রবিবার, ০১ মার্চ, ২০২৬, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩২

উন্নতি, তুমি আর কত উন্নত হবে

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৬, ১০:১৮ পিএম

উন্নতি, তুমি আর কত উন্নত হবে

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: উন্নতি তো হচ্ছেই, অহরহ এবং অপ্রতিরোধ্য গতিতেই। বাংলাদেশের  রাজধানী ঢাকা শহরের জনসংখ্যা এখন নাকি দাঁড়িয়েছে তিন কোটি ছেষট্টি লাখে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর এখন আমাদের এই আদরের ঢাকা। প্রথম স্থানে আছে জাকার্তা।
তবে জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, ঢাকা যেভাবে উন্নতি করছে তাতে ২০৫০ সালের ভিতর প্রথম স্থানটিই দখল করে নেবে। তার লক্ষণ তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন বিকেন্দ্রীকরণ ঘটাচ্ছে না, উল্টো কেন্দ্রীকরণকে অকাতরে সহায়তা জোগাচ্ছে। সবকিছুই এখন ঢাকাতে, মফস্বলে অর্থনৈতিক কাজকর্ম সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে, মানুষ ছুটছে ঢাকার দিকে।
কুড়িল বস্তিতে আগুন লাগা নতুন কোনো ঘটনা নয়। নিত্যনতুনভাবেই কাণ্ডটি ঘটেছে। আশা করা যায় ভবিষ্যতেও ঘটবে এবং কিছুতেই থামবে না-যতক্ষণ পর্যন্ত বস্তিটির উচ্ছেদ ঘটিয়ে সেখানে উঁচু ও উন্নত মানের দালানকোঠা ওঠার ক্ষেত্রপ্রস্তুতি সমাপ্ত না হচ্ছে। সাবেক বস্তি এলাকাজুড়ে উন্নতি তখন ঝলমল করবে।
শপিং মল, রেস্টুরেন্ট ও সাজপোশাকের দোকানের কোনো প্রকার কমতি ঘটবে না। বস্তি নিশ্চিহ্ন হলে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুহারা হবে। তাই বলে তারা যে ঢাকা ছেড়ে দৌড়ে গ্রামে গিয়ে আশ্রয় খুঁজবে তা নয়, গ্রামে কাজের ও আশ্রয়ের কোনো আশা নেই; তারা ঢাকাতেই থাকবে, নতুন কোনো বস্তিতে।
পত্রিকায় দেখলাম খেলাপি ঋণ গত এক বছরে দ্বিগুণ হয়েছে। বস্তি পুড়ে ছারখার হওয়ার মতো সে-ও তো একটা উন্নতি, তাই না? বিশ্বব্যাংকের দেওয়া তথ্য জানাচ্ছে এবং আমরাও এতটা দৃষ্টিহীন নই যে দেখতে পাব না, বাংলাদেশে নির্মম গতিতে বৈষম্য বাড়ছে।
সহিংসতাও কমছে না; বেড়েই চলছে। পারিবারিক সহিংসতাও নিরন্তর বৃদ্ধির পথে। তবে সহিংসতার ধরনে কিছু উন্নতি দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকার কলাবাগানে এক ভদ্রলোক যেমনটা দেখিয়েছেন। নিজের স্ত্রীকে হত্যা অন্যরাও কেউ কেউ করে থাকেন, তবে ইনি স্ত্রীকে হত্যা করে বনেবাদাড়ে বা পানিতে ফেলে দিয়ে আসেননি, স্বগৃহে ডিপ ফ্রিজের ভিতর খাবারদাবারের আড়ালে সযত্নে রেখে দিয়েছিলেন। হত্যার কারণটিও স্বামী-স্ত্রীতে কলহ শুধু নয়, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধও। সেটাই মনে হয় প্রধান। স্ত্রীর আপনজনরা দাবি করেছেন হত্যাকারী স্বামী শ্বশুরবাড়ি থেকে দশ কাঠা জমি আদায়ের জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। স্ত্রী গররাজি হওয়াতেই ক্রোধের বশবর্তী হয়ে প্রাণহরণ। ওদিকে স্বামীর দাবি স্ত্রী পরকীয়াতে লিপ্ত হয়ে স্বামীর কষ্টার্জিত টাকাকড়ি তার প্রেমিককে দিয়ে দেওয়ার অভিসন্ধিতে নিয়োজিত ছিলেন। তাদের দুটি সন্তান রয়েছে, যাদের বয়স যথাক্রমে ১৭ ও ১৪। অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবন কমপক্ষে ১৯ বছরের পুরনো।
একদিকে বাড়লে অন্যদিকে তো কমবেই। অপরাধ উন্নত হলে, নিরাপত্তা নিম্নগামী না হয়ে পারে না। সেটা অবধারিত হয়ে উঠেছে। অন্য অনেক ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। নিরাপত্তা ঘরে নেই, পথেও নেই। আগেও ছিল না। এখন যে কমেছে তা নয়। বারবার খবর পাওয়া যায়। প্রকাশ্য রাজপথে জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক শরিফ ওসমান হাদিকে অটোরিকশায় চলন্ত অবস্থায় মোটরসাইকেল আরোহী দুই দুর্বৃত্ত খুব কাছে থেকে গুলি করে পালিয়ে গেছে। আবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় নিজেদের বাসগৃহে খণ্ডকালীন কাজের বুয়ার সুদক্ষ অস্ত্রাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন এক গৃহবধূ ও তাঁর স্কুলছাত্রী একমাত্র কন্যা। কারণ নাকি চুরি। তবে তেমন কোনো সম্পদ হাতিয়ে নিতে পারেনি। ছদ্মপরিচয়ে চাকরি নেওয়া, চার দিনের মাথায় হত্যাকাণ্ড ঘটানো, গ্লাভস পরে বিশেষ ধরনের ছুরি ব্যবহার, হত্যাকাণ্ড শেষে নিহত স্কুলছাত্রীটির স্কুল ড্রেস পরে পিঠে তারই স্কুলব্যাগ ঝুলিয়ে পলায়ন-সবই অপরাধের ক্ষেত্রে উন্নতির নিদর্শন বৈকি। একটি গবেষণা বলছে দেশের ১১ শতাংশ কিশোর-কিশোরীর ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি; এবং তার বিপরীতে তথ্য এমন যে ৪০ শতাংশ কিশোরের এবং ৪৩ শতাংশ কিশোরীর শারীরিক সক্রিয়তা পর্যাপ্ত নয়। ওই গবেষণাই বলছে শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা কিশোরের সংখ্যা বাড়ছে, তবে নিষ্ক্রিয় কিশোরীর সংখ্যা কিন্তু কমছে। আমাদের উন্নয়নের বিশেষ বিশেষ অবদানের একটি হলো বৈষম্য বৃদ্ধি। সে অবদান যে নারী-পুরুষের ভেতর পার্থক্য করাটাকে খুবই পছন্দ করে, তার প্রমাণ কিশোর এবং কিশোরীদের ভিতর নিষ্ক্রিয়তা সৃষ্টির বেলাতেও অনুপস্থিত নয়। তবে এ খবরটা উপেক্ষা করা যাবে না যে দেশে ৮৬ শতাংশ শিশু কোনো না কোনোভাবে সহিংস আচরণের শিকার হচ্ছে।
ঢাকায় একটি বড় আকারের শিশুপার্ক ছিল। উন্নত করার তাগিদে সেটিকে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। সাত বছর ধরে উন্নয়ন তৎপরতার কোনো বিরাম নেই, কিন্তু শিশুরা সেখানে নিষিদ্ধ। ইতিমধ্যে অনেক শিশুই কৈশোরে উন্নীত হয়েছে; এবং শুধু যে ঢাকা শহরে তা নয়, বাংলাদেশজুড়েই শিশুরা খেলাধুলার জন্য জায়গা পাওয়া থেকে বঞ্চিত রয়েছে।
এইডস রোগটা উন্নত বিশ্বের বিশিষ্ট সৃষ্টি। অনুন্নত বাংলাদেশে অনেক রোগই ছিল, ওই অত্যাধুনিক রোগটি অজ্ঞাতই ছিল। কিন্তু সবাই উন্নত হবে আর বাংলাদেশ কী তা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে? না, দেখবে না। এবং দেখবে না যে তার লক্ষণ বিলক্ষণ দেখা যাচ্ছে। মিডিয়া বলছে এইডস রোগ অনেক আগেই বাংলাদেশে পৌঁছে গেছে। কেবল আসেনি, মিডিয়া এটাও জানাচ্ছে যে রোগীর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান।
কথাটা বারবারই বলতে হয় যে এসব উন্নতিই হচ্ছে পুঁজিবাদী ধারার। এতে অল্প মানুষ লাভবান হয়, অধিকাংশ মানুষকে বঞ্চিত করার মাধ্যমে। এই উন্নয়ন বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষকে অভাবগ্রস্ত করছে। তারা বেকার হচ্ছে। উৎপাটিত হচ্ছে। শিকার হচ্ছে অপরাধের। অবিরাম গণহত্যা চলছে। প্রকাশ্যে। ইসরায়েলের জায়ানবাদীরা করছে। সর্বোপরি রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি প্রাপ্তির আশায় জাতিসংঘের ব্যবস্থাপনায় জলবায়ু সম্মেলন হয়ে থাকে। প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়, কিন্তু প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয় না। কিছুদিন আগে ব্রাজিলে যে সম্মেলন হয় সেটাকে ব্যর্থ বলা ছাড়া উপায় নেই। ট্রাম্পের শাসনাধীন যুক্তরাষ্ট্র তো কোনো প্রতিনিধিই পাঠায়নি। ট্রাম্পের মতে, জলবায়ু সংকট সত্য নয়, এবং এ নিয়ে সম্মেলন করাটা প্রতারণা বৈ অন্য কিছু নয়। ভবিষ্যতের মানুষ (যদি টিকে থাকে) হাসবে যখন এসব খবর পড়বে। বিশ্বব্যাংকের দেওয়া তথ্য বলছে, বাংলাদেশের ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্বব্যাংক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সংরক্ষকের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান। তবু স্বীকার না করে পারছে না যে প্রবৃদ্ধির সুফল পেয়েছে ধনী মানুষ এবং তাতে বেড়েছে আয়বৈষম্য। সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে, কিন্তু তার সিংহভাগ চলে যাচ্ছে অপেক্ষাকৃত ধনী পরিবারের কাছে। শহরে কর্মসংস্থান একেবারেই স্থবির। তরুণেরা প্রায়-অর্ধেক কম মজুরিতে কাজ করছে।
দেশের ঋণখেলাপিরা ব্যাংক থেকে যে টাকা হাতিয়ে নেন, সেটা শিল্পোদ্যোগে বিনিয়োগ করবেন বলে নয়; মুখ্য উদ্দেশ্য থাকে বিদেশে পাচার করা। ওই কাজ যুগ যুগ ধরে ধারাবাহিক ও ক্রমবর্ধমানভাবে চলছিল। চব্বিশের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর প্রত্যাশা ছিল কমবে, উল্টো দেখেছি বৃদ্ধি কেবল যে অব্যাহত থেকেছে তা-ই নয়, এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ।
খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি দুঃসংবাদ বৈকি; তাই বলে সন্তান প্রজনন-বৃদ্ধির খবর যে সুসংবাদ তাও নিশ্চয়ই নয়। উন্নয়ন ওই ক্ষেত্রেও ঘটছে। উন্নত পুঁজিবাদী ইউরোপ, এমনকি প্রাচ্যের জাপান ও জনবহুল চীন যখন শিশু জন্মহার কমছে দেখে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, তখন আমরা তো মনে হয় বেখবরই আছি- জন্মহারের এই বৃদ্ধির বিষয়ে। বৃদ্ধির কারণও অবশ্য আমাদের অজানা থাকবার কথা নয়। প্রথম কারণ বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি। দ্বিতীয় কারণ পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে উদাসীনতা। নিরাপত্তাহীনতার বিবেচনায় বাবা-মা মেয়েদের দ্রুত বিয়ে দিয়ে দেন। আসলেই মেয়েরা মোটেই নিরাপদে নেই। থাকবার অবস্থা নেই। এমনিতেই রাষ্ট্র ও সমাজ পুরোমাত্রায় পিতৃতান্ত্রিক। তার ওপর পথেঘাটে তো বটেই, বিদ্যালয়ে, এমনকি স্বগৃহেও বেড়েছে যৌন নির্যাতনের শঙ্কা। আমাদের মেয়েরা ক্রীড়া ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মর্যাদা অর্জন করেছে। কিন্তু নিজেদের দলের ভিতরই যে তাদের যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়, এটা গালগল্প নয়, প্রমাণিত সত্য। মিডিয়া অনেক খবরই দেয়, দেয় যৌন হয়রানির খবরও। মিডিয়ার নারী-কর্মী বাইরের লোকদের দ্বারা নিগৃহীত হয়েছেন এমন খবরের সঙ্গে আমরা অপরিচিত নই। কিন্তু  কোনো কোনো মিডিয়ার অভ্যন্তরেও যে ক্ষমতাধর নষ্ট-ভ্রষ্টদের দ্বারা একই অপকর্ম চলছে, তার খবর আমরা রাখতাম না। জেনে বুক ভাঙা মর্মাহত হয়েছি। ওদিকে আবার পরিবার পরিকল্পনার ব্যাপারে সরকারি আগ্রহ বাড়ে তো নয়ই, বরং কমেছে। এর পেছনে প্রধান কারণ অবশ্য আমলাতান্ত্রিক ঔদাসীন্য। সরল ভাষায়, আমলাদের উৎসাহের অভাব। জন্মনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত আয়-উপার্জনের প্রতিশ্রুতি সংকীর্ণ। আর পথ যেখানে প্রশস্ত নয়, উৎসাহ তো সেখানে দুরন্ত হওয়ার কথা নয়। এবং এ ক্ষেত্রে সেটাই ঘটেছে।
তা খেলাধুলা, গানবাজনা পরে হবে, অনেক শিশুর জন্য তো বেঁচে থাকাটাই সমস্যা। দুটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যাক। গোপালগঞ্জ জেলার একজন কিশোরী মাতা তার ১০ দিনের কন্যাসন্তানটিকে হাওড়ের পানিতে নিক্ষেপ করে। কন্যার ভবিষ্যৎ নিয়ে কিশোরী মাতাটি নাকি অত্যন্ত দুশ্চিন্তায় ছিল। ছিল যে সেটা তো বোঝাই যায়, নইলে কী সে অমন কাজ করতে পারে? কিশোরী মাতাটি সার্বক্ষণিক দুশ্চিন্তার অবসান ঘটাতে চায় নিজের শিশুকন্যাটিকে হত্যা করে। কিন্তু হাজার হোক মা তো, তাই নিজেও ঝাঁপ দিয়েছিল পানিতে; সব যন্ত্রণার চিরতরে নিরাময় ঘটাবে এমন আশা নিয়ে। পারেনি। কন্যাশিশুটি ডুবে মারা গেছে, মাতাটি মরতে পারেনি। পানিতে কয়েকজন মানুষ মাছ ধরছিলেন, মাকে তারা উদ্ধার করেছেন।
প্রায় একই সময়ে রাজশাহীতে ঘটনা ঘটে ভিন্ন মাত্রায়। হত্যার নয় বটে, তবে চিরদিনের জন্য বিদায় করে দেওয়ার। সেখানে সদ্যোজাত একটি কন্যাসন্তানকে কারা যেন হাসপাতালে রেখে যায়। সঙ্গে প্লাস্টিকের ব্যাগে শিশুটির জন্য কিছু ওষুধপত্র ছিল। আর ছিল একটি চিরকুট; যাতে লেখা, আমি মুসলিম। আমি একজন হতভাগী। পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে বাচ্চাকে রেখে গেলাম। দয়া করে কেউ নিয়ে যাবেন। বাচ্চার জন্মতারিখ ৪ নভেম্বর ২০২৫।
‘আমি মুসলিম’ লেখার অর্থ সাম্প্রদায়িক বিবেচনায় যাতে সন্তানটিকে গ্রহণে দ্বিধা না ঘটে। চিরকুটে মাতাটি বলেছেন, তিনি পরিস্থিতির ‘স্বীকার’। আসলে বলতে চেয়েছেন তিনি পরিস্থিতির ‘শিকার’। তবে স্বীকার এবং শিকার দুটোই তার এবং তার মতো অসংখ্য মায়ের ক্ষেত্রে সত্য। পরিস্থিতি তাদের শিকারের লক্ষ্যবস্তু করেছে, আবার পরিস্থিতিকে স্বীকার করে নিতেও তারা বাধ্য হয়েছেন।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষাকে বরদাশত না-করার কথা বলছিলাম। সমষ্টিগতভাবে সংগীতচর্চার রেওয়াজ আগে যেটুকু ছিল এখন সেটুকুও বিদায়ের পথে। বিনোদনের অনুষ্ঠানে ব্যান্ড ভাড়া করে আনা হয়; কিন্তু সেখানে হইচই এবং উত্তেজনা যতটা থাকে, গান ততটা থাকে না। বাউলরা গান গেয়ে থাকেন। তাদের গানে দার্শনিক তত্ত্ব থাকে। শরিয়তবিরোধী, এই অজুহাত তুলে বাউলদের গলা থেকে গান কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা পাকিস্তান আমলে হয়েছে। অবিস্মরণীয় রকমের দুর্র্ধষ গভর্নর মোনায়েম খান এ ব্যাপারে অত্যন্ত তৎপর ছিলেন। কিন্তু কামিয়াব হননি। স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী শাসনের কালে একসময়ের সংস্কৃতিমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাহেব বাউলদের স্বাভাবিকতা ও নিজস্বতা বিলুপ্ত করার জন্য তাদের সহৃদয় পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকা নিয়েছিলেন। কুষ্টিয়াতে বাউলদের যে নিজস্ব আখড়া ছিল, নদীর ধারে, গাছপালায় ছাওয়া। সেখানে বাউলদের সুবিধাদানের নাম করে একটা পাকা অডিটোরিয়াম বানিয়ে বাউলদের স্বাভাবিক নিজস্বতার অবসান ঘটাতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। একেবারে যে ব্যর্থ হন তা বলা যাবে না। বাউলরা তবু টিকে ছিলেন, সংগীতচর্চাও জারি রেখেছিলেন। কিন্তু দেশ যখন স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত এবং উন্নতির সত্যিকার জোয়ার বইবে বলে শোনা যাচ্ছিল, তখনো তো দেখা যায়-বাউলদের গলা থেকে শুধু গান কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা যে চলেছে তা নয়, তাদের পিটিয়ে শেষ করে দেওয়ার উদ্যোগও জোরদার হয়ে ওঠে। মানিকগঞ্জে একজন বাউল গায়কের ওপর হামলা হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে হামলাকারীদের নিবৃত্ত করতে ছুটে যাবে, এমনটা মোটেই ঘটেনি। হামলার শিকার গায়ক নিজেই বরং মামলার শিকার হয়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। সমসময়ে আরেক মর্মান্তিক খবর, নারায়ণগঞ্জ বা ফতুল্লায় এক বাউলশিল্পীর স্বামীকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। এসব কী জঘন্য নির্মমতা দেখতে হলো জাতিকে।
১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে দেশে নতুন প্রেক্ষাপটের সূচনা হয়েছে। নির্বাচিত নতুন গণতান্ত্রিক সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে বসেছে। তাদের স্লোগান : ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। সেটাই যেন সত্যি ও শিরোধার্য হয়। লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!