ডেইলি খবর প্রতিবেদক: ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) মেয়র নির্বাচনে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দক্ষিণ সিটিতে (ডিএসসিসি) নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে এনসিপি। আজ রোববার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে দলের অস্থায়ী কার্যালয়ে এক সমন্বয় সভায় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এ ঘোষণা দেন। সন্ধ্যায় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তি বলা হয়, দুই মহানগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডের সম্ভাব্য কাউন্সিলরদের নিয়ে এ সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। দলের প্রধান নাহিদ ইসলাম ওয়ার্ডভিত্তিক নাগরিক সমস্যা, জুলাই আন্দোলনে হতাহতদের পরিবারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা এবং আওয়ামী লীগের ‘নাশকতামূলক তৎপরতার’ প্রতি কড়া নজরদারি রাখার নির্দেশনা দেন।
মেয়র প্রার্থী এনসিপির মুখপাত্র আসিফ ও মুখ্য সমন্বয়ক পাটওয়ারীও সভায় উপস্থিত ছিলেন। এ সময় আরও ছিলেন ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক ও দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক ইসহাক সরকারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
ঢাকা উত্তরে এনসিপির প্রার্থী আসিফ, দক্ষিণে পাটওয়ারী-জাতীয় রাজনীতিতে ১১ দলীয় ঐক্যের অংশীদার হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজেদের শক্তি নিয়েই মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে কৌশল বদলেছে এনসিপি। জোটসঙ্গী জামায়াতের সঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) সমঝোতা না হওয়ায় এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। এর অংশ হিসেবে ঢাকার দুই সিটিতে প্রার্থীও পরিবর্তন করা হচ্ছে।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) মেয়র পদে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দক্ষিণে দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও দলের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
এর আগে গত ২৯ মার্চ স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির জরুরি সংবাদ সম্মেলনে পাঁচ সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে এনসিপি। তখন ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং উত্তরে দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল
ইসলাম আদীবকে প্রার্থী করার কথা জানানো হয়। পরে রাজনৈতিক পরিষদের বৈঠকে প্রার্থী পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয় দলটি।এরপর মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি, ভোটারদের সম্ভাব্য সমর্থন ও প্রার্থীদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে একাধিক সমীক্ষা চালানো হয়। এসব মূল্যায়নের ভিত্তিতেই ঢাকার দুই সিটিতে নতুন প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
সূত্র জানায়, গত ৩ সেপ্টেম্বর এনসিপির বৈঠকে ঢাকার দুই সিটিতে নতুন করে প্রার্থী বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়। এর অন্যতম কারণ জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা না হওয়া। জাতীয় নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশ নিলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রাজধানীর দুই সিটিতে আলাদাভাবে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে এনসিপি ও জামায়াত। ফলে এবার জোটের দুই শরিকের প্রার্থীদের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে হচ্ছে।
প্রার্থী পরিবর্তনের সঙ্গে দুই নেতার ভোটার এলাকাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে ঢাকা দক্ষিণের ধানমন্ডি এলাকার ভোটার ছিলেন আসিফ মাহমুদ। সম্প্রতি তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আফতাবনগর এলাকার ভোটার হয়েছেন। অন্যদিকে উত্তরা এলাকার ভোটার নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এখন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার।
এনসিপির পক্ষ থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ফরম-১৩ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ভোটার এলাকা পরিবর্তন করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই ও নথিপত্র পরীক্ষার পর নির্বাচন কমিশন আবেদন অনুমোদন করেছে।
এনসিপির কৌশল পরিবর্তনের পেছনে জামায়াতের দক্ষিণ সিটিতে নিজস্ব প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ঢাকা দক্ষিণে ডাকসুর সাবেক সহসভাপতি সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করার প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত। এনসিপির প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল দক্ষিণে আসিফ মাহমুদকে প্রার্থী করে জোটগত সমঝোতার মাধ্যমে জামায়াতের সমর্থন নেওয়া। কিন্তু জামায়াত নিজেদের প্রার্থী দেওয়ার অবস্থানে অনড় থাকায় সেই পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা হয়।
এনসিপির একাধিক নেতা জানান, দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী করার পেছনে ভোটের হিসাবও রয়েছে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় তিনি জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সহযোগিতা পেয়েছিলেন। সেই রাজনৈতিক যোগাযোগ ও পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ সিটিতে জামায়াতের ভোটারদের একটি অংশকে নিজের দিকে টানতে চায় এনসিপি।
এ ছাড়া জুলাই-পরবর্তী সময়ে তরুণ ভোটারদের মধ্যে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর যে পরিচিতি তৈরি হয়েছে, সেটিও কাজে লাগাতে চায় দলটি। এনসিপির নেতাদের ধারণা, তার প্রার্থিতা তরুণ ও পরিবর্তনপন্থী ভোটারদের একটি অংশকে আকৃষ্ট করতে পারে।
অন্যদিকে আসিফ মাহমুদকে উত্তর সিটিতে প্রার্থী করার সিদ্ধান্তও কৌশলগত। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১০ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগ্রহ দেখিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন ফরম নিয়েছিলেন তিনি। পরে এনসিপিতে যোগ দেন। এবার তাকে উত্তর সিটিতে প্রার্থী করে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনী এলাকায় দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা ও জনপ্রিয়তা যাচাই করতে চায় এনসিপি।
এদিকে ঢাকা উত্তরে জামায়াতের মহানগর আমির সেলিম উদ্দিনকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে ঢাকার দুই সিটিতেই এনসিপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা মুখোমুখি হলে দুই দলের সাংগঠনিক শক্তি, ভোটব্যাংক ও জনপ্রিয়তার বাস্তব চিত্রও স্পষ্ট হতে পারে।
তবে স্থানীয় নির্বাচনে আলাদা লড়াই হলেও জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক ঐক্য অটুট থাকবে বলে জানিয়েছেন ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল হালিম বলেন, ১১ দলীয় জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শরিক দলগুলো এককভাবে অংশ নেবে। তাই সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যে প্রভাব পড়বে না বলে তিনি আশা করেন।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, ‘এনসিপি আপাতত এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রার্থীদের পরিচিত করা এবং সাংগঠনিক অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা চলছে। তবে তফসিল ঘোষণার আগে বা পরে যদি দেখা যায়, সমঝোতা করলে জয়ের সম্ভাবনা বাড়বে, তখন সমঝোতা হতে পারে। এখনই এ বিষয়ে চূড়ান্ত কিছু বলা যাচ্ছে না।’
জোটের আরেক শরিক দল এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান ভূঁইয়া মঞ্জু বলেন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন স্থানীয় পরিষদে নির্বাচন করতে আগ্রহী নেতাদের ইতিমধ্যে দলীয় সমর্থন ও ‘গ্রিন সিগন্যাল’ দেওয়া হয়েছে। তারাও এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে চান। তবে এ নিয়ে জোটে ভাঙনের আশঙ্কা নেই, যদিও কিছুটা টানাপোড়েন রয়েছে।সংগৃহীত ছবি

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :