বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২ ফাল্গুন ১৪৩২

দেশে আইনের শাসন এবং বিনা বিচারে আটক

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৬, ১২:২৭ এএম

দেশে আইনের শাসন এবং বিনা বিচারে আটক

ডেইলি খবর ডেস্ক: বৈষম্য বিলোপ আর আইনের শাসনের দাবিই ছিল ‘২৪-এর ছাত্র আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য। সেই দাবির আন্দোলনই রূপ পায় গণ-অভ্যুত্থানে। ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হয়। ক্ষমতা ফেলে ভারতে পালিয়ে যান সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে দায়িত্ব নিয়েছিল অন্তর্র্বতীকালীন সরকার। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য দূর করার জনপ্রত্যাশা নিয়ে দায়িত্ব নেয়া সেই সরকারের সময়েই আইনের শাসনের বহু ব্যত্যয় ঘটেছে। বিনা বিচারে আটক এবং কারাগারে থাকার অনেক নজির তৈরি হয়েছে। যা আইনের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের সময় বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলের লাখো নেতাকর্মী ও পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলায় মাসের পর মাস কারাভোগ করেছেন বিনা বিচারে।
অন্তর্র্বতীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর তাদের অনেকে কারামুক্ত হয়েছেন। কারও কারও বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা এখনো চলমান। এর বাইরে অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের সময়ে দায়ের করা অনেক মামলায়ও এমন অনেককে আসামি করা হয়েছে যারা ঘটনাস্থলে ছিলেন না বা ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নন বলে তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে। এসব ব্যক্তি অনেকটা বিনা বিচারেই কারাগারে আছেন। জামিনযোগ্য অভিযোগ হলেও জামিন মিলেনি অনেকের। বিনা বিচারে কারাগারে আটক থাকা এমন ব্যক্তিদের আশার আলো দেখাচ্ছে নতুন নির্বাচিত সরকার। ইতিমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে এই বার্তা দেয়া হয়েছে। যারা হয়রানিমূলক মামলার শিকার হয়েছেন তাদের বিষয়ে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেয়ার।
দায়িত্ব গ্রহণের পরের দিন জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও আইনের শাসনের বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চলবে বিধিবদ্ধ নীতি নিয়মে। দলীয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তি অথবা জোরজবরদস্তি নয়, আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা।
দায়িত্ব নেয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদও হয়রানিমূলক মামলা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। আওয়ামী লীগের আমলে হওয়া হয়রানিমূলক মামলা দুই দফায় প্রত্যাহারের অনুমোদন দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর দায়ের হওয়া বেশকিছু মামলায় ব্যক্তিগত সুবিধা হাসিলের জন্য সাধারণ ও নিরীহ মানুষকে আসামি করা হয়েছে। এ সব মামলার পেছনে সুবিধাবাদী একটি শ্রেণি কাজ করেছে। মন্ত্রী জানান, ৫ই আগস্টের পর দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে কিছু মামলায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিরীহ ব্যক্তিদের জড়ানো হয়েছে। বিষয়গুলো সরকারের নজরে এসেছে এবং যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত তথ্য বের করা হবে। তিনি বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার বদ্ধপরিকর এবং কেউ যেন অহেতুক হয়রানিমূলক মামলার শিকার না হন, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বিগত সরকারের ১৭ বছরে বিরোধী দলের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া রাজনৈতিক হয়রানিমূলক আরও ১২০২টি মামলা প্রত্যাহারের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর আগে এমন ১০০৬টি মামলা প্রত্যাহারের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বিচার বিভাগে কোনো দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন তিনি।
হয়রানিমূলক মামলায় জামিন না পাওয়ার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, বিভিন্ন কারণে বিচার বিভাগ ইতস্তত বোধ করছিল জামিন দিতে। আমার মনে হয় এখন পরিস্থিতি উন্নতির দিকে যাচ্ছে। বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভুক্তভোগীরা এখন জামিন পেয়ে যাবেন। বিচার বিভাগও জামিন দিতে আর ইতস্তত বোধ করবে না। তিনি বলেন, কাউকে যখন হত্যামামলার আসামি করা হয় তখন তার জামিন না হওয়াটাই স্বাভাবিক। এ ধরনের হয়রানি রোধে মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করা জরুরি।
গত দেড় বছর ধরে কারাগারে আছেন সাংবাদিক শ্যামল দত্ত। তার পরিবারের দাবি তিনি নানা জটিল রোগে ভুগছেন। ঠিকমতো চিকিৎসা পাচ্ছেন না। একাধিক বার জামিন আবেদন করেও জামিন মিলেনি। সর্বশেষ উচ্চ আদালতের নজরে আনলে হাইকোর্ট তাকে কেন জামিন দেয়া হবে না, জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। কিন্তু গত ৯ মাসেও ওই রুলের নিষ্পত্তি হয়নি। মামলার এজাহার বলছে, সাংবাদিক শ্যামল দত্তের বিরুদ্ধে ছাত্র-আন্দোলনে ভাষানটেক এলাকায় একটি হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়। ওই মামলায় তিনি কারাভোগ করছেন। সাংবাদিক শ্যামল দত্তের স্ত্রী সঞ্চিতা দত্ত মানবজমিনকে বলেন, মামলা হয়েছে, সেটা আমরা ফেস করবো। কিন্তু জামিনটা অন্তত দেয়া হোক। কিন্তু আমরা আমাদের আইনের অধিকার পাইনি।
ক্যান্সার আক্রান্ত সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ২০২৪ এর ১৬ই সেপ্টেম্বর থেকে কারাগারে আছেন। প্রথমে জুলাই হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আরও চারটি হত্যা মামলায় আসামি করা হয়। তিনিও একাধিকবার জামিন আবেদন করেছেন কিন্তু জামিন মিলেনি।
সাংবাদিক সংগঠনের তথ্য বলছে, জুলাই আন্দোলনে ছাত্র হত্যায় জড়িত থাকার ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়। তাদের মধ্যে ৫ জন আছেন কারাগারে। এর বাইরে আইনজীবী, লেখকসহ আরও অনেকে আছেন যাদের পরিবারের অভিযোগ তারা আইনি অধিকার পাচ্ছেন না। জামিনের আবেদন করা হলেও জামিন মিলছে না।
মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান মাবনজমিনকে বলেন, যে কারো বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। কিন্তু তার জামিন পাওয়ার অধিকার আছে। ইচ্ছাকৃতভাবে কারও জামিনের পথ রুদ্ধ করা এবং জামিন নাকচ করা আইনের লঙ্ঘন। বিচার কখনো ব্যক্তির ইচ্ছা অনিচ্ছায় হওয়া উচিত নয়। বিচারে হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। বিচার হবে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী।সুত্র-মানবজমিন

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!