রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন: ইরান ইস্যুতে আরেকটি ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধের’ ঝুঁকিতে ট্রাম্প

বিশ্ব ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৬, ০৯:৫৯ এএম

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন: ইরান ইস্যুতে আরেকটি ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধের’ ঝুঁকিতে ট্রাম্প

ডেইলি খবর ডেস্ক : কোনো দেশই যুদ্ধ শুরু করার সময় মনে করে না যে সেই যুদ্ধ চিরদিন চলবে। কিন্তু ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রেসিডেন্ট এমন সব যুদ্ধে জড়িয়েছেন, যা বছরের পর বছর ধরে চলেছে। শেষ পর্যন্ত পরবর্তী কোনো প্রেসিডেন্ট খরচ ও রাজনৈতিক চাপ সহ্য করার মতো না হওয়ায় বিজয় ঘোষণা করে সেনা ফিরিয়ে এনেছেন।

ইরান ইস্যুতে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও হয়তো একই ফাঁদে পড়তে যাচ্ছেন। তিনি যখন নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন, তখন যুদ্ধ শুরু করা নয়, বরং যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের কথা বাদই থাক, যেকোনো ধরনের দীর্ঘস্থায়ী বা ‘অনন্ত যুদ্ধে’ কখনো না জড়ানোর কথা বলেছিলেন তিনি। অথচ ইরানের ক্ষেত্রে তিনি ঠিক সেই চিরস্থায়ী যুদ্ধের ঝুঁকিই তৈরি করছেন বলে ধারণা সমালোচদের।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী হামলা চালিয়ে যুদ্ধ শুরু করে। পরবর্তীতে কখনো আলোচনা অথবা আবার হামলা পর্যায়ক্রমনে চলছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য-ইরানের সরকার পরিবর্তন বা দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ-কোনোটিই অর্জন করতে পারেনি। বরং যুদ্ধের ফলে নতুন একটি বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে।

কেননা যুদ্ধবিরতি ইতোমধ্যে ভেঙে গেছে এবং হরমুজ প্রণালিও অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এক মাসও পার হওয়ার আগেই ভেস্তে গেছে ট্রাম্পের সেই সমঝোতা স্মারক, যা নিয়ে তিনি দাবি করেছিলেন যে এটি তাদের সব লক্ষ্য পূরণ করেছে। যদিও সমঝোতা স্মারকটি নিয়ে নানা মহলে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা ছিল।


ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, উভয় পক্ষই এ সমঝোতা স্মারককে শান্তির সেতু হিসেবে দেখেনি; বরং তারা এটিকে ভিন্ন উপায়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছে।

একটি টেকসই সমাধানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কোনো কৌশল না থাকলে, এ পরিস্থিতি আরেকটি ‘অনন্ত যুদ্ধের’ ক্ষেত্র তৈরি করার ঝুঁকি বাড়াবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

‘অনন্ত যুদ্ধ’ বা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ধারণা মূলত শুরু হয়েছিল ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলা এবং এর জের ধরে যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধ’ শুরুর ঘোষণার মধ্য দিয়ে।

তখন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ও ইরাকে দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালায়। শুরুতে সেদেশের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলেও পরে বিদ্রোহ দমন ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় বহু বছর কেটে যায়। শেষ পর্যন্ত বিপুল অর্থ ও প্রাণহানির পরও স্পষ্ট সাফল্য আসেনি।

যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ লরেন্স ডি. ফ্রিডম্যান বলেন, শক্তিশালী দেশগুলো প্রায়ই মনে করে তারা খুব দ্রুত যুদ্ধ জিতে যাবে। কিন্তু তারা সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারে না। ফলে যুদ্ধ অনেক দীর্ঘ হয়।

তিনি বলেন, ট্রাম্প যেমন ইরানে, তেমনি ইউক্রেনের ক্ষেত্রে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিজেদের সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হন। তাই তারা এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করেন যা দ্রুত অর্জন করা সম্ভব ছিল না।

শুধু শক্তিশালী সেনাবাহিনী থাকলেই যুদ্ধ জেতা যায় না। যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্যকে স্থায়ী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সাফল্যে রূপ দিতে একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দরকার। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও বেশি, কারণ তিনি স্থলবাহিনী পাঠাতে চান না; শুধু বিমান ও নৌবাহিনীর ওপর নির্ভর করছেন।

১৯৯১ সালের পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং এটি লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়েছিল। কারণ, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল সীমিত-শুধু কুয়েত থেকে ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে বিতাড়িত করা। কিন্তু তাঁর ছেলে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাকের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় যুদ্ধের সময় এ শিক্ষা ভুলে যান, যার চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে ওই অঞ্চলে উল্টো ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায়। আফগানিস্তানের ক্ষেত্রেও, জুনিয়র বুশ তালেবানদের ক্ষমতাচ্যুত করার পর তিনি ও তাঁর উত্তরসূরিরা আফগান সমাজকে নতুন করে গড়ে তোলার ব্যর্থ চেষ্টা করেন। অবশেষে ওয়াশিংটন যখন এ দীর্ঘ চেষ্টায় ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন সেখানে তালেবান আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ইসরাইলের প্ররোচনায় ট্রাম্প আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছেন। এই সংঘাত লেবানন, ফিলিস্তিন ও ইয়েমেনে ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমেও চলছে।

ট্রাম্প চাইলে এখনো তার সমর্থকদের কাছে এই যুদ্ধকে একটি বিজয় হিসেবে তুলে ধরে সরে আসতে পারেন। কিন্তু তিনি বরং আরো বেশি জড়িয়ে পড়ছেন, অথচ শান্তি প্রতিষ্ঠার স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। আর হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার মার্কিন প্রতিশ্রুতি এবং এই জলপথের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার অবস্থান-দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

তবে এই যুদ্ধ আফগানিস্তান বা ইরাকের যুদ্ধের মতো নয়। সেখানে বহু বছর ধরে হাজার হাজার মার্কিন সেনা দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করেছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মদতপুষ্ট নতুন সরকারগুলোর বিরোধী মিলিশিয়া ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে মার্কিন সেনারা। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র মূলত একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়ছে।

এছাড়া ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহে বড় প্রভাব ফেলতে সক্ষম। এর মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই ইরান সহজে এর নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে না।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বৈদেশিক নীতি বিষয়ক পরিচালক সুজান মালোনি বলেন, যুদ্ধের আগের পরিস্থিতিতে আর ফেরা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ইরাকের মতোই, মার্কিনিদের অনুমান ও ভুল ধারণা এই অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। এখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাধামুক্ত যান চলাচলের দিন সম্ভবত শেষ হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, এখন হয়তো একটি ‘নতুন স্বাভাবিক’ পরিস্থিতি তৈরি হবে, যেখানে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে আরও বেশি সামরিক উপস্থিতি রাখতে হবে।

তবে ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এ যুদ্ধের একটি চূড়ান্ত অবসান ঘটানো এখনো অনেক দূরের বিষয় বলে মনে হচ্ছে।

আপাতত আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম জানিয়ে আলী ভাইজ বলেন, কারণ দুই পক্ষ একটি সমঝোতা স্মারকও ধরে রাখতে পারেনি। যদি এমনই চলতে থাকে, তাহলে মাঝেমধ্যে সংঘর্ষের বদলে এটি সত্যিই একটি ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধে’ পরিণত হতে পারে।ফাইল ছবি

 

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!