মোস্তাক মোবারকী: আওয়ামী লীগ একটি আন্দোলন সংগ্রামের দল। এই দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের রয়েছে আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস। শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ নেত্রী থেকে সর্বদলীয় নেতা হয়ে নিজেকে সর্বে সর্বা মনে করেই আজ এই দুর্গতি। তার এবং তার দলের এই করুন অবস্থার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী হাসান মাহমুদ ও ওবায়দুল কাদের। হাসিনা সরকারের এই দুর্গতির কারণ হিসেবে আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ের পৃথক দুটি উদাহরণ দিলাম। প্রথমত : শরীয়তপুর জেলাটি আওয়ামী অধ্যুষিত এলাকার মধ্যে অন্যতম। শেখ হাসিনা খোকা শিকদার নামে একজন এসএসসি পাশ ব্যবসায়ীকে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি করেছেন। এই সভাপতি স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস করেন এবং মাঝে মধ্যে দু’একদিনের জন্য এলাকায় যান। তার নেতৃত্বাধী কমিটিতে জেলার সাবেক সভাপতি আবদুর রব মুন্সী, সাবেক এমপি মজিবর মাস্টার, সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জেলার পৌর মেয়র নুরু কোতোয়াল, সাবেক সহ-সভাপতি মোবারক আলী শিকদার ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফজল মাষ্টারকে জেলা কমিটির সদস্যও রাখেনি। শেখ হাসিনা সেই খোকা শিকদারকেই জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি এবং একই সঙ্গে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করেছেন। এ ধরনের নেতা ও জেলার তিন এমপির কারণে শরীয়তপুর বাসী পদ্মা সেতুর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। পদ্মা সেতু পাড় হয়ে একশ’ কিলোমিটার পথ বাগেরহাট যাওয়া যায় মাত্র আধা ঘন্টায়। আর শরীয়তপুর পঁচিশ কিলোমিটার পথ ঝুকি নিয়ে যেতে লাগে প্রায় এক ঘন্টা। এমপিরা এলাকার উন্নয়নের চেয়ে নিজেদের উন্নয়নেই বেশি সময় ব্যয় করতেন। আর সেকারনেই জেলার কোন উন্নতি হয়নি।
দ্বিতীয়ত : উনিশশ’ সাতাত্তর সালে বংশালের সংবাদ অফিসে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সাংবাদিকদের নিয়ে একটি ফোরাম গঠন করা হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যা কান্ডের নিউক্লিয়াস সদস্য তাহের ঠাকুর, মোহাম্মদ আলী, এরশাদ মজুমদার ও আতিকুর রহমানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন ইকবাল সোবহান চৌধুরী। সংবাদে ফোরামের তিনটি বৈঠক করার পর আতিকুর রহমান কৌশলে বজলু ভাইও সন্তোষদাকে বলে তার আরামবাগের বাসায় ফোরাম সদস্যদের চায়ের দাওয়াত দেন। সেখানেই ফোরামের পরপর তিনটি বৈঠক হয়। এসব মিটিং পরিচালনা করতেন অবজারভার ইউনিট প্রধান ইকবাল সোবহান চৌধুরী। এভাবে আরামবাগ ও হাজি জহিরের তোপখানা রোডের বাসায় ফোরাম মিটিং হয়। একবার ফেরাম মিটিং এ ইত্তেফাকের দু’জন সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে আফ্রো এশিয়ার মহান নেতা ও ফোরামের শীর্ষ নেতা ঘোষনা করেন। এর একজন মাওলানা মান্নানের সঙ্গে থেকে এবং ভারতে না গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাগিয়ে নিয়েছেন। আরেকজন শেখ হাসিনার পুরো আমলেই একনম্বর গ্রেডে চাকুরী করেছেন। পর্যায়ক্রমে ফোরামের এই শীর্ষনেতা মুক্তিযুদ্ধের শতভাগ পক্ষের নেতা আক্রাম হোসেন খান, আক্তার আহমেদ খান, ওয়াহিদুর রশিদ মুরাদ ও নাজিমুদ্দিন মানিক সহ ত্যাগী নেতাদের ফোরাম থেকে বিতাড়িত করে তার বশংবদ হাইব্রিডদের বিভিন্ন পদ পজিশনে বসানোর ব্যবস্থা করেছেন। এই শীর্ষনেতা প্রেসক্লাব দখল করার পর হারুনুররর্শিদ ও রবীন্দ্র চন্দ্র ত্রীবেদী নামে দু’জন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধার সদস্য পদ বাতিল করেছেন। ডিইউজের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সম্পাদকরা ইউনিয়নের সদস্য থাকতে পারেন না। কিন্তু এই শীর্ষ নেতা একটি ইংরেজী দৈনিকের সম্পাদক হয়েও ইউনিয়নের সদস্য থাকছেন। তার কারণে অন্ততঃ ত্রিশটি পত্রিকার সম্পাদক ইউনিয়নের সদস্য আছেন। প্রেস ক্লাব দখলের পর কয়েকটি বড় ব্যর্থতা লক্ষনীয়। একটি হলো, কিছু অসৎ লোককে প্রেস ক্লাব কমিটির নেতা বানিয়েছেন। তাদের কেউ কেউ অর্থের বিনীময়ে অসাংবাদিকদের সদস্য ও করেছেন। আরেকটি হলো, ঘোষনা দেয়ার পরেও দীর্ঘ পনের বছরেও প্রেস ক্লাব বহুতল ভবন নির্মান করতে পারেনি। বহু বছর ধরে প্রেস ক্লাব বাস স্টপেজ হিসেবে পরিচিত। এটিকে আবার সচিবলয়ের সেকেন্ড গেট ও বলতো। কিন্তু স্বীকৃত প্রেস ক্লাব স্টপেজকে মেট্রো রেল স্টেশন করতে পারেনি। ফোরামের দুর্দিনে মাহমুদ হাসান ও রেজায়ানুল হক রাজা প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে পাশ করেছেন। অথচ ক্লাব দখল করার পর ক্লিন ইমেজের এই দুই নেতাকে পাত্তাই দেওয়া হয়নি। শীর্ষ নেতার একক সুপারিশে গত পনের বছরে প্রায় একশ’ সাংবাদিককে প্রধান মন্ত্রীর সফরসঙ্গী করা হয়েছে। অথচ শতভাগ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কোন সাংবাদিককে সফরসঙ্গী করা হয়ানি। র্শীষ নেতার মাইম্যান সরকারের বড়পদধারী বিক্রমপুর অঞ্চলের একজন সরকারী গাড়ি রেখে প্রেসক্লাবে আড্ডা দিচ্ছিলেন। এসময় ত্যাগী প্রবীন নেতা এম.এ করিম প্রেসক্লাবের গেইটে মাথা ঘুরে পড়ে ছটফট করছিলেন। আমি, রহমান খান ও চপল বাশারের ছেলে আকুতি মিনতি করেও হাসপাতালে নেওয়ার জন্য ওই নেতার গাড়িটি পাইনি।ফলে একঘন্টা ছটফট করে গেইটেই করিম ভাইয়ের মৃত্যু হয়। শীর্ষনেতার মাইমেন এই নেতা সরকারী একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব থেকে প্রায় বারোজন আত্মীয়-স্বজনকে অবৈধভাবে চাকুরী দিয়ে পদোন্নতি দিয়েছেন। অথচ সেখানে কর্মরত অন্য সাংবাদিকদের নিয়মিত সুযোগ-সুবিধাও দেননি। বর্তমানে এই নেতার বিরুদ্ধে দুদকে অনেক অনিয়ম ও শত কোটি টাকা আত্মসাত ও লোপাটের তদন্ত চলছে। প্রবীন সাংবাদিক শহীদ হাসান অসুস্থ ছিলেন। চিকিৎসার সহযোগিতার জন্য কল্যাণ ট্রাস্টে আবেদন করে নির্বাচিত এক বড় নেতাকে আমি অনুরোধ করেছিলাম। তিনমাস পরে বিনা চিকিৎসায় শহীদ হাসান মারা যান। এই হলো আমাদের মহান পেশার শীর্ষ নেতার অনুসারী হাইব্রীডদের কান্ড।
শুধু সাংবাদিকদের মতোই নয়। প্রতিটি পেশাজীবি, সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হাইব্রিডে ভরে গেছে। শেখ হাসিনা ত্যাগী নেতা কর্মীদের চেয়ে ব্যক্তিগত পছন্দের লোকদের সুযোগ সুবিধা বেশি দিতেন। তার পেছনে কিছু রাজনৈতিক কর্মী ও পেশাজীবী ঘুর ঘুর করে তার পদলেহন করত। এসব করেই তাদের অনেকেই আখের গুছিয়েছেন। এই হাই ব্রীডদের কারনে ত্যাগী ও সৎ নেতা কর্মীরা সংগঠন থেকে হারিয়ে গেছেন।
॥ মোস্তাক মোবারকী-সিনিয়র সাংবাদিক ॥

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :