নিয়াজ মাহমুদ: বাংলাদেশ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, যা শুধু জনস্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং রাষ্ট্রের সক্ষমতা, অগ্রাধিকার এবং নৈতিক দায়বদ্ধতারও কঠিন পরীক্ষা। ২০২৬ সালের আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগে, একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে চার শতাধিক শিশুর মৃত্যু, এমন খবর কোনো সভ্য সমাজের জন্যই স্বস্তিদায়ক হতে পারে না। অথচ দেশের মানুষ এখন প্রতিদিন শুনছে নতুন মৃত্যু, নতুন সংক্রমণ, নতুন আতঙ্কের সংবাদ।সংবাদ বুলেটিন
এই লেখা যখন লিখছি, গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৩ জনের হাম নিশ্চিত ছিল, বাকিরা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। দুই মাসে মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ৪২৪-এ। আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে প্রতিদিন নতুন রেকর্ড ছুঁচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে ভিড়, পরিবারগুলোর অসহায় কান্না, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনরোষ—সব মিলিয়ে দেশের “পাবলিক পালস” যে ভালো নেই, তা স্পষ্ট।এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, এটিকে রাজনৈতিক বাকযুদ্ধের উপকরণ না বানিয়ে, জাতীয় জরুরি অবস্থা হিসেবে দেখা। কারণ হাম কোনো দল দেখে আক্রমণ করে না। এটি ধনী-গরিব, শহর-গ্রাম, সরকার-বিরোধী, কাউকে ছাড় দেয় না। ফলে এই সংকট মোকাবিলায়ও দরকার সর্বদলীয়, সর্বাত্মক ও সমন্বিত উদ্যোগ।
হাম নতুন রোগ নয়। পৃথিবী বহু আগেই এর প্রতিষেধক আবিষ্কার করেছে। ডঐঙ এবং ঈউঈ বহু বছর ধরে বলে আসছে, দুই ডোজ এমআর বা এমএমআর টিকা নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হাম প্রতিরোধ সম্ভব। অর্থাৎ, এই মৃত্যুগুলোর বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য ছিল। এ কারণেই মানুষের ক্ষোভ এত তীব্র। কারণ মানুষ মনে করছে—শিশুগুলো কেবল ভাইরাসে নয়, অব্যবস্থাপনায়ও মারা গেছে।রাজনৈতিক সংবাদ
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—টিকার সংকট কেন তৈরি হলো? যদি টিকা সরবরাহে ঘাটতি থেকে থাকে, তাহলে আগেভাগে সতর্কতা নেওয়া হয়নি কেন? যদি কোল্ড-চেইন ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা থাকে, তবে তা এতদিন নজরে আসেনি কেন? যদি মাঠপর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচিতে শৈথিল্য থাকে, তাহলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি কেন?
সরকার এখন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা বলছে। এটি অবশ্যই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। তবে মানুষ কেবল তদন্তের ঘোষণা শুনতে চায় না; তারা ফলও দেখতে চায়। কারণ অতীতে বহু সংকটে তদন্ত কমিটি হয়েছে, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন খুব কমই এসেছে। ফলে এবার জনগণ জানতে চাইবে—কার গাফিলতিতে এই পরিস্থিতি তৈরি হলো, এবং ভবিষ্যতে যেন এমন না হয় তার জন্য কী কাঠামোগত সংস্কার নেওয়া হচ্ছে।তবে দায় নির্ধারণের আলোচনা যত জরুরি, তার চেয়েও জরুরি এখন জীবন বাঁচানো। এই মুহূর্তে সরকারের প্রতিটি অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে থাকা উচিত শিশুদের চিকিৎসা ও সুরক্ষা। স্বাস্থ্য বিভাগকে জরুরি ভিত্তিতে দেশের বড় হাসপাতালগুলোতে বিশেষ হাম ইউনিট চালু করতে হবে। শুধু শয্যা বাড়ালেই হবে না; সেখানে অক্সিজেন, আইসিইউ সাপোর্ট, প্রশিক্ষিত জনবল, শিশু বিশেষজ্ঞ এবং পর্যাপ্ত ওষুধ নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশে এখনও অনেক জেলা হাসপাতালে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত ক্রিটিক্যাল কেয়ার সুবিধা নেই। ফলে গুরুতর রোগীরা ঢাকামুখী হয়। এতে সময় নষ্ট হয়, ঝুঁকি বাড়ে। তাই বিভাগীয় পর্যায়ে বিশেষায়িত রেফারেল ইউনিট গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে স্পেশাল অ্যাম্বুলেন্স, এমনকি এয়ার অ্যাম্বুলেন্স বা হেলিকপ্টারও প্রস্তুত রাখতে হবে—বিশেষত দুর্গম এলাকার শিশুদের দ্রুত স্থানান্তরের জন্য। একটি শিশুর জীবনও যেন পরিবহন সংকট বা চিকিৎসা বিলম্বে হারিয়ে না যায়।
