ডেইলি খবর ডেস্ক: মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির দলীয় কাঠামো, সরকার এবং সংসদীয় রাজনীতিতে একসঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে দলের মহাসচিব পদ নিয়ে। ফখরুল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলে তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নামই সবচেয়ে জোরালোভাবে সামনে এসেছে। তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক যোগাযোগ, দুঃসময়ে দলের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা এবং রাজপথের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতার কারণে রুহুল কবির রিজভীর প্রতি মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের আস্থার কথাও উঠে আসছে। তবে শেষ পর্যন্ত মহাসচিব বা ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব কে হবেন, সেইসিদ্ধান্ত দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানই নেবেন বলে মনে করছেন নেতারা।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন চূড়ান্ত ধরেই দলটির ভেতরে-বাইরে বিএনপির পরবর্তী মহাসচিবের পদে পরিবর্তনের পাশাপাশি স্থায়ী কমিটি, মন্ত্রিসভা এবং তার নির্বাচনী আসনেও একাধিক পরিবর্তন আসতে পারে বলে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে বিএনপির একাধিক স্থায়ী কমিটির সদস্য আমাদের সময়কে বলছেন, ‘যদি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হন; রাষ্ট্রপতি হলেই দলের মহাসচিব ও সরকারে পরিবর্তন আনতে হবেইÑ এমনটিও নয়। বরং এই মুহূর্তে শুধু দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এর বাইরে দল ও সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। কারণ নভেম্বরের শেষ দিকে অথবা ডিসেম্বরের শুরুতে দলের জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সম্ভাবনাই বেশি। একইসঙ্গে রাষ্ট্রপতি হওয়ার কারণে বিএনপির স্থায়ী কমিটিতেও একটি পদ শূন্য হবে। এর আগেও মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্পিকার হওয়ায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির একটি পদ শূন্য হয়। ফলে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদ শূন্য হবে। তাই মহাসচিব পদটি ছাড়াও স্থায়ী কমিটির শূন্য পদ পূরণে কয়েকজন নেতার অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা থাকছে। তাদের মধ্যে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু, মোহাম্মদ শাহজাহান, শামসুজ্জামান দুদু, বরকত উল্লাহ বুলু, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান, জয়নুল আবদীন ফারুক, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নামও রয়েছে। যদিও দলটির জাতীয় কাউন্সিলের আগে স্থায়ী কমিটির শূন্যপদ পূরণে আপাতত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই বিএনপিতে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু আমাদের সময়কে বলেন, তুলনামূলক তরুণ কেউ মহাসচিব পদে আসারও সম্ভাবনা রয়েছে। কর্মিবান্ধব নেতাকেই এ পদের জন্য বেশি প্রাধান্য দেওয়া হবে। মূলত আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পছন্দ এবং তার সঙ্গে অ্যাডজাস্ট হতে পারেন এমন কাউকেই মহাসচিব করা হতে পারে বলে আমার ধারণা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। যাকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হয়েছে। এ ছাড়া মহাসচিব হওয়ার আলোচনায় রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ও আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও তথ্য সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল। যদিও এর মধ্যে তিনজনই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে সরকারে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সে তুলনায় হাবিব উন নবী খান সোহেলের ব্যস্ততা কম। ফলে সবকিছু মিলিয়ে মির্জা ফখরুলের উত্তরসূরি হিসাবে রিজভীর নামই সামনে আসছে। এর পরের নামটি হাবিব উন নবী খান সোহেলের। একইসঙ্গে বিএনপিতে আলোচনা আছে, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। দলের মহাসচিবের দায়িত্ব তখন শুধু সাংগঠনিক বিষয় নয়, সরকারের সঙ্গে দলীয় সমন্বয় এবং মাঠপর্যায়ের রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আমাদের সময়কে বলেন, আমি দলের প্রতি শতভাগ আনুগত্য প্রকাশ করেই কাজ করছি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশেই দলের নেতাকর্মীদের পাশে এখনও অব্যাহতভাবে আছি। আমি কিছুই জানি না; দল আমাকে যেভাবে দায়িত্ব দেবেন, সেটা বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং দলের নীতিনির্ধারকরাই ঠিক করবেন।
এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হলে তার মন্ত্রিত্বও শূন্য হবে। ফলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে নতুন মুখ আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বর্তমান প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমকে পূর্ণ মন্ত্রী করা হতে পারে। পাশাপাশি বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নামও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সম্ভাবনায় থাকছে। তবে মন্ত্রিসভায় এ ধরনের পরিবর্তনের বিষয়ে অনানুষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার পরই মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্ট হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তার সংসদীয় আসনও শূন্য হবে। ফলে সেখানে উপনির্বাচন দিতে হবে; সেই উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী কে হচ্ছেন, তা নিয়েও দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মির্জা ফখরুলের পরিবারের কোনো সদস্যকে ওই আসনে প্রার্থী করা হবে কিনা, নাকি দলীয়ভাবে অন্য কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হবেÑ এ নিয়ে আলোচনা চলছে।
বিএনপির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা বলছেন, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে একই সঙ্গে দল, সরকার ও সংসদীয় রাজনীতিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আসবে। ফলে স্থায়ী কমিটির শূন্য পদ পূরণ, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নির্ধারণ, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বণ্টন এবং ঠাকুরগাঁওয়ের আসনে উপনির্বাচনের প্রার্থী নির্বাচনÑ সবকিছুই দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে এসব পরিবর্তনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বই নেবেন। মূলত রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হলে দলীয় ও মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলোও পর্যায়ক্রমে সামনে আসবে বলে মনে করছেন নেতারা।
তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, রুহুল কবির রিজভীর প্রতি তাদের বড় আস্থার জায়গা হলো তার সাংগঠনিক যোগাযোগ। তিনি দেশের বিভিন্ন জেলার নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছেন। দলের যে কোনো সংকটময় মুহূর্তে অভিভাবক হিসাবে কাজ করেছেন তিনি। তাই ভারপ্রাপ্ত বলেন, আর মহাসচিব বলেন, তাকেই যোগ্য মনে করা হচ্ছে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আবদুস সালাম আজাদ আমাদের সময়কে বলেন, মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদের সম্ভাবনা বেশি। সম্ভাবনার কথা বলছি এজন্য, বিগত ১৭ বছর ধরে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখে রাজপথে নেতৃত্ব যারা দিয়েছেন, তাদের মধ্যে রুহুল কবির রিজভীর অবদান সবচেয়ে বেশি। দলের প্রতি ও দেশের প্রতি তার নিবেদিত ত্যাগ এটাই প্রমাণ করে, দেশে যখন বিএনপির পক্ষে কথা বলতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল, তখন একমাত্র রুহুল কবির রিজভীর কণ্ঠ ছিল সোচ্চার। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দল ও দলের অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের, এমনকি দেশের সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে অনুপ্রেরণা হিসেবে ছিল।
এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলেই যে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে রুহুল কবির রিজভীই হচ্ছেনÑ এমন আলোচনার পাশাপাশি দলের চেয়ারম্যান যে কাউকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব দিতে পারেন। দলের গঠনতন্ত্রের ক্ষমতাবলে চেয়ারম্যানের সেই এখতিয়ার আছে।
বিএনপির (কুমিল্লা বিভাগ) সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া আমাদের সময়কে বলেন, ‘বিএনপি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। তাই এ দলের মহাসচিব একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হবেনÑ এটাই প্রত্যাশা করি। এ ক্ষেত্রে দলের যে নেতারা দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের পাশে ছিল, তাদের মধ্য থেকেই মহাসচিব করা হলে ভালো হবে।’
নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর আলম (ভিপি জাহাঙ্গীর) আমাদের সময়কে বলেন, ‘রুহুল কবির রিজভী দলের জন্য ‘ফুলটাইম’ রাজনীতিবিদ। ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পর্যন্ত পুরো রাজনৈতিক জীবনে ত্যাগের শেষ নেই; বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে রুহুল কবির রিজভীর আহমেদের যে সম্পর্ক, সেই বিবেচনায় তিনি যদি মহাসচিবের দায়িত্ব পান, তাহলে তৃণমূলে দলের সাংগঠনিক অবস্থা আরও গতিশীল ও শক্তিশালী হবে। এ ছাড়া পদাধিকারবলেও তিনিই এই পদের দাবিদার।’
এদিকে বিএনপির অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে দলের প্রথম যুগ্ম মহাসচিবকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার পর পরবর্তী সময়ে তাকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা হয়েছে। এক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দাযয়িত্ব দেওয়া হতে পারে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে। পরবর্তী সময়ে দলের জাতীয় কাউন্সিলে ভারমুক্ত করা হতে পারে, না-ও হতে পারে বলেও জানা গেছে।সুত্র-আমাদের সময়

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :