শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩

ইরানকে একঘরে করতে ট্রাম্পের পরিকল্পনায় বড় বাধা চীন-রাশিয়া

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ২১, ২০২৬, ০১:৪৪ পিএম

ইরানকে একঘরে করতে ট্রাম্পের পরিকল্পনায় বড় বাধা চীন-রাশিয়া

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করতে বড় ধরনের চাপ তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক লেনদেন করা দেশগুলোকেও কঠোর নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছেন তিনি।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার চীন ও রাশিয়াকে এই চাপের মধ্যে আনা ট্রাম্পের জন্য সহজ হবে না। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে ইরানের বড় পরিসরের তেলবাণিজ্য এবং রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক ওয়াশিংটনের পরিকল্পনাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। আর তাই ইরানের গুরুত্বপূর্ণ দুই বাণিজ্যিক অংশীদার চীন ও রাশিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগ করে ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে।

সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, রাশিয়া আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে এবং দেশটি অনেকাংশেই মার্কিন নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে কাজ করে। অন্যদিকে চীন নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করতে এর আগেও প্রস্তুতির প্রমাণ দিয়েছে।

কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ আল জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্পের পক্ষে কার্যকরভাবে এই চাপের প্রচার চালানো ‘খুবই কঠিন’ হবে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য— যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাধারণত এ ধরনের সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা বহুপক্ষীয় সমঝোতার মাধ্যমে কার্যকর করা হয়। কিন্তু ট্রাম্প একতরফাভাবে সেই ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার চেষ্টা করছেন।

‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি’
গত মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে তার অভিযান হবে ‘কোনও দেশের বিরুদ্ধে নেয়া সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ’। এসময় ইরানকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে সহায়তা করা দেশগুলোকেও ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি’ ভোগ করতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

এমনকি তেল পাচার, অর্থ স্থানান্তর, নগদ অর্থ লেনদেন, মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠান, জাহাজ নিবন্ধন এবং বিভিন্ন ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের মতো কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে সেগুলো থেকে বিরত থাকতেও কঠোর বার্তা দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, এসব কর্মকাণ্ড এখনই বন্ধ করতে হবে।

এর আগে একই দিনে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ আমদানি ও বাণিজ্যিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে নির্ভরতার জায়গা হয়ে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত তেহরানের সঙ্গে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাণিজ্য বন্ধের ঘোষণা দেয়। দেশটির অভিযোগ, ইরানের সামরিক বাহিনী তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।

ব্র্যান্ডাইস ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক অর্থনীতির অধ্যাপক নাদের হাবিবি মনে করেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতকে এই বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দিতে যুক্তরাষ্ট্র ‘জোরালোভাবে উৎসাহিত বা প্রভাবিত’ করেছে। ইরানের অন্য বাণিজ্যিক অংশীদারদের, বিশেষ করে সবচেয়ে বড় অংশীদার চীনের ওপরও যুক্তরাষ্ট্র চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

চীন-ইরান বাণিজ্য বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনও পরিকল্পনাই বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে পারে। বিশ্লেষণধর্মী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরান থেকে সমুদ্রপথে রপ্তানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশই কিনেছে চীন।তবে চীনের তেল শোধনাগারগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া কঠিন, কারণ এগুলোর বেশিরভাগই স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয় এবং মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল নয়।
এছাড়া ইরানের অর্থ লেনদেন প্রক্রিয়াজাত করলে বড় চীনা ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়ার হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে চীন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে একই সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল সময়ে বেইজিং পাল্টা পদক্ষেপও নিতে পারে।

চ্যাথাম হাউসের চীন ও এশিয়া-প্যাসিফিক কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ গবেষক ইউ জিয়ে বলেন, ইরানের অর্থনৈতিক অংশীদারদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের হুমকি ‘চীনের ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক বদলাতে পারবে না’।আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ট্রাম্প চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে চান। বেইজিংও ওয়াশিংটনের সঙ্গে আপাতত একটি ‘সাময়িক সমঝোতা’ চায়।
পল মাসগ্রেভ বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনও ‘আগ্রাসী’ নিষেধাজ্ঞা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বর্তমানে এক ধরনের অর্থনৈতিক শীতল যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে। এ অবস্থায় ট্রাম্প সম্ভবত দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে চাইবেন না।
ট্রাম্পের অর্থনৈতিক চাপের বিষয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, নতুন নিষেধাজ্ঞা ‘সমস্যা সমাধানে সহায়ক হবে না’। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেয়া এবং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উপায়ে সমস্যার সমাধান করা উচিত।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আগামী মাসে ওয়াশিংটন সফরের কথা রয়েছে। তার আগে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।

এছাড়া চলতি বছর দুই দেশের নেতাদের মধ্যে আরও দুটি সম্ভাব্য বৈঠকের কথা রয়েছে। ইউ জিয়ে বলেন, এসব বৈঠকে উপসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নিয়ে আলোচনা হবে। তবে এটি আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে না।

রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের আলাদা সম্পর্ক
রাশিয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। চীনের তুলনায় রাশিয়া ইরানের ছোট বাণিজ্যিক অংশীদার হলেও মস্কো ও তেহরান বহু বছর ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা দুই দেশ ২০ বছরের একটি অংশীদারত্ব চুক্তি করে। রাশিয়ার জ্বালানি মন্ত্রী সের্গেই সিভিলেভের তথ্য অনুযায়ী, এর ফলে ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ বেড়ে ৪৮০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেলের পাশাপাশি রাশিয়া ও ইরান ক্যাস্পিয়ান সাগর দিয়ে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামও আদান-প্রদান করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। গত সোমবার এনবিসি নিউজ একটি ইউরোপীয় সরকারি নথির বরাত দিয়ে জানায়, রাশিয়া সমুদ্রপথে ইরানে ‘ড্রোনের যন্ত্রাংশ, গোলাবারুদ ও টিএনটি’ পাঠিয়েছে।

যদিও রাশিয়ার ওপর এরই মধ্যে ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি বলেন, এটি ওয়াশিংটনের ‘ব্যর্থ নীতির’ই ধারাবাহিকতা এবং এর ফল হবে ‘আরও একটি পরাজয়’।

সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে দেয়া এক পোস্টে আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বিশ্ব অর্থনীতি ও বিভিন্ন দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি তৈরি করছে।

রাশিয়া, চীন, ভারত, ব্রাজিলসহ বিশ্বের কয়েকটি শক্তিশালী দেশকে নিয়ে গঠিত ব্রিকস জোটের সদস্য ইরান। নতুন আর্থিক সুযোগ তৈরিতে জোটটির সদস্য হিসেবে নিজের অবস্থান কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে তেহরান।

গত সপ্তাহে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মাতি বলেন, ইরান ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে (এনডিবি) যোগ দেয়ার পরিকল্পনা করছে। এর ফলে পশ্চিমা বাজারের বাইরে অর্থায়নের আরও সুযোগ তৈরি হতে পারে।তিনি আরও বলেন, ব্রিকসের দেশগুলো নিজেদের মুদ্রায় লেনদেন করতে পারে বলে ইরান মনে করে। পাশাপাশি ব্রিকসের অন্য সদস্যদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় মুদ্রা সহযোগিতার বিষয়েও ভাবছে তেহরান।

তবে ইরানের সম্ভাব্য সদস্যপদ নিয়ে এনডিবি এখনও কোনও মন্তব্য করেনি। সদস্য হতে হলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক আলী আকবর দারেইনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘শ্বাসরোধী’ নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে নেবে।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প এমন এক যুদ্ধে আটকে গেছেন, যে যুদ্ধে তিনি জিততে পারবেন না, আবার বেরিয়েও আসতে পারছেন না।’ফাইর ছবি

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!