হামের চিকিৎসায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভিটামিন-এ সাপোর্ট এবং অপুষ্টি মোকাবিলা। বাংলাদেশে এখনও বহু শিশু অপুষ্টিতে ভোগে। অপুষ্ট শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় হাম তাদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। তাই শুধু হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা নয়, কমিউনিটি পর্যায়েও পুষ্টি সহায়তা জরুরি।একইসঙ্গে দরকার আক্রমণাত্মক টিকাদান কর্মসূচি। “মিসড” বা “জিরো-ডোজ” শিশুদের খুঁজে বের করতে হবে। শহরের বস্তি, দুর্গম চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা এবং ভাসমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিশেষ অভিযান চালানো জরুরি। স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা, কমিউনিটি সেন্টার, সব জায়গাকে টিকা সচেতনতার প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে হবে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকা নিয়ে নানা বিভ্রান্তি ও গুজবও বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভ্যাকসিনবিরোধী অপপ্রচার অনেক অভিভাবককে দ্বিধাগ্রস্ত করেছে। এই ভুল তথ্য মোকাবিলায় সরকারকে আরও কার্যকর যোগাযোগ কৌশল নিতে হবে। চিকিৎসক, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, সবাইকে যুক্ত করে বিশ্বাসযোগ্য বার্তা ছড়াতে হবে যে হাম টিকা নিরাপদ, কার্যকর এবং জীবনরক্ষাকারী।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, স্বাস্থ্যখাতকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো ও বাজেটের দিক থেকে অবহেলা করেছি। বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের তুলনায় জনস্বাস্থ্য বরাবরই কম অগ্রাধিকার পেয়েছে। কিন্তু একটি হাম সংকট দেখিয়ে দিল, হাসপাতালের বেড, প্রশিক্ষিত নার্স, ল্যাব সুবিধা, টিকা সরবরাহ—এসবই আসলে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। একটি দেশের শক্তি শুধু সেতু বা ফ্লাইওভারে নয়; তার শিশু কতটা নিরাপদ, তাতেও নির্ভর করে।
সিপিবি সরকারের ব্যর্থতা ও অবহেলার অভিযোগ তুলেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের সমালোচনা প্রত্যাশিত। কিন্তু এই সংকটে শুধু রাজনৈতিক বিবৃতি দিয়ে দায় শেষ হয় না। বিরোধী দলগুলোরও উচিত মাঠপর্যায়ে সচেতনতা ও সহায়তামূলক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া। কারণ জাতীয় দুর্যোগে রাজনৈতিক বিভাজন নয়, সামাজিক সংহতিই বেশি প্রয়োজন।রাজনৈতিক সংবাদ
গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আতঙ্ক ছড়ানো নয়, তথ্যভিত্তিক সচেতনতা তৈরি করাই এখন মিডিয়ার প্রধান কাজ হওয়া উচিত। কত মৃত্যু হলো, সেটি যেমন সংবাদ; তেমনি কোথায় টিকা পাওয়া যাচ্ছে, কোন উপসর্গে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে, কীভাবে সংক্রমণ কমানো যায়—এসব তথ্যও সমান জরুরি।সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের মনে রাখতে হবে, এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যা একটি পরিবার, একটি শিশুর অসমাপ্ত জীবন, এক মায়ের কান্না, এক বাবার অসহায়তা। যে শিশুটি মারা গেছে, সে হয়তো স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছিল, হয়তো তার মা তাকে নিয়ে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছিলেন। সেই জীবনগুলোকে আমরা কেবল প্রশাসনিক ভাষায় “ডেটা” হিসেবে দেখতে পারি না।
বাংলাদেশ অতীতে বহু জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সফল হয়েছে। টিকাদান কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে। তাই এই সংকট মোকাবিলাও অসম্ভব নয়। দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দ্রুত সিদ্ধান্ত, সুশাসন এবং বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ।এখন প্রশ্ন একটাই—রাষ্ট্র কি সত্যিই শিশুদের জীবনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে? যদি দেয়, তাহলে এই মুহূর্তেই জরুরি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সর্বাত্মক টিকাদান অভিযান, হাসপাতাল প্রস্তুতি এবং জবাবদিহিমূলক তদন্ত একসঙ্গে শুরু করতে হবে।কারণ ইতিহাস খুব নির্মমভাবে মনে রাখে, একটি দেশ তার শিশুদের কতটা রক্ষা করতে পেরেছিল। সংগৃহীত, নিয়াজ মাহমুদ,লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :