বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩

বিবিসির বিশ্লেষণ: মেসি যেভাবে ফুটবলের ইতিহাস বদলে দেন, হয়ে ওঠেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২৬, ১১:৫৫ এএম

বিবিসির বিশ্লেষণ: মেসি যেভাবে ফুটবলের ইতিহাস বদলে দেন, হয়ে ওঠেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা

স্পোর্টস ডেস্ক: আর্জেন্টিনা যদি ১৯৬২ সালের পর প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখতে পারে এবং ইতিহাসে মাত্র তৃতীয় দল হিসেবে এই কীর্তি গড়ে, তাহলে সেই সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ছন্দে আছেন। এটি পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও মেক্সিকোর গিয়ের্মো ওচোয়ার সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ সংখ্যক বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ড। এবারের আসরে তিনি ইতিমধ্যে আটটি গোল করেছেন এবং দুটি গোলে অ্যাসিস্ট করেছেন। তবে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে শীর্ষে থাকলেও দর্শকরা এবার দেখছেন এক ভিন্ন মেসিকে। ২০০৩ সালে বার্সেলোনার জার্সিতে অভিষেক হওয়া সেই তরুণ উইঙ্গারের সঙ্গে বর্তমান মেসির পার্থক্য অনেক। এরই মধ্যে ৮ গোল করা এমবাপ্পের সামনে আর একটি ম্যাচ বাকি। তাতে তিনি গোল পেলেও গোল্ডেন বুটের ফয়সালা কি হবে এখনই বলা যাচ্ছে না। বুধবার আটলান্টা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা। স্বাভাবিকভাবেই সব নজর থাকবে মেসির দিকে।ঝড়পপবৎ

বেশিরভাগ ফুটবলারের পারফরম্যান্স বয়সের সঙ্গে কমে যায়। কিন্তু কিংবদন্তিরা নিজেদের নতুনভাবে গড়ে তোলেন। যেমন, গতি কমে যাওয়ার পর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো নিজেকে বক্সের ভেতরের গোলশিকারিতে রূপান্তর করেছিলেন। মেসিও বদলেছেন। তবে অবনতি সামাল দিতে নয়। তিনি নিজেকে এমনভাবে বদলেছেন যাতে এখনও খেলাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন এবং প্রতিপক্ষের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকেন। এই বিশ্বকাপে তিনি আগের চেয়ে কম দৌড়েছেন। কিন্তু অনেক বেশি সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। তার ৩৩টি শট ও ২১টি গোলের সুযোগ তৈরির রেকর্ড মিলিয়ে মোট ৫৪টি আক্রমণাত্মক অবদান- যা ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনার পর সর্বোচ্চ। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, তিনি মাঠে যে দূরত্ব অতিক্রম করেছেন, তার ৪৭ শতাংশই হেঁটেছেন। টুর্নামেন্টে কোনো আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে এটি সর্বোচ্চ। প্রতি ৯০ মিনিটে তিনি গড়ে মাত্র ৮.২ কিলোমিটার দৌড়েছেন, যা আর্জেন্টিনার অন্তত ২০ মিনিট খেলা সব আউটফিল্ড ফুটবলারের মধ্যে সবচেয়ে কম। আরও একটি পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি ম্যাচে তার গড় স্প্রিন্ট মাত্র ২.৭টি। চার বছর আগে যা ছিল ৫.৩টি। গত ১৫টি বিশ্বকাপ ম্যাচে কেবল পোল্যান্ডই মেসিকে গোল কিংবা অ্যাসিস্ট থেকে বিরত রাখতে পেরেছে। এই ১৫ ম্যাচে তার অবদান ১৬ গোল ও ৭ অ্যাসিস্ট।

২০০৩ সালে ১৬ বছর বয়সী মেসি যখন হোসে মরিনহোর পোর্তোর বিপক্ষে বার্সেলোনার হয়ে প্রীতি ম্যাচে অভিষেক করেন, তখন তিনি ছিলেন ডান প্রান্তের উইঙ্গার। ড্রিবলিং করতেন, ভেতরে কেটে এসে আক্রমণ গড়তেন। এরপর থেকে অন্তত পাঁচবার নিজের খেলার ধরন বদলেছেন তিনি। সেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতাই তাকে আজকের আর্জেন্টিনা ও ইন্টার মায়ামির মেসিতে পরিণত করেছে।

বিশ্বের সেরা ফুটবলার হিসেবে পরিচিত রোনালদিনহো প্রথমবার অনুশীলনে মেসিকে দেখে বলেছিলেন, এই ছেলেই একদিন বিশ্বের সেরা হবে। ২০০৫ সালে জোয়ান গ্যাম্পার ট্রফিতে জুভেন্টাসের বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে বিশ্বকে চমকে দেন ১৮ বছর বয়সী মেসি। জুভেন্টাস কোচ ফাবিও ক্যাপেলো এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তাকে দলে নেয়ার চেষ্টা করেন। ২১ বছর বয়সে পৌঁছানোর পর, রোনালদিনহোর সময় শেষ হতে থাকলে বার্সেলোনা কোচ ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড বুঝেছিলেন, দলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মেসির পায়ে যত বেশি সম্ভব বল তুলে দেয়া। রাইকার্ড বলেছিলেন, খেলার কেন্দ্রেই তাকে থাকতে হবে। সে যত বেশি বল ছুঁবে, দলের জন্য তত ভালো। ২০০৮ সালে পেপ গার্দিওলা দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম দিকে মেসির প্রধান জায়গা ছিল ডান উইং। কিন্তু পরে তিনি তাকে সেখান থেকে সরিয়ে আনেন। কারণ, মেসি রক্ষণভাগে খুব একটা ফিরতেন না, ফলে ফুল-ব্যাক সমস্যায় পড়তেন। তবে গার্দিওলা জানতেন, শেষ পর্যন্ত মেসির জায়গা হবে মাঠের কেন্দ্রেই। আর পুরো দল গড়ে উঠবে তাকে ঘিরে।

২০০৯ সালের ২রা মে। লা লিগায় রিয়াল মাদ্রিদের মাঠ সান্তিয়াগো বের্নাবেউ। সেদিন গার্দিওলা সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। ডান উইং থেকে মেসিকে তুলে এনে খেলান ‘ফলস নাইন’ হিসেবে। স্যামুয়েল এতো’ও চলে যান ডানে, থিয়েরি অঁরি বামে। আর মেসিকে বলা হয়- নিচে নেমে বল নাও, সিদ্ধান্ত নাও। ফলাফল? বার্সেলোনার ৬-২ গোলের ঐতিহাসিক জয়। এটি পুরো ইউরোপীয় ফুটবলের কৌশল বদলে দেয়। প্রতিপক্ষের সেন্টার-ব্যাকরা বুঝতে পারছিলেন না মেসির পিছু নেবেন, নাকি নিজেদের জায়গায় থাকবেন। দুই সিদ্ধান্তই ভুল প্রমাণিত হতো। পেছনে জাভি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা ও ইয়াইয়া তুরে; দুই পাশে অঁরি ও এতো’ও- এই সমন্বয় প্রতিপক্ষকে অসহায় করে তুলেছিল। কয়েক সপ্তাহ পর চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালেও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে একই কৌশল ব্যবহার করেন গার্দিওলা। সেই ম্যাচেও গোল করেন মেসি। ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে লা লিগায় মাত্র ৬৯ ম্যাচে করেন ৯৬ গোল। এরই ধারাবাহিকতায় আটটি ব্যালন ডি’অর জেতেন তিনি।

গোলদাতা থেকে প্লেমেকার

জাভি ২০১৫ সালে এবং ইনিয়েস্তা ২০১৮ সালে বার্সেলোনা ছাড়ার পর মেসির ভূমিকা আবার বদলে যায়। আগে তিনি ছিলেন দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। এরপর তাকে পুরো দলের ইঞ্জিন হয়ে উঠতে হয়। তিনি আরও নিচে নেমে খেলতে শুরু করেন। গোল করার পাশাপাশি আক্রমণ গড়া, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ- সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। ২০১৯-২০ মৌসুমে লা লিগায় ৩৩ ম্যাচে করেন ২৫ গোল ও ২২ অ্যাসিস্ট। ২০২০-২১ মৌসুমে ৩০ গোল ও ১১ অ্যাসিস্ট করেন। পরে পিএসজিতে প্রথম মৌসুমে করেন ১১ গোল ও ১৫ অ্যাসিস্ট- ক্লাব ক্যারিয়ারে প্রথমবার গোলের চেয়ে অ্যাসিস্ট বেশি। একজন আর্জেন্টাইন বিশ্লেষকের ভাষায়, তিনি গোলদাতা থেকে ইনিয়েস্তার মতো সৃষ্টিশীল ফুটবলারে পরিণত হয়েছেন।

আর্জেন্টিনা দলের নেতা হয়ে ওঠা

কৌশলগত পরিবর্তনের পাশাপাশি মানসিক দিক থেকেও বদলেছেন মেসি। ২০১১ সালে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হওয়ার পর একের পর এক হতাশা আসে। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হার। ২০১৫ কোপা আমেরিকা ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হার। ২০১৬ সালেও একই পরিণতি। টানা তিনটি ফাইনালে হারার পর তিনি জাতীয় দল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরে ফিরে এলেও আগের মতো ছিলেন না। ২০১৯ কোপা আমেরিকায় ব্রাজিলের কাছে সেমিফাইনাল হারের পর প্রকাশ্যে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনমেবলকে কঠোর সমালোচনা করেন। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে যেন সব চাপ ঝরে যায়। মারাকানায় ব্রাজিলকে হারিয়ে ২৮ বছরের শিরোপা খরা কাটায় আর্জেন্টিনা।ঝড়পপবৎ

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন থেকে অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শক

২০২২ বিশ্বকাপে যেন মেসির সব রূপ একসঙ্গে দেখা যায়। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে যোশকো গভার্দিওলকে কাটিয়ে দৌড়ে যাওয়া সেই মুহূর্ত যেন পুরোনো উইঙ্গার মেসির স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে নিখুঁত পাস, সঠিক সময়ে জায়গা বদল, গোল এবং টাইব্রেকারে স্নায়ুচাপ সামলে সফল শট- সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন পূর্ণাঙ্গ দলীয় নেতা। ২০২৩ সালে জিনেদিন জিদানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মেসি বলেন, ফুটবল অনেক বদলে গেছে। খেলার ধরন, সিস্টেম- সবই পাল্টেছে। এখন ফুটবল আগের চেয়ে অনেক বেশি কৌশলনির্ভর এবং শারীরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল।

এখন তিনি হাঁটেন বেশি, দেখেন আরও বেশি

ইন্টার মায়ামি, ২০২৪ কোপা আমেরিকা এবং চলতি বিশ্বকাপে মেসিকে দৌড়ানোর চেয়ে হাঁটতেই বেশি দেখা যাচ্ছে। একসময় সমালোচকরা এটিকে দুর্বলতা বলতেন। আজ সেটিই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি শক্তি সঞ্চয় করেন, পুরো ম্যাচ বিশ্লেষণ করেন এবং ঠিক প্রয়োজনের মুহূর্তে আঘাত হানেন। শৈশবের আদর্শ পাবলো আইমার একবার বলেছিলেন, সবশেষের মেসিই সব সময় সেরা মেসি।

সম্ভবত কথাটি এখনও সত্য।

দুই দশকের ক্যারিয়ারে মেসির সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু ট্রফি বা গোলসংখ্যা নয়। বরং প্রতিটি সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে সম্পূর্ণ নতুন একজন ফুটবলার হিসেবে গড়ে তোলার বিরল ক্ষমতাই তাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করেছে। ক্যাপেলোকে মুগ্ধ করা সেই কিশোর উইঙ্গার। ইউরোপীয় ফুটবলের কৌশল পাল্টে দেয়া ‘ফলস নাইন’। অন্যদের আরও ভালো খেলতে শেখানো প্লেমেকার তিনি। বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক।

আর এখন! কম দৌড়েও পুরো ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করা অভিজ্ঞ এক মহাতারকা।

এই বিশ্বকাপে মেসিকে নিয়ে অসংখ্য প্রশংসা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সত্যটি হলো- তিনি কতটা ভালো, সেটি নয়; বরং নিজের ক্যারিয়ারে কতবার সম্পূর্ণ নতুন একজন ফুটবলার হয়ে উঠতে পেরেছেন, সেটিই তাকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা করে তুলেছে।সংগৃহীত ছবি (লেখক বিবিসির স্পোর্টস কলামনিস্ট)

 

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!