া কিছু মানুষ তাকে সমর্থন করেছিলেন কারণ তিনি ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং শান্তির কথা বলেছিলেন। কিন্তু তিনি ক্ষমতায় আসার পর থেকে পরিস্থিতি তার সম্পূর্ণ বিপরীত হয়েছে। সোমালিয়া ও ইয়েমেনে বিমান হামলা বেড়েছে, সামরিক বাহিনীর নিয়ম শিথিল করা হয়েছে এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষার ব্যবস্থাও কমানো হয়েছে। তার ওপর ইরানে এই যুদ্ধ শুরু করা হলো, ক্যারিবীয় অঞ্চলে নৌযানে হামলা হলো- সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, তিনি সর্বত্রই যুক্তরাষ্ট্রের সহিংস কর্মকাণ্ডের মাত্রা বাড়িয়েই চলেছেন।’সংগৃহীত ছবি

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :