শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

সৌদি আরব কেন লোহিত সাগর সুরক্ষায় জোট গঠন করছে?

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ৩০, ২০২৬, ০৯:২৮ পিএম

সৌদি আরব কেন লোহিত সাগর সুরক্ষায় জোট গঠন করছে?

ডেইলি খবর ডেস্ক: ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের হামলা থেকে লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচলকে রক্ষা করতে একটি আন্তর্জাতিক সামরিক জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব।

বুধবার রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই জোটে যোগ দেওয়ার জন্য বহু দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তবে সদস্য তালিকা এখনো। চূড়ান্ত হয়নি। খবর আলজাজিরার।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব তাদের তেলের চালান লোহিত সাগরের দিকে ঘুরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। এর পরপরই, ২০ জুলাই হুতিরা সৌদি আরবের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে। এছাড়া, ইয়েমেনের উপকূল সংলগ্ন বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর হুতিরা মাশুল আরোপের পরিকল্পনা করছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানি মারাত্মক ব্যাহত হওয়ায় এর রেশ পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। এরই মাঝে লোহিত সাগরের নৌপথে এই নতুন উত্তেজনা বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিয়াদে নতুন এই সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সদর দপ্তর স্থাপন করা হবে এবং বৃহস্পতিবারের মধ্যেই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

এই জোটে কারা যোগ দেবে?

সৌদি আরব যাদের যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে, তাদের সেই প্রাতিষ্ঠানিক তালিকা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

তবে খবরে বলা হয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, মিসর, তুরস্ক, জিবুতি, সোমালিয়া, সুদান এবং জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালিসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদ ওয়েবসাইট ‍‍`আল-মনিটর‍‍` জানিয়েছে, লোহিত সাগর উপকূলের অন্তত তিনটি দেশ—মিসর, জিবুতি ও সুদান জোটে যোগ দিতে সম্মত হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই জোটে অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রায় ৫০টি দেশকে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে রিয়াদ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রিয়াদের ঘনিষ্ঠ মিত্রতা থাকা সত্ত্বেও দেশটি এখনও জোটে যোগ দেওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি, তবে তারা যোগ দেবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে একটি জরুরি বৈঠক করেছেন।

বৈঠক সম্পর্কে অবহিত এক সূত্রের বরাতে মার্কিন সংবাদ মাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ জানিয়েছে, প্রিন্স সালমান ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট করেছেন যে, ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া এই যুদ্ধ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার বিপক্ষে রিয়াদ, তবে সৌদি আরব নিজেকে রক্ষা করতে পুরোপুরি প্রস্তুত।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন হামলা শুরু হওয়ার পর থেকেই এর প্রতিশোধ হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ও অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে আসছে ইরান।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রিন্স সালমান জেডি ভ্যান্সকে জানিয়েছেন, ইয়েমেনের হুতি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা রিয়াদের রয়েছে এবং এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।

মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব যৌথভাবে পূর্ব ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর হামলা চালায়। তাদের দাবি, সৌদি ভূখণ্ডে ইরান-পরিচালিত ড্রোন হামলার জবাবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তবে এই অভিযোগের পর বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি-র মাধ্যমে এক অজ্ঞাত পরিচয় ইরানি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এসব হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করা হবে একটি মারাত্মক ভুল হিসাব-নিকাশ।

লোহিত সাগর কেন গুরুত্বপূর্ণ?

একদিকে সৌদি আরব ও ইয়েমেন এবং অন্যদিকে মিসর, সুদান, ইরিত্রিয়া, জিবুতি ও সোমালিয়া—এদের মাঝখানে অবস্থান লোহিত সাগরের। বিশ্বব্যাপী মোট পণ্য পরিবহনের প্রায় ৩০ শতাংশ পরিবাহিত হয় এই পথ দিয়ে, যা এটিকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথে পরিণত করেছে।

এই সমুদ্রপথটির গুরুত্বের মূল কারণ হলো বাব আল-মান্দেব প্রণালি। এই সংকীর্ণ খাতটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সাথে যুক্ত করেছে। উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে বিশ্বব্যাপী তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধমনী হিসেবে কাজ করে। এছাড়া লোহিত সাগরে প্রবেশ ও বের হওয়ার মাত্র দুটি পথের একটি এটি, যার অন্যটি হলো সুয়েজ খাল।

সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে বাব আল-মান্দেব মাত্র ২৯ কিলোমিটার প্রশস্ত, যার ফলে পণ্যবাহী জাহাজ আসা-যাওয়ার জন্য কেবল দুটি চ্যানেল বা পথ খোলা থাকে।

২০২৪ সালে ৪১০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং প্রক্রিয়াজাত পেট্রোলিয়াম পণ্য এই প্রণালি দিয়ে অতিক্রম করেছে—যা ছিল বিশ্বব্যাপী মোট পরিমাণের প্রায় পাঁচ শতাংশ।

চলতি মার্কিন-ইরান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হওয়ার পর সৌদি আরব ইয়ানবুর মাধ্যমে লোহিত সাগর দিয়ে তাদের অধিকাংশ তেল রপ্তানি করতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু এই সৌদি বন্দরটি এখন কার্যত ইরান-সমর্থিত হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হলেও, চলমান সংঘাতের কারণে এখন বিশ্ব সরবরাহের প্রায় ২৫ শতাংশই মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।

হুতিরা কেন লোহিত সাগরে জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে?

ইরান-সমর্থিত হুতিরা ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে। এরপর থেকেই তারা বন্দর নগরী এডেনে অবস্থানরত সৌদি-সমর্থিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আসছে।

বহু বছর ধরে চলা সৌদি সামরিক অভিযানের প্রতিশোধ হিসেবে গত ২০ জুলাই হুতিরা সৌদি আরবের ওপর নৌ-অবরোধের ঘোষণা দেয়। এর কয়েক দিন আগেই তারা সানা বিমানবন্দরে হামলার বদলা নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল।

হুতিদের অভিযোগ, সৌদি নেতারা প্রায় ১২ বছর ধরে তাদের ওপর ‘অন্যায় ও নিপীড়নমূলক অবরোধ’ চাপিয়ে রেখেছে।

তারপর থেকে একাধিক সৌদি পতাকাবাহী জাহাজ এবং তেল স্থাপনা হামলার শিকার হয়েছে। হুতি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি মঙ্গলবার এক্সে জানান, তাদের দল ‍‍`এনসিসি গাজাল‍‍` নামের একটি সৌদি তেল ট্যাংকার লক্ষ্য করে ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে, যা জাহাজটিকে পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করে।

এর আগে ২০২৩ সালে, গাজায় ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে বাব আল-মান্দেব অতিক্রমকারী ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোতে হামলা চালিয়ে বৈশ্বিক নৌ-বাণিজ্য ব্যাহত করেছিল হুতিরা।

হুতিরা কি লোহিত সাগরে টোল আরোপের পরিকল্পনা করছে?

বুধবার রয়টার্স জানিয়েছে, হুতিরা বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ফি বা টোল আরোপের কথা বিবেচনা করছে—যেভাবে ইরানও হরমুজ প্রণালিতে ফি আদায়ের চেষ্টা করছে।

ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী মুয়াম্মার আল-এরিয়ানি বুধবার এই সংবাদের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত। তবে এই টোল কবে থেকে কার্যকর হবে তা স্পষ্ট নয়।

আল-এরিয়ানি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘এটি হবে একটি বিপজ্জনক সংঘাত, যার লক্ষ্য বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত সামুদ্রিক করিডোরকে মিলিশিয়াদের সামরিক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের স্থায়ী অর্থায়নের উৎসে পরিণত করা।’

টোল আরোপের এই বিষয়টি মার্কিন-ইরান শান্তি আলোচনার একটি বড় বিবাদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ ইরান সতর্ক করেছে যে, হরমুজ প্রণালি আর কখনোই আগের মতো সব আন্তর্জাতিক জাহাজের জন্য অবাধ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে না এবং ভবিষ্যতে এক ধরনের ফি ধার্য করা হবে।

আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী, প্রাকৃতিক প্রণালি যেমন—হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব সংলগ্ন দেশগুলোকে টোল আদায় করার অনুমতি দেওয়া হয় না, এমনকি যদি সেগুলো পুরোপুরি তাদের নিজস্ব সীমানার ভেতর দিয়েও প্রবাহিত হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে ডকিং (জাহাজ ভিড়ানো) এবং বিমার মতো সেবামূলক ফি আদায়ের অনুমতি রয়েছে।

সোমবার ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের মনোনীত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরা আল-জৌবা সাংবাদিকদের বলেন, হুতিরা ইরানি মডেলের পুনরাবৃত্তি করতে চায় এবং এর ফলে ভূমধ্য উপসাগর ও লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার—এই দুটি প্রধান প্রণালিই বন্ধ হয়ে যাবে।

বৈশ্বিক জাহাজ চলাচল ও তেলের দামে কী প্রভাব পড়ছে?

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহের শেষভাগে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল আশঙ্কাজনকভাবে কমে মাত্র ১১টিতে নেমে এসেছে, যা গত কয়েক মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২৩ সালের আগে প্রতিদিন ৭০টিরও বেশি জাহাজ বাব আল-মান্দেব অতিক্রম করত।

ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই তেলের বাজারে অস্থিরতা চলছিল, যা বুধবার আরও বৃদ্ধি পায়। চলতি মাসের শুরুর দিকে অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কমে ৭২ ডলারে নেমে আসলেও, বুধবার তা বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৮৮.০৯ ডলারে দাঁড়ায়। এমনকি গত সপ্তাহে এই দাম ১০০ ডলারের সীমাও অতিক্রম করেছিল।সংগৃহীত ছবি

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!