শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩

রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় আক্রান্ত ডেঙ্গু রোগীর ভিড়ে চাপে ঢাকা মেডিক্যাল

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ২৮, ২০২৬, ১১:২৬ এএম

রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় আক্রান্ত ডেঙ্গু রোগীর ভিড়ে চাপে ঢাকা মেডিক্যাল

ডেইলি খবর ডেস্ক: দেশে প্রতিবছরই এই সময়য়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর হাসপাতালগুলোয় বাড়ছে রোগীর চাপ। প্রতিদিনই নতুন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। এর মধ্যে গুরুতর অবস্থায় রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোয় ছুটছেন ঢাকাসহ আশপাশের জেলার রোগীরা। সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ডেঙ্গু ওয়ার্ডে একদিকে চলছে নতুন রোগী ভর্তি, অন্যদিকে সুস্থদের ছাড়পত্র দেওয়ার ব্যস্ততা। শয্যা খালি হলেই অপেক্ষমাণ রোগীকে সেখানে স্থানান্তর করা হচ্ছে। তারপরও অনেক রোগীকে শয্যার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ স্বজনদের।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি বছর ডেঙ্গুতে ইতোমধ্যে ৮৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩২ হাজার ২৪৮ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮৬৮ জন। ফলে ডেঙ্গুর চিকিৎসা দিতে গিয়ে হাসপাতালগুলোয় বাড়ছে রোগীর চাপ। বিশেষ করে ঢাকা মেডিক্যালে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগী আসায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

গত এক দিনে নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি এলাকার হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হন ৬৮ জন। ৯৮ জন ভর্তি হন দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোয়। এ দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে ঢাকা বিভাগের হাসপাতালে ভর্তি হন ১৫০ জন। বিভাগের মধ্যে বরিশালে ১১০ জন, চট্টগ্রামে ১০৯ জন, খুলনায় ২০৫ জন ও ময়মনসিংহে ৩৮ জন, রাজশাহীতে ৭৩ এবং রংপুরে ১৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায় রোগী ও স্বজনদের ব্যস্ততা। একদিকে নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন, অন্যদিকে সুস্থ হয়ে কেউ কেউ ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। তবে শয্যা পেতে রোগীদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন স্বজন।

গাজীপুর থেকে আসা ডেঙ্গু রোগী জুবায়েদ আহমেদের ছোট ভাই মোহাম্মদ লিটন জানান, প্রথমে জ্বর দেখা দিলে তার ভাইকে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হলে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন স্বজনরা।

লিটন বলেন, আমার ভাইয়ের প্লাটিলেট ৬০ হাজার থেকে নেমে ২০ হাজারে এসেছে। ঢাকা মেডিক্যালেও শুরুতে নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে শয্যা পাওয়া যায়নি। প্রথমে সাধারণ চিকিৎসা বিভাগে রাখা হয়। পরে প্রফেসর ডাক্তারের ভিজিটের পর তাকে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়।

ডেঙ্গু ওয়ার্ডে সরেজমিন দেখা যায়, শয্যায় মশারি টানানো নেই। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মশার কামড় থেকে রক্ষা করা জরুরি হলেও দিনের বেলায় অনেক রোগীর শয্যায় মশারি দেখা যায়নি। এতে রোগী ছাড়াও হাসপাতালের অন্য রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

লিটন বলেন, বাসা থেকে মশারি নিয়ে এসেছি। কিন্তু এখানে কাউকে ব্যবহার করতে দেখছি না। রোগীর প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় ও শারীরিক অবস্থা নিয়ে এত দুশ্চিন্তা থাকে যে মশারির কথাও অনেক সময় মাথায় থাকে না। তবে আশপাশে মশা থাকায় সংক্রমণ নিয়ে ভয় হয়। ডেঙ্গু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ২১ বছর বয়সী ইয়াসিন হোসেন রিফাতের সঙ্গে কথা হয়। তিনি চাঁদপুরের শাহরাস্তির বাসিন্দা পল্টনের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। রিফাত জানান, কর্মস্থলে যাওয়া-আসার পথে গুলিস্তান এলাকায় মশার কামড়ে আক্রান্ত হয়েছেন বলে তার ধারণা। শুক্রবার রাত ১০টার দিকে তার শরীরে প্রথম তীব্র জ্বর দেখা দেয়। এর সঙ্গে শুরু হয় প্রচণ্ড মাথাব্যথা ও অনবরত বমি। কয়েক দিন ধরে ১০৩ থেকে ১০৪ ডিগ্রি পর্যন্ত জ্বর থাকার পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সোমবার তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি জানান, জ্বর ও বমির তীব্রতায় কয়েক রাত ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি। বর্তমানে চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী তরল খাবার, ডাবের পানি ও ফলমূল গ্রহণ করছেন এবং চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।

অন্যদিকে ২৩ বছর বয়সী রনি নামের আরেক ডেঙ্গু রোগীও ঢাকা মেডিক্যালে চিকিৎসাধীন। পেশায় কেয়ারগিভার রনি প্রথমে চার-পাঁচ দিন বাসায় জ্বরে ভুগছিলেন। পরে স্থানীয় ফার্মেসির পরামর্শে ডেঙ্গু পরীক্ষা করালে ফল পজিটিভ আসে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ না মেনে বাসায় থাকার পরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে।

উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। হাসপাতালে ভর্তির আগে তার প্লাটিলেট ছিল ১ লাখ ১৭ হাজার। পরবর্তী এক দিনের ব্যবধানে তা কমে ৩০ হাজারে নেমে আসে।

রনির বর্তমানে বমি নিয়ন্ত্রণে এলেও পেটের ডান পাশে তীব্র ব্যথা, শারীরিক অস্থিরতা ও ঘন ঘন পাতলা পায়খানার সমস্যা রয়েছে। তাকে ডাবের পানি, ওআরএস ও অন্যান্য তরল খাবার দেওয়া হচ্ছে। রুচি না থাকায় শক্ত খাবার খেতেও সমস্যা হচ্ছে বলে জানান তার সঙ্গে থাকা সহকর্মী।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ৪০২ নম্বর ডেঙ্গু ওয়ার্ডের ইনচার্জ ও সিনিয়র স্টাফ নার্স নাজনীন নাহার জানান, ওয়ার্ডে প্রতিনিয়ত রোগী ভর্তি ও ছাড়পত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। আক্রান্তদের একটি বড় অংশ গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসছেন। তরুণদের পাশাপাশি ৪০ থেকে ৪২ বছর বয়সী রোগীর সংখ্যাও তুলনামূলক বেশি। তিনি বলেন, পুরুষ রোগীদের জন্য একাধিক ওয়ার্ড এবং নারী রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ডে চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। বেড খালি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীদের নিয়মিত শয্যায় স্থানান্তর করা হয়।

মশারি প্রসঙ্গে নাজনীন নাহার বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের সুরক্ষায় মশারি টাঙানোর ব্যবস্থা রয়েছে। তবে অনেকে দিনের বেলায় মশারি টাঙাতে চান না। রাতে রোগীদের শয্যায় মশারি টাঙানো হয়।

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের অন্তত সাত দিন পূর্ণ বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি শরীরে পানিশূন্যতা রোধে ওআরএস, ডাবের পানি, স্যুপসহ পর্যাপ্ত তরল খাবার গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের স্বজনদের অভিযোগ, শুধু রোগী ভর্তি করলেই চিকিৎসা নিশ্চিত হয় না। শয্যা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রক্ত ও প্লাটিলেটের ব্যবস্থা করতেও তাদের নানা ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে। দ্রুত রোগীর চাপ সামাল দিতে শয্যা ব্যবস্থাপনা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং মশারি ব্যবহারে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।সংগৃহীত

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!