শনিবার, ০৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ১৯ পৌষ ১৪৩২

নতুন শিক্ষাবর্ষ সাড়ে ৫ কোটি বই বাকি রেখে বই ছাড়াই ক্লাসে অর্ধকোটি শিক্ষার্থী

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২, ২০২৬, ১২:১১ পিএম

নতুন শিক্ষাবর্ষ সাড়ে ৫ কোটি বই বাকি রেখে বই ছাড়াই ক্লাসে অর্ধকোটি শিক্ষার্থী

ডেইলি খবর ডেস্ক: দেশের প্রাথমিকস্তরের শিক্ষার্থীদের নতুন বছর মানেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বইয়ের ঘ্রাণ আর নতুন স্বপ্ন। বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দিতে ২০১০ সাল থেকে ১ জানুয়ারি চলে আসছে ‘বই উৎসব’ করার রীতি। তবে দীর্ঘদিনের সেই রীতিতে ছন্দপতন ঘটেছে। এবার প্রাথমিক স্তরের সব বই স্কুলে স্কুলে পৌঁছানো গেলেও মাধ্যমিকের প্রায় সাড়ে ৫ কোটি বই ছাড়াই শুরু হয়েছে নতুন শিক্ষাবর্ষ। ফলে নতুন বই ছাড়াই ক্লাসে যেতে হচ্ছে দেশের প্রায় অর্ধকোটি শিক্ষার্থীকে। মাধ্যমিক স্তরে গড়ে চারজন শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন এখনো কোনো পাঠ্যবই হাতে পায়নি।
বই বিতরণ নিয়ে খোদ সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যের অসংগতি ও শুভঙ্করের ফাঁকি ধরা পড়েছে। এনসিটিবির বিতরণ শাখার তথ্যমতে, মাধ্যমিকের চাহিদার ২১ কোটি ৪৩ লাখ বইয়ের বিপরীতে ১ জানুয়ারি পর্যন্ত ছাপা হয়েছে ১৬ কোটি ১০ লাখ কপি, যা মোট বইয়ের ৭৫.১৫ শতাংশ। অথচ প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমের দাবি, প্রথম দিনেই ৮৩ শতাংশ বই পৌঁছেছে। অন্যদিকে, এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) ড. রিয়াদ চৌধুরী জানান, প্রথম দিনে ৭১.৭৬ শতাংশ বই বিতরণ করা হয়েছে। আর মাঠপর্যায়ে কালবেলার অনুসন্ধান বলছে, অনেক স্কুলে ষষ্ঠ-অষ্টম শ্রেণির ১২টি বইয়ের মধ্যে মাত্র ২ থেকে ৪টি বই দেওয়া হয়েছে। এই তিনটি শ্রেণিতে গড়ে ৫৫ শতাংশ বই ছাপা হয়েছে।
বই ছাপানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সবচেয়ে খারাপ অবস্থা অষ্টম শ্রেণিতে। এই শ্রেণিতে ৪ কোটি ২ লাখ বইয়ের চাহিদার বিপরীতে ছাপা হয়েছে ৫১ শতাংশ (২ কোটি ৬৮ লাখ)। যদিও মাত্র এক সপ্তাহ আগে এই শ্রেণিতে বই ছাপার সংখ্যা দেখানো হয়েছিল মাত্র ১৮ লাখ ৯ হাজার। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ২ কোটির বেশি বই ছাপার এই অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান নিয়ে খোদ এনসিটিবিতেই প্রশ্ন উঠেছে। সপ্তম শ্রেণিতে বই ছাপানো হয়েছে মাত্র ৬২ শতাংশ। এই শ্রেণিতে ৪ কোটি ১৫ লাখ বইয়ের মধ্যে ছাপা হয়েছে ২ কোটি ৬১ লাখ বই। মোট ৬২ শতাংশ। এই পর্যায়ে এক সপ্তাহ আগে বই ছাপার পরিমাণ দেখানো হয় ৭০ লাখ ৫৫ হাজার।
এনসিটিবি এখন পর্যন্ত ৭৫ শতাংশ বই ছাপানোর দাবি করলেও মাঠের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। সারাদেশের একাধিক জেলার শিক্ষা অফিসে কথা বলে জানা গেছে এনসিটিবির দেওয়ার তথ্যের সঙ্গে নবম শ্রেণির বইয়ের সংখ্যায় কিছুটা মিল পাওয়া গেলেও ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বইয়ের তথ্যে ব্যাপক গরমিল পাওয়া গেছে। বেশিরভাগ স্কুলে ষষ্ঠ-অষ্টম শ্রেণির ১২টি বইয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ চারটি, আবার কোথাও দুটি বই দেওয়া হয়েছে।
ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণির অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও তা সন্তোষজনক নয়। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৪ কোটি ৪৩ লাখ বইয়ের মধ্যে ছাপা হয়েছে ৩ কোটি ৫৯ লাখ বই। যদিও এক সপ্তাহ আগে এই সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪৩ লাখ ৬৫ হাজার। নবম শ্রেণিতে ৫ কোটি ৭০ লাখ বইয়ের বিপরীতে ছাপা হয়েছে ৪ কোটি ৮৬ লাখ। এক সপ্তাহ আগে এ সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৪৭ লাখ ৭০ হাজার।
দুই বছর ধরে সরকার কেন্দ্রীয়ভাবে ১ জানুয়ারি বই উৎসব না করলেও উপজেলা পর্যায়ে বই বিতরণ চলছে। চলতি বছর সময়মতো বই না পাওয়ার নেপথ্যে এনসিটিবির একজন প্রভাবশালী সদস্যের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেটকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বই ছাপার প্রক্রিয়া নির্ধারিত সময়ের দুই মাস পর শুরু করা হয়। গত মে মাসে দরপত্র আহ্বান করা হলেও সেখানে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ কিছু প্রেস এবং সাবেক মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের ভাই রব্বানী জব্বারের প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটির বেশি বই ছাপার কাজ দেওয়া হয়। পরে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ ৬০৩ কোটি টাকার এই দরপত্র আটকে দেয়। পরে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হলেও কাগজের মানের শর্ত শিথিল করে সেই সিন্ডিকেটকেই সুবিধা দেওয়া হয়, যার খেসারত দিচ্ছে মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা।
বই না থাকায় চরম বিপাকে পড়েছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। এক্ষেত্রে অনেকের ভরসা পুরোনো বই। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যারা বই পায়নি তারা এনসিটিবির ওয়েবসাইট থেকে পিডিএফ কপি ডাউনলোড করে প্রিন্ট নিয়ে পড়তে পারবে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমের দাবি, ১ জানুয়ারি মোট ৮৩ শতাংশ বই বিতরণ করা হয়েছে এবং আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে শতভাগ বই বিতরণ করা সম্ভব হবে। রাষ্ট্রীয় শোকের কারণে চলতি বছর বই উৎসব হয়নি বলে জানান তিনি। যদিও গত বছরও বই উৎসব করেনি সরকার। তার দাবি—এবার দরপত্র প্রক্রিয়ার কারণে কিছুটা দেরি হলেও চলতি মাসের মধ্যে সব বই পেয়ে যাবে।
এদিকে প্রেস সচিবের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে গরমিল রয়েছে এনসিটিবির দেওয়া তথ্য। এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) ড. রিয়াদ চৌধুরী গতকাল সংবাদ সংস্থা বাসসকে জানান, মাধ্যমিকে সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি, এই তিনটি স্তরে মোট ১৮ কোটি ৩২ লাখ ৪০ হাজার ৯২৭টি বইয়ের মধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে ৩ কোটি ১৪ লাখ, যা মোট বইয়ের ৭১ দশমিক ৭৬। অন্যদিকে এনসিটিবির বিতরণ শাখার তথ্য বলছে, ৭৫ শতাংশের বেশি বই বিতরণ করা হয়েছে।
বগুড়ার জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রমজান আলী জানান, ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও সব বিষয়ের বই পেলেও সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা সব বই পাচ্ছে না। এই দুই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের আংশিক কিছু বই হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। কুড়িগ্রাম জেলা শিক্ষা অফিসের তথ্য বলছে, ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণিতে ১৫ লাখ ৭২ হাজার ৪৯০টি বইয়ের বিপরীতে পাওয়া গেছে ৯ লাখ ১ হাজার ৮৩৬টি, যা মোট বইয়ের ৬০ শতাংশ। ময়মনসিংহ মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস জানায়, এই জেলায় ৬৫ লাখ ৫ হাজার ৮০৯টি বইয়ের বিপরীতে এসেছে ৩৯ লাখ ১ হাজার ৫৮৯টি বই, যা মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ। নওগাঁয় মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস জানায় মাধ্যমিক পর্যায়ের মোট ১৬ লাখ ৯৭ হাজার ৪২৬টি বইয়ের বিপরীতে এসেছে ১২ লাখ ৩৫ হাজার ১৫টি। এখনও ২৬ শতাংশ বই মাঠ পর্যায়ে পৌঁছেনি। কালবেলার সিলেট ব্যুরো অফিস জানায়, সিলেট বিভাগে মাধ্যমিকে ৩১ শতাংশ বই এখনো সরবরাহ করা হয়নি। এ অঞ্চলের ১২ লাখ শিক্ষার্থী নতুন বই ছাড়া ক্লাসে যাচ্ছেন।
তবে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদারের দাবি,সরকার এবারও শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়ার বিষয়ে অনেকাংশে সফল। তিনি বলছেন, নবম শ্রেণিতে ৮৬ শতাংশ, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৮২ শতাংশ, সপ্তম শ্রেণিতে ৬৩ শতাংশ এবং অষ্টম প্রেণির ৫২ শতাংশ বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বছরের প্রথম দিনে। তবে যারা বই পায়নি তারা পাঠ্যপুস্তকের পিডিএফ কপি ওয়েবসাইট থেকে প্রিন্ট আউট নিয়ে পড়তে পারবে।সংগৃহীত ছবি

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!