সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের পরে সম্ভবত স্মরণকালের সবচেয়ে বড় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সে প্রেক্ষাপটে আমরা দেখেছি,ভারতসহ বেশ কয়েকটি প্রতিবেশী দেশের মন্ত্রী ও মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে এসে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। এর মধ্যমে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি জানান দিয়েছেন। এটা একটা কূটনৈতিক কৌশলের বিষয়।
কূটনৈতিক শিষ্টাচারের কারণ হচ্ছে, বেগম জিয়া তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। প্রতিবেশী দেশগুলোর নেতৃবৃন্দ যারা আছেন, তাদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার যোগাযোগ হয়েছে বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন বিষয়ে। তারা সবাই খালেদা জিয়াকে একটা স্বীকৃতি দিতে চান এবং সেটাই তারা করেছেন। এ ধরনের সফর বা সমবেদনা জানানো একটা প্রতিষ্ঠিত কাঠামো।
আমরা এখন একটা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার মধ্যে আছি। জুলাই আন্দোলনের পরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বিশেষ টানাপোড়েনের মধ্যে পড়েছে। সেই আলোকে বেগম জিয়ার শেষ বিদায়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অংশগ্রহণ একটু ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগের অংশ হিসেবেই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই জানাজায় অংশগ্রহণসহ ব্যক্তিগতভাবে খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও সম্মান জানাতে আসেন। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
এখানে লক্ষণীয় যে,এস জয়শঙ্কর শুধু এই আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি বর্তমান সরকারের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে এবং বিশেষ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শোকবার্তা পৌঁছে দিয়েছেন।
এর মধ্য দিয়ে দুটি জিনিস আমরা লক্ষ্য করতে পারি। একটা হচ্ছে, বাংলাদেশের এখনকার বাস্তবতা ভারত মেনে নিচ্ছে। তারা মনে করছে,আগামী দিনে হয়তো বিএনপির সঙ্গে তাদের কাজ করতে হবে। এখানে সম্ভাব্য দল বা সম্ভাব্য অংশীদারের সঙ্গে ভারত যুক্ত হচ্ছে। বিএনপি সরকারে থাকার সময় তাদের কিছু কাজ অনেক ক্ষেত্রে ভারতের জন্য সুখকর না হলেও ভারত বিএনপির কাজের পদ্ধতি জানে। ভারত এটুকু আন্দাজ করতে পারছে, যদি বিএনপি জয়লাভ করে,তাহলে তাদের সঙ্গে কাজ করার একটা সুযোগ আছে। সেই ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্কটাকে চালিয়ে নিতে তেমন অসুবিধা হবে না। ভারত এই বার্তাটাও দিয়ে গেছে বা দিতে চেয়েছে। বলা যায়,বিএনপির সঙ্গে ভারতের বর্তমান সরকারের সম্পর্কটা পুনরুজ্জীবিত করা এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বিএনপিকে গ্রহণ করার একটা ইঙ্গিত ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর থেকে পাওয়া গেল।
এটা বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির। কারণ,ভারতের সঙ্গে এখনকার টানাপোড়েনের আলোকে বিশেষ করে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সম্পর্কের যেই অবনমন হয়েছে, যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর ‘সম্পর্ককে স্বাভাবিক করতে আগ্রহী’এমন ইঙ্গিত দিচ্ছে। দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে এসে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেছেন। বর্তমান বাস্তবতায় এই দুটি ঘটনা সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
সাম্প্রতিককালের উত্তেজনাকে পেছনে রেখে তারা সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায় এবং তারা ভবিষ্যতের দিকে দেখতে আগ্রহী এই ইঙ্গিতটা পাওয়া যাচ্ছে।
এখানে আরেকটা কথা বলে রাখা ভালো, একটা খবর বেরিয়েছে– জামায়াতের সঙ্গেও ভারত যোগাযোগ করেছিল।সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এর অর্থ হচ্ছে, ভারত বিভিন্ন পর্যায় থেকে ইঙ্গিত দিচ্ছে, তারা বাংলাদেশের এখনকার বাস্তবতাকে মেনেই সম্পর্ক বজায় রাখতে এবং সামনের দিকে যেতে আগ্রহী।
তবে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন কিনা, তা অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে। যদি ভবিষ্যতে নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে, তাকে বাংলাদেশের পরিবর্তিত বাস্তবতার আলোকে ভারতের সঙ্গে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি যদি ভারতের দিক থেকেও সে আগ্রহটাকে বস্তুগতভাবে দেখানো হয় এবং ভারত যদি সম্মত হয়, তাহলে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। কারণ ২০০১-এর বাস্তবতা আর ২০২৬ সালের বাস্তবতা এক নয়, প্রেক্ষাপট ভিন্ন। কারণ দুই দেশেরই অভ্যন্তরীণ অনেক পরিবর্তন হয়েছে। পারস্পরিক চাহিদা বেড়েছে। নির্ভরশীলতা বেড়েছে।কাজেই এই বাস্তবতায় বাংলাদেশে যে সরকার থাকুক, দুই দেশ ভালোভাবে সম্পর্ক বজায় রাখতে এবং সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে বলে আমার ধারণা।
এখানে যেটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে আসতে পারে সেটা হলো,গত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতায় ভারতের বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে একটা ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এ ক্ষোভ নীতি প্রণয়ন বা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কী পরিমাণ চাপ তৈরি করবে, সেটা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে নিশ্চিত যে,বাংলাদেশ আগের মতো নীতি পরিচালনা করবে না। ভারতও তার বাংলাদেশ নীতি আগের জায়গায় রাখতে পারবে না। দুপক্ষেই সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস করতে হবে। দুই পক্ষকেই পারস্পরিকভাবে সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক পরিচালনা করতে হবে। সেটা অসম্ভব নয়, কিন্তু এর জন্য দুই পক্ষকে নতুন কাঠামোর মধ্যে দাঁড়িয়ে সম্পর্ক সামনে এগিয়ে নিতে হবে।
আমার মনে হচ্ছে, ভারত বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতি মেনে নিয়েছে। কারণ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরটি যদি শুধু কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতা বা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে আটকে থাকত, তাহলে পরপর তিনটি ঘটনা-ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগতভাবে সমবেদনা জানানো, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকায় জানাজায় অংশগ্রহণ ও তারেক রহমানের কাছে শোকবার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বাংলাদেশ হাইকমিশনে এসে শোক বইতে সইয়ের ঘটনা ঘটত না। এ ইঙ্গিতগুলো অর্থ বহন করে। এর অর্থ হচ্ছে ভারতের বাংলাদেশে একটা পছন্দ ছিল; কিন্তু এই পছন্দের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতাকে মেনে সামনে এগিয়ে যেতে চায়। সৌজন্য-এম হুমায়ুন কবির

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